ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া ইভেন্ট হওয়ার পথে বিশ্বকাপ ফাইনাল
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট বিক্রি শুরুর পর থেকেই এর দাম নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। ফিফা প্রথম দফায় টিকিট ছাড়ার সময়ও মূল্য ছিল অনেক বেশি। স্টেডিয়ামের ওপরের সারির অনেক আসনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল চার হাজার ২১০ ডলার, আর মাঠের কাছাকাছি আসনের জন্য গুনতে হচ্ছিল ছয় হাজার ৭৩০ ডলার।
পরবর্তী সময়ে ফিফা টিকিটের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। ক্যাটাগরি-১ আসনের মূল্য উঠে যায় ১০ হাজার ৯৯০ ডলারে। এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
তবে ফাইনালের আগমুহূর্তে টিকিটের পুনর্বিক্রয় বাজারের চিত্র দেখাচ্ছে, ফিফার নির্ধারিত দামও তুলনামূলক কম মনে হচ্ছে। বিভিন্ন পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের দাম ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া ইভেন্টের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
টিকিট বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম সিটগিক জানিয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটে বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট কেনা ক্রেতাদের গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৫১ ডলার। এটি ২০২৪ সালের সুপার বোলের আগের রেকর্ডের চেয়েও ২ হাজার ডলারের বেশি।
২০২৪ সালের সুপার বোল, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্সিসকো ফোর্টি নাইনআর্স ও কানসাস সিটি চিফস, সেই ম্যাচের পুনর্বিক্রয় বাজারে গড় টিকিট মূল্য ছিল ১০ হাজার ৫৪০ ডলার। দীর্ঘদিন ধরে এটিই ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্রীড়া ইভেন্টের টিকিটের রেকর্ড।
২০২৬ সালের এনবিএ ফাইনাল ঘিরেও টিকিটের দাম ব্যাপক বেড়েছিল। নিউইয়র্ক নিক্স ও সান অ্যান্টোনিও স্পার্সের মধ্যকার তৃতীয় ম্যাচের টিকিটের গড় পুনর্বিক্রয় মূল্য সিটগিকে ৯ হাজার ৩৩ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের দাম এর চেয়েও অনেক বেশি।
অন্যদিকে স্টাবহাব জানিয়েছে, তাদের হিসাবে বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের চাহিদা এখনো ২০২৪ সালের সুপার বোলের তুলনায় সামান্য কম। এনবিএ ফাইনালের ষষ্ঠ ম্যাচের চাহিদার সঙ্গেও এটি তুলনীয়। তবে সেই ষষ্ঠ ম্যাচ শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি, কারণ নিক্স পাঁচ ম্যাচেই শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের এত উচ্চমূল্যের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ভেন্যুর বিশাল আকার। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপ ম্যাচের জন্য এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার ৬৬৩ জন, যা ২০২৪ সালের সুপার বোলের ভেন্যু অ্যালিজিয়েন্ট স্টেডিয়ামের ৬১ হাজার ৬২৯ আসনের চেয়ে অনেক বেশি।
টিকিট বাজার বিশ্লেষক কিথ পাগেলো বলেন, এত বড় স্টেডিয়ামে এত বেশি দামে টিকিট বিক্রি হওয়া বিষয়টিকে আরও উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে।
টিকিটডাটা ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, 'গেট-ইন প্রাইস' বা কোনো ইভেন্টে প্রবেশের জন্য পাওয়া সবচেয়ে কম দামের টিকিটও বিশ্বকাপ ফাইনালের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে বেশি। আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ফাইনালের সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রায় ৭ হাজার ৬০০ ডলার ছিল।
এই দাম ছাড়িয়ে গেছে—
মহামারির পর অনুষ্ঠিত সব সুপার বোলের টিকিট মূল্যকে;
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক দুটি এনবিএ ফাইনালের টিকিট মূল্যকে;
কলেজ ফুটবল প্লে-অফের সব চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের টিকিট মূল্যকে।
এর আগে ২০১৫ সালের সুপার বোলের সময়ও টিকিটের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছিল। নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টস ও সিয়াটল সিহকসের সেই ম্যাচের আগে সবচেয়ে কম দামের টিকিট প্রায় ১১ হাজার ডলারে পৌঁছেছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সেটি ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা, কারণ কিছু টিকিট ব্যবসায়ী প্রকৃত টিকিট না থাকা সত্ত্বেও আগাম বিক্রি করেছিলেন। ফলে শেষ মুহূর্তে চাহিদা ও সরবরাহের বড় সংকট তৈরি হয়েছিল।
বিশ্বের অন্যান্য বড় ক্রীড়া ইভেন্ট—যেমন দ্য মাস্টার্স গলফ টুর্নামেন্ট, উইম্বলডন টেনিস, অলিম্পিকের কিছু ফাইনাল, বড় মাপের বক্সিং ম্যাচ কিংবা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল—এমন উচ্চমূল্যের টিকিটের জন্য পরিচিত হলেও, বিশ্বকাপ ফাইনালের বাজার পরিস্থিতি আলাদা।
কারণ, এর দর্শকভিত্তি শুধু একটি দেশকেন্দ্রিক নয়; বরং এটি পুরো বিশ্বের মানুষের আগ্রহের বিষয়।
ফিফার পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে ফাইনালের সবচেয়ে কম দামের টিকিটের মূল্য বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ছিল আট হাজার ২৮০ ডলার। সেটি ছিল মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ওপরের সারির একেবারে শেষ দিকের আসন।
ক্যাটাগরি-১ আসনের সর্বনিম্ন মূল্য ছিল ১২ হাজার ডলারের বেশি। তৃতীয় পক্ষের পুনর্বিক্রয় সাইটগুলোতে একই ধরনের আসনের দাম ছিল প্রায় ১১ হাজার ৫০০ ডলার।
স্টাবহাবে সাত হাজার ৮০০ থেকে ১০ হাজার ডলারের মধ্যে প্রায় ১৩৫টি টিকিট তালিকাভুক্ত ছিল। তবে এগুলোর বেশির ভাগই ছিল ওপরের বা মাঝামাঝি সারির আসন। নিচের সারির সবচেয়ে কম দামের টিকিট ছিল দুইটি আসনের জন্য ১০ হাজার ৮০৩ ডলার।
তবে ফাইনালের টিকিটের দাম সবসময় এত বেশি ছিল না। এক মাস আগেও দাম বর্তমানের তুলনায় বেশি ছিল। ডিসেম্বরের শুরু থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত সবচেয়ে কম দামের টিকিট সাধারণত ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার ডলারের মধ্যে ছিল।
এরপর জুনের শুরুতে দাম কিছুটা কমে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার ডলারের মধ্যে আসে। কিন্তু বিশ্বকাপের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার দাম দ্রুত বেড়ে প্রায় ১২ হাজার ডলারে পৌঁছে যায়।
২৩ জুনের দিকে টিকিটের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর আবার কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সোমবার একটি টিকিট ছয় হাজার ৭০০ ডলারের কমেও পাওয়া যাচ্ছিল।
তবে সেমিফাইনাল শুরু হওয়ার পর এবং আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ের পর ফাইনালের টিকিটের সর্বনিম্ন দাম আবার আট হাজার ডলারের কাছাকাছি উঠে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ফাইনালে আর্জেন্টিনার উপস্থিতি এবং এটি লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হওয়া টিকিটের চাহিদা বাড়ার একটি কারণ। তবে মেসির ফাইনালে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার আগেই বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রতি অভূতপূর্ব আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
সিটগিকের বিপণন বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ক্রিস লেইডেন বলেন, এই চাহিদা দেখাচ্ছে—বিশ্বকাপ ফাইনাল কতটা বিরল এবং বৈশ্বিক একটি মুহূর্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপার বোলের তুলনায় বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট বাজার অনেক বেশি আন্তর্জাতিক। স্টাবহাবের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট ক্রেতাদের ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক ক্রেতা, যেখানে ২০২৪ সালের সুপার বোলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের ক্রীড়া ইভেন্টে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকিটের দাম মূল্যস্ফীতির চেয়েও দ্রুত বেড়েছে।
বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রির শুরু থেকেই ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের এই উচ্চমূল্যের বাজার এবং তুলনামূলকভাবে কম নিয়ন্ত্রিত পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছে। কিছু ম্যাচের ক্ষেত্রে ফিফার নির্ধারিত দাম বাজারের তুলনায় বেশি হলেও অধিকাংশ ম্যাচের টিকিট শেষ পর্যন্ত পুনর্বিক্রয় বাজারে মূল দামের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, ফিফা চাইলে আরও বেশি দাম নির্ধারণ করেও স্টেডিয়াম পূর্ণ রাখতে পারত।
এত উচ্চমূল্যের টিকিট থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ বিশ্বকাপ দর্শক উপস্থিতির নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। পুরো টুর্নামেন্টে স্টেডিয়ামগুলো গড়ে ৯৯ শতাংশের বেশি পূর্ণ ছিল।
শনিবার ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের কিছু টিকিট এখনো পাওয়া গেলেও, রোববারের ফাইনাল হবে সম্পূর্ণ বিক্রি হওয়া ম্যাচ।
টেলিভিশন দর্শকের সংখ্যার দিক থেকেও এই ফাইনাল অন্য সব ক্রীড়া ইভেন্টকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বের ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ ম্যাচটি দেখবেন। ম্যাচটি পূর্ব উপকূলীয় সময় দুপুর ৩টায় শুরু হবে।
