ইনফান্তিনোর গদি বাঁচাতে ‘যা যা সম্ভব সবকিছু’ করবেন ট্রাম্প—দাবি মার্কিন কর্মকর্তার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে পদচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে 'যা যা সম্ভব সবকিছু' করবেন বলে দাবি করেছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির ২০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা শুক্রবার ভেস্তে যাওয়ার পর ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে।
সোমবার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, নিজের অবস্থান শক্ত করতে ইনফান্তিনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। তবে ফিফা ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ দাবি অস্বীকার করেছে।
তবে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত 'এখন পর্যন্ত সেরা বিশ্বকাপ' আয়োজনের ক্ষেত্রে সহায়তা করায় ট্রাম্প ইনফান্তিনোর প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠেছেন এবং তিনি চান ইনফান্তিনো দায়িত্বে বহাল থাকুন।
বিশ্বকাপ চলাকালে ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে ফরওয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য তিনি ইনফান্তিনোকে অনুরোধ করেছিলেন। এ ঘটনায় টুর্নামেন্টজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, 'জিয়ান্নি আমাদের এখন পর্যন্ত সেরা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে অনেক সহায়তা করেছেন। প্রেসিডেন্ট তাকে খুবই পছন্দ করেন। আমি নিশ্চিত, তাকে সাহায্য করতে প্রেসিডেন্ট যা যা সম্ভব সবকিছুই করবেন।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট তার বিষয়ে মত বদলাবেন বলে আমি মনে করি না, কারণ তিনি বিশ্বস্ত মানুষ। জিয়ান্নি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রকে সফলভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে সহায়তা করেছেন। আমরা সেটির মূল্য দিই।'
কেলেঙ্কারির আগে ট্রাম্প জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে ইনফান্তিনোকে দেখতে চেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, বর্তমান জাতিসংঘ আর তার উদ্দেশ্য পূরণে উপযুক্ত নয়।
২০১৬ সালে ফিফার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ইনফান্তিনো ২০১৮ সালের আগস্টে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই দৃষ্টি কাড়েন। তিনি মজা করে ট্রাম্পকে একটি লাল ও একটি হলুদ কার্ড উপহার দিয়ে বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যম সামলাতে এগুলো তার কাজে লাগতে পারে।
এরপর থেকে দুজনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। গত ডিসেম্বরে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনো ট্রাম্পকে 'ফিফা শান্তি পুরস্কার' দেন। বহু কাঙ্ক্ষিত নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার পর এই সম্মান দেওয়া হয় তাকে। অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে তার নাম খোদাই করা একটি সোনালি ট্রফি ও গলায় পরার জন্য একটি স্মারক পদকও দেওয়া হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট সোমবার দাবি করেছে, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর ইনফান্তিনো ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। শুক্রবার এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, এ নিয়ে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি।
গ্লোবাল পার্টনারশিপবিষয়ক বিশেষ দূত পাওলো জামপোলি বলেন, 'জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সাফল্য শুধু ফুটবলের ধনী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থ রক্ষা নয়; তিনি আরও বেশি দেশ, আরও বেশি জনগোষ্ঠী এবং আরও বেশি শিশুর জন্য ফুটবলকে উন্মুক্ত করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'তিনি উদ্বেগের বিষয়গুলো শুনেছেন এবং একজন নেতার মতোই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ফুটবলের সম্পদ ও সুযোগ কীভাবে ২১১টি সদস্যদেশের সবার কাছে পৌঁছাবে, কেবল সুবিধাভোগী কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।'
এদিকে ইনফান্তিনোকে সরাতে নতুন বৈশ্বিক জোট গঠনের প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)। একই সময়ে আফ্রিকা ও এশিয়ার সমর্থন আদায়ে তৎপর রয়েছে উয়েফা।
টেলিগ্রাফ স্পোর্ট জানিয়েছে, ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের পর তাকে ফিফা সভাপতির পদ থেকে সরানোর নেপথ্য উদ্যোগে এফএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনার পর এফএ সোমবার ইনফান্তিনোর প্রতি দেওয়া সমর্থনপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরিকল্পনাটির সঙ্গে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
আফ্রিকা ও এশিয়া মিলিয়ে ফিফার ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সদস্য ফেডারেশনের সংখ্যা ১০০, যা মোট সদস্যের প্রায় অর্ধেক। তবে এখন পর্যন্ত এই দুই মহাদেশের কোনো দেশ প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেনি।
বরং মরক্কো, কাতার, শ্রীলঙ্কা ও লেবাননের ফুটবল কর্তৃপক্ষ তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
অন্যদিকে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (সিএএফ) বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাবের বিরোধিতা না করে শুধু জানিয়েছে, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনার বিরোধিতা করলেও এখনো ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিতে প্রকাশ্যে যোগ দেয়নি।
তবে ইনফান্তিনোবিরোধী জোট গঠনে সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট আনতে হলে অন্তত তিন মাস আগে নোটিশ দিতে হয়।
জরুরি বৈঠকে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে সরব ছিলেন ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) চেয়ারম্যান এবং ফিফার সহসভাপতি ডেবি হিউইট। বৃহস্পতিবার উয়েফার সদস্যদের ওই বৈঠকে তিনি এবং ফিফা কাউন্সিলের অন্য সদস্যরাও একই কথা বলেন।
এর একদিন পরই নজিরবিহীন বিদ্রোহের মুখে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা প্রত্যাহার করেন ইনফান্তিনো।
এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় উয়েফা। সংস্থাটি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, ইনফান্তিনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে তাদের ৫৫টি সদস্যদেশ ফিফার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বয়কট করবে।
উয়েফার সহসভাপতি ও ওয়েলসের সাবেক অধিনায়ক লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার জরুরি বৈঠকে বয়কটের সম্ভাবনার কথা তুলেছিলেন।
সোমবার ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএডব্লিউ) এক বিবৃতিতে জানায়, ২০২৭-২০৩১ মেয়াদে ফিফা সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচনের জন্য জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রার্থিতার প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'সুশাসন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব, মূল্যবোধ, অংশীজন ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ এবং বিচক্ষণতার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কারণে ইনফান্তিনো বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্বে থাকার আস্থা হারিয়েছেন। ফুটবলের সর্বোচ্চ স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেওয়া এমন একটি ব্যর্থতা, যা আমরা মেনে নিতে পারি না।'
শনিবার উয়েফা 'গোপনে, দ্রুততার সঙ্গে এবং ফুটবলের জন্য সন্দেহজনকভাবে উপকারী' এমন পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য নতুন পরিকল্পনা তৈরির কথাও জানায়।
এর জবাবে এফএ জানায়, 'আমরা উয়েফার অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন করি। বিশ্ব ফুটবল যেন স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, ২১১টি সদস্যদেশের সবার স্বার্থ রক্ষা হয় এবং ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত হয়—সেজন্য এখন ফিফার নেতৃত্ব ও সুশাসনের পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর পর্যালোচনার সময় এসেছে।'
এদিকে নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, নরওয়ে ও সুইডেনসহ আরও কয়েকটি জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন ও কনফেডারেশনও ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের বিরোধিতা করেছে।
