ইরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারক’, আলোচনার জন্য ‘আকুতি’ জানিয়ে এখন অস্বীকার করছে: ট্রাম্প
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না—ইরানের এমন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে দেশটির নেতৃত্বকে 'অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা' করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে আলোচনা চলমান রয়েছে।
সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং খুব শিগগিরই আরও বৈঠক হবে।
তিনি লেখেন, "ইরানের নেতৃত্ব অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারক! তারা বৈঠকের অনুরোধ করেছেন, কেউ কেউ বলবেন 'আকুতি' জানিয়েছেন। আলোচনা শুরু হয়েছে, সামনে আরও বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। অথচ তারা প্রকাশ্যে ও গর্বের সঙ্গে বলছেন, কোনো আলোচনা হচ্ছে না, তারা শুধু ওমানের সঙ্গে কথা বলছেন।"
ট্রাম্প আরও লেখেন, "এরপর তারা আগের মতোই অর্থহীন কথা বলতে থাকে যে, হরমুজ প্রণালি তারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে; কিন্তু বাস্তবে এটি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং আমাদের অবরোধের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"
তিনি বলেন, "আমরা না চাইলে ইরানের দিকে কিছুই যেতে পারবে না। আর কোনো চুক্তি না হলে বা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করলে কিছুই পার হবে না। ইরান স্বীকার করুক বা না-ই করুক, তারা কয়েক দশক ধরে যে সংকট তৈরি করেছে, তার সমাধান নিয়েই আমরা আলোচনা করছি। বিষয়টি খুবই সহজ—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারবে না।"
তবে সিবিএস নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, চলমান পরোক্ষ আলোচনার বাইরে নতুন কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। বর্তমানে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের পরোক্ষ আলোচনা চলছে।
এর আগে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, "বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হচ্ছে না। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল নিশ্চিত করতে আমাদের আলোচনা হচ্ছে ওমানের সঙ্গে।"
পরে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং এর ফলে মঙ্গলবারের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, "প্রথম ধাপ হলো প্রণালি খুলে দেওয়া। দ্বিতীয় ধাপ হবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। এতে কিছুটা সময় লাগবে।" তিনি আরও দাবি করেন, "ভালো একটি চুক্তিতে সই করার জন্য এটিই ইরানের শেষ সুযোগ।"
তেহরানকে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে পরে সরে আসায় মার্কিন জনগণ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে—একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের জনগণের প্রাণহানির কথা বিবেচনা করেই ধৈর্য দেখাচ্ছেন।
তিনি বলেন, "চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আমি তাদের শেষ সুযোগটি দিতে চাই। আশা করি, তারা বাস্তবতা বুঝতে পারবে।"
এ সময় ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে, আর এতে বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো 'অতিরিক্ত মুনাফা' করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের অনুরোধে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দেওয়া থেকে সরে আসেন।
তিনি জানান, রোববার ইরানের ওপর 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলা' চালানোর পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আহ্বান এবং ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তার অনুরোধের পর তিনি সেই পরিকল্পনা বাতিল করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে ট্রাম্প কয়েক দফা ইরানের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদারের হুমকি দিলেও পরে সেসব অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
সমালোচকদের মতে, তার এই দ্বিধা হয়তো প্রশাসনের ভেতরে এমন একটি উপলব্ধির ইঙ্গিত দেয় যে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে পিছু হটানো বা কয়েক মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের অবসান ঘটানো সহজ নয়। অথচ ট্রাম্প শুরুতে এই যুদ্ধকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি এখন সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর যুদ্ধের শুরুতে দেওয়া অবরোধ আবারও কার্যকর করেছে ইরান। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হচ্ছে।
রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, "উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য এমন একটি নৌপথ নিয়ে আমরা সমঝোতায় পৌঁছাতে যাচ্ছি। এটি উত্তর বা দক্ষিণ—কোনোটিই হবে না; বরং এমন একটি পথ হবে, যা উভয় পক্ষের সার্বভৌম অধিকারকে সম্মান করবে এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।"
তবে বাঘাই স্পষ্ট করে বলেন, এমন কোনো সমঝোতা হলেও তার অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে।
