পরিবহনের সময় তৈরি পোশাক পণ্য চুরি ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ
করোনা পরিস্থিতি, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া, পণ্যমূল্য কমে যাওয়া আর বন্দরে রপ্তানিমুখী পণ্যের জটের মধ্যে উদ্যোক্তাদের কাছে নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে মহাসড়কে পরিবহন থেকে পোশাক পণ্য চুরি। গত কয়েক বছর আগে এ সমস্যা তৈরি হলেও পরবর্তীকালে তা কমে আসে। কিন্তু গত চার পাঁচ মাস থেকে এ সমস্যা ফের প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রপ্তানি পণ্য বিদেশে বায়ারের কাছে পৌঁছানোর পর চুরির বিষয়টি ধরা পড়ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত তিন চার মাসে এই প্রবণতা বেড়েছে। একটি পরিবহনে যে পরিমাণ পণ্য থাকে তার মধ্য থেকে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বায়ারের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা।
ইস্যুটি নিয়ে সোমবার পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সভা করে এর প্রতিকার চেয়েছেন।
সভা সূত্র জানিয়েছে, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে পুরো ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক জুড়ে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। অন্যদিকে, পরিবহন মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সব পণ্যবাহী পরিবহনে যেন ট্র্যাকার লাগানো হয়। সেক্ষেত্রে ওই পরিবহন কখন কোথায় থাকছে, কিংবা হাইওয়ের পাশে অন্য কোথায় যাচ্ছে, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
এছাড়া সমস্যা সমাধানের রপ্তানিকারক, পরিবহন মালিক, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার কারণে বাংলাদেশের ওপর আমদানিকারকের আস্থা কমে যাবে।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী টিবিএসকে বলেন, 'এই ঘটনাকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। ক্রেতা আস্থা হারাতে শুরু করলে এক সময়ের চিংড়ির মতো পোশাকের বাজারও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।'
গত ১৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের একটি নিটওয়্যার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রামমুখী পরিবহন থেকে ১৫,১৭৮ পিস পোশাক চুরি হয়, যার মূল্য ৮৩ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। এই পণ্যের আমদানিকারক দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর পাঁচদিন পর একই রপ্তানিকারকের আরও দুই দফা ১০ হাজার ও ২০,১০০ পিস পোশাক চুরি হয়ে যায় সড়ক থেকে, যার মূল্য ৮০ হাজার ডলার। আমদানিকারক দেশ ছিল ইতালি ও জার্মানি।
দুই মাস পর ঘটনা জানার পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করে প্রতিষ্ঠানটি।
একইভাবে গত মে'র পাঁচ তারিখে আদমজী ইপিজেডের একটি প্রতিষ্ঠানের ৬ হাজার পিস, গাজীপুরের একটি রপ্তানিকারকের ৯ হাজার ২৭০ পিস, আশুলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার পিসসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের পোশাক পণ্য চুরি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএ'র একটি সূত্র জানায়, সাতটি ঘটনায় প্রায় ৫৮ হাজার পিস পোশাক চুরি হয়, যার মূল্য প্রায় তিন লাখ ডলার। এর মধ্যে অবশ্য বন্দর থেকে পণ্য রপ্তানি হওয়ার আগেই ঘটনা জানার পর ট্রান্সপোর্ট মালিক ও পুলিশের সহায়তা দুই রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের আংশিক মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
এসএম মান্নান কচি টিবিএসকে বলেন, 'এ ঘটনা বায়ারদের কাছে আমাদের রপ্তানিকারকদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা লাগানো হবে বলে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সব পণ্যবাহী পরিবহনে ট্র্যাকার লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া এবং এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।'
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমাদের কাছে গত ছয় মাসে এ ধরনের ৫০টির বেশি অভিযোগ এসেছে। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, অনেক পণ্যবাহী পরিবহন বড় বড় ওয়্যারহাউসে ঢুকে যায়। সেখানে ড্রাইভার, হেল্পারের যোগসাজসে চোরাইপণ্য বিকিকিনির সঙ্গে জড়িত চক্র বিশেষ কায়দায় দ্রুত পণ্য বের করে নিয়ে যায়।'
তিনি বলেন, '৮০ ভাগ ঘটনায়ই ড্রাইভার-হেল্পার জড়িত। আমাদের অনেক গাড়িতে ট্র্যাকার লাগানো রয়েছে। শতভাগ গাড়িতে দ্রুতই ট্র্যাকার লাগানোর ব্যবস্থা করব।'
হাইওয়ে পুলিশের (কুমিল্লা রিজিয়ন) এসপি মো. রহমত উল্লাহ টিবিএসকে বলেন, এসব পণ্য চুরি হয় মূলত হাইওয়ের বাইরে শাখা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে। যেখানে তার লোক ঠিক করা থাকে। তিনি মনে করেন, রপ্তানিমুখী গাড়িতে রপ্তানিকের প্রতিনিধি রাখা, জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো এবং কাভার্ড ভ্যানের পেছনের ডালা (যেটা খুলে মূলত চুরি করা হয়) ফিক্সড করে লাগানোর ব্যবস্থা থাকলে চুরি করা সম্ভব হবে না।
দেশের আমদানি রপ্তানির লাইফলাইন বলে মনে করা হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েকে। ইএবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ পণ্য পরিবহনে এই মহাসড়ক ব্যবহার করতে হয়।
