১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক পর্যটন অর্থনীতি: বাংলাদেশ কি সুযোগ গ্রহণে প্রস্তুত?
পর্যটন একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক খাত, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অনেক দেশ তাদের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যটন খাত থেকে অর্জন করে। বিশ্বের বহু অর্থনীতিতে পর্যটনের অবদান জিডিপির ১০ শতাংশেরও বেশি। বিপরীতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পর্যটন খাত জাতীয় জিডিপিতে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ অবদান রাখছে।
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পর্যটন শিল্পের আকার দাঁড়াবে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। তখন পর্যটন খাত বৈশ্বিক জিডিপিতে প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ অবদান রাখবে। অর্থাৎ আগামী এক দশকে পর্যটন আর কেবল একটি সেবামূলক খাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও পর্যটনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউটিটিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৩ কোটি মানুষ সরাসরি পর্যটন খাতে কর্মরত থাকবে। ধারণা করা হচ্ছে, বৈশ্বিকভাবে প্রতি নয়টি চাকরির মধ্যে একটি কোনো না কোনোভাবে পর্যটন সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পর্যটনে প্রণোদনা, সহজ ভিসা ব্যবস্থা, উন্নত অবকাঠামো এবং চীনের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বৃদ্ধিও বৈশ্বিক পর্যটন সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যেসব দেশ সময়োপযোগী নীতি প্রণয়ন করতে পারবে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে এবং কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ করবে, তারাই এই দ্রুত সম্প্রসারিত বাজারের বড় অংশ দখল করতে সক্ষম হবে।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রতি দশ ডলার ব্যয়ের মধ্যে এক ডলারই ব্যয় হয়েছে পর্যটনে। একই সময়ে পর্যটন খাতের বৈশ্বিক জিডিপিতে অবদান আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে। ২০১৯ সালে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
যেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে বার্ষিক ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে পর্যটন খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এই ব্যবধান প্রমাণ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও পর্যটন এখন বাস্তব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা এই বৈশ্বিক চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। দেশের পর্যটন শিল্প ক্রমেই অভ্যন্তরীণ পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যার ফলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এবং তাদের ব্যয় উভয়ই হ্রাস পাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যটক আগমন বাংলাদেশে
২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মোট প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৩৩ লাখে। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২২ সালের 'ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স' অনুযায়ী, ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় বিদেশি পর্যটক আগমনে শীর্ষে রয়েছে ভারত, এরপর মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা। ২০২৩ সালে ভারত পর্যটন খাত থেকে আয় করেছে প্রায় ৩২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৩৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে শ্রীলঙ্কার পর্যটন আয় বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর বিপরীতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ লাখ ৫৫ হাজার। যদিও এটি আগের বছরের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি, তবে বিদেশি পর্যটকদের মোট ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার কমেছে। ডলারপ্রতি ১২২ টাকা হিসেবে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা।
জিডিপিতে অবদানে পিছিয়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান মাত্র ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। তুলনামূলকভাবে মালদ্বীপে পর্যটনের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ৬ শতাংশ, ভুটানে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন আয়ের সিংহভাগ আসে অভ্যন্তরীণ পর্যটন থেকে। বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে বার্ষিক ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন টাকা আয় একটি শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ভ্রমণ ব্যয় বেশি
বাংলাদেশ এখনো জনপ্রিয় বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্যের তালিকায় স্থান পায়নি এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও সীমিত। পর্যটন খাত প্রধানত দেশীয় ভ্রমণকারীদের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই নির্ভরশীলতার পরেও বাংলাদেশে ভ্রমণ ব্যয় প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
নিকটবর্তী বিভিন্ন গন্তব্যে বাংলাদেশ থেকে কম খরচে ভ্রমণ করা সম্ভব। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ভারতে পর্যটন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিয়মিত ভ্রমণকারী ও ট্যুর অপারেটরদের মতে, বাংলাদেশের হোটেল ও রিসোর্টের ভাড়া সমমানের অনেক দেশের তুলনায় বেশি। পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে চড়া, পাশাপাশি খাবারের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে ভ্রমণ ব্যয় বেশি। সমমানের হোটেল ও রিসোর্টে বাংলাদেশে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়া হয়। বিমান ভাড়া, বাস ভাড়া এবং দর্শনীয় স্থান ঘোরার জন্য যানবাহন ভাড়াও তুলনামূলকভাবে বেশি। রেস্তোরাঁর খাবারের দামও আঞ্চলিক মানদণ্ডে অত্যন্ত চড়া।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের পর্যটনে উচ্চ ব্যয়ের অন্যতম কারণ হলো স্বল্পমেয়াদি লাভের মানসিকতা। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও পর্যটনবান্ধব নীতিমালার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সম্ভাবনা আছে, প্রস্তুতি নেই
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিপুল। কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চল, সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। তবুও বাংলাদেশ এখনো প্রধান বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্যগুলোর তালিকায় অনুপস্থিত।
সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, বিনিয়োগ ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা পর্যটন খাতের দ্রুত বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালে প্রণীত 'ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান' বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সহজ ভিসা ব্যবস্থা, অনলাইন ও ই-ভিসা সুবিধার সম্প্রসারণ, বিমানবন্দরে হয়রানি কমানো, কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে অবস্থিত কূটনৈতিক মিশনগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বৈশ্বিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের অর্থবহ প্রবেশ সম্ভব নয়।
বিশ্ব যখন ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যটন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে নীতিগত সামঞ্জস্য, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
