প্রাক মহামারি পর্যায়ের প্রবৃদ্ধি অর্জনে ৩ বছর লাগবে: অর্থ মন্ত্রণালয়
করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রাক-মহামারি সময়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে কমপক্ষে আরও তিন বছর সময় লাগবে বলে ধারণা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
কোভিড সংক্রমণের আগে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। টানা তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর কোভিড সংক্রমণের আগের অর্থবছর ৮ শতাংশের বেশি অর্জন করে বাংলাদেশ।
গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে করোনা মহামারির ধাক্কায় তা ৫ শতাংশে নেমে আসে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। যদিও বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গত অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি এর অর্ধেক হতে পারে এমন পূর্বাভাস দেয়।
গত বছর মার্চে দেশে প্রথম কোভিড শনাক্ত হওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণে ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। বন্ধ হয়ে যায় সব ধরণের কল-কারখানা, দোকানপাট। স্থবিরতা নেমে আসে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও।
ওই সময়ে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৮৫,০০০ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে, যদিও জিডিপির আকার হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সর্বনিম্ন ৫.৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। এ হার ছিল তার আগের এক দশকে সর্বনিম্ন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির কারণে ওই বছর প্রবৃদ্ধিতে ধ্বস নেমেছিল।
২০১৯ সালে প্রণিত 'মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি নীতি বিবৃতি (২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২২)'- এ জিডিপির যে পূর্বাভাস দিয়েছিল অর্থমন্ত্রণালয়, তাতে চলতি অর্থবছর ৮.৪ শতাংশ ও আগামী অর্থবছর ৮.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল।
গত জুনে বাজেট ঘোষণাকালে তিন-চার মাসের মধ্যে কোভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা থেকে 'ভি' আকৃতিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা করে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে কোভিডের আগের অর্থবছরের সমান প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করে অর্থ বিভাগ।
তবে মহামারি দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবেলায় চলমান লকডাউনের কারণে তা সংশোধন করে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ২ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি কমিয়ে ৬.১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। যদিও বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের পূর্বাভাস এর চেয়ে অনেক কম।
আগামী অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনীতি নীতি বিবৃতি ২০২১-২২ থেকে ২৪ এর খসড়ায় আগামী তিন অর্থবছরের জন্যও ধীরগতির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হচ্ছে, যা বাজেট ঘোষণাকালে প্রকাশ করা হবে।
করোনার নতুন কোন ভয়াবহ ধাক্কা আসবে না, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক সকল নাগরিককে টিকাদানের আওতায় আনা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৫০-৮০ ডলারের মধ্যে থাকবে- এমন পূর্বানুমান করে আগামী অর্থবছরের জন্য ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করছে অর্থবিভাগ।
এতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার প্রাক্কলন করে পরের অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করছে অর্থমন্ত্রণালয়। এ হার কোভিডের আগের অর্থবছরের অর্জিত প্রবৃদ্ধি হারের চেয়েও কম। কোভিডের আগে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৫ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও প্রাক মহামারি সময়ে করা প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে জিডিপির আকার যে পরিমাণ হওয়ার কথা ছিল, নতুন প্রাক্কলন অনুযায়ী তার চেয়ে ১০.৪৫ লাখ কোটি টাকা কম হবে। এ পরিমাণ অর্থ পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের ৩৫ গুণ।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে আগামী দিনগুলোতে করোনার ধাক্কা সামলে যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো যায়, তা নিশ্চিত করতে টিকাদান কর্মসূচিতে জোর দিতে হবে।
এছাড়া, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সহজে ব্যবসা করার পরিস্থিতি নিশ্চিত করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনা সংক্রমণের আগে জিডিপির যে আকার ছিল তা হয়তো আর কখনই আমরা ফেরত পাব না।
তিনি বলেন, "গত অর্থবছরে করোনার ক্ষতি হিসাব না করেই সরকারের পক্ষ থেকে প্রবৃদ্ধির একটা অঙ্ক জানানো হয়। আরেকটি অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসেও গত বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ হচ্ছে না। পূর্ণাঙ্গ হিসাবে যাই আসুক না কেন জিডিপির আকার করোনার আগের বছরের চাইতে কম হবে। লক্ষ্য অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি না হওয়ার কারণে জিডিপি ভিত্তির এ ক্ষতির পুনরোদ্ধার আর হবে না,"
তিনি আরও বলেন, "করোনার সংক্রমন কমে আসলে বা করোনার ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা হলে হয়তো প্রবৃদ্ধি আগের অবস্থায় নেওয়া সম্ভব। তবে এর জন্যেও তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে,"
তিনি বলেন, "মূলত করোনা ব্যবস্থাপনার ওপর আগামীতে প্রবৃদ্ধির পুনরোদ্ধার নির্ভর করছে। তবে এর পূর্ব শর্ত হিসেবে অবশ্যই বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।"
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা অনেক পেছনে পড়ে গেছি। এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নয়। তবে করোনা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াসহ ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রাক প্রাথমিক পর্যায়ের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব,"
তিনি বলেন, "প্রবৃদ্ধির হার কম-বেশি যাই হোক না কেন, কোভিড পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী গুটিকয়েক দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ভারতের প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক অবস্থানে চলে গেছে। তবে কোভিডের প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে ভবিষ্যতের ধাক্কা সামলানোর আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে হবে।"
কয়েক বছরেই প্রবৃদ্ধির হার আগের অবস্থায় ফিরে আসলেও করোনার আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। টিবিএসকে তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে স্বাভাবিকের দ্বিগুন প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এটি অনেক কঠিন হলেও তিনি মনে করেন।
