বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনাকে ‘আজীবন’ নির্বাসনের দাবিতে ২৩ মিলিয়ন স্বাক্ষর!
আর্জেন্টিনা ভক্তদের বড় অংশের দাবি, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে তাদের জয় ছিনতাই হয়েছে। কিন্তু এবার ঘটল এক অভাবনীয় বাঁকবদল। ট্যাঙ্গো ড্যান্সারদের চিরতরে বিশ্বকাপ থেকে নির্বাসিত করার দাবি উঠেছে।
বিশ্বকাপে এই লাতিন আমেরিকান দললের আজীবন নিষেধাজ্ঞার দাবিতে তৈরি 'লিভ, আর্জেন্টিনা' পিটিশনে সই করেছেন ২৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ।
ইউরো নিউজের তথ্যমতে, এই পিটিশনে সইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ ১৬ হাজার ১০৮। পিটিশনে ফিফা ও সংস্থাটির রেফারিদের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা ও তাদের অধিনায়ক লিওনেল মেসির পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে একটি প্রশ্ন: 'বিজয়ী কে হবে, তা যখন আগে থেকেই জানা, তখন বাকি বিশ্বের দলগুলো প্রতিযোগিতায় নামবে কেন? আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া হোক। সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া হোক।'
রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে
পিটিশনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ৫ মিলিয়ন সই সংগ্রহ। কিন্তু বাস্তবে সইয়ের অস্নখা সেই লক্ষ্যমাত্রাকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। ফিফার 'পক্ষপাতিত্ব' ও মাঠে রেফারিদের নির্লজ্জ আনুকুল্যের অভিযোগের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যে তীব্র 'প্রত্যাখ্যানের' হাওয়া উঠেছে, এ যেন তারই বহিঃপ্রকাশ।
সই গ্রহণের সময়সীমা এখন শেষ। তবে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পিটিশনের রেকর্ড ভাঙার দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতায় বর্তমান রেকর্ডটি রয়েছে 'জুবিলি ২০০০'-এর দখলে। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অপরিশোধযোগ্য ঋণ ২০০০ সালের মধ্যে মওকুফের দাবিতে ১৯৯৭ সালে সেই পিটিশনে সই পড়েছিল ২৪ মিলিয়নের বেশি।
'কথা রেখেছে স্পেন'
বিপুলসংখ্যক সই জমা পড়লেও আর্জেন্টিনাকে বাদ দেওয়ার দাবিতে কেউই সাড়া দেয়নি। তাহলে এই কোটি কোটি স্বাক্ষরকারীর একমাত্র সান্ত্বনা কী? সান্ত্বনা একটাই— ফাইনালে হেরেছে আর্জেন্টিনা।
পিটিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে একটি চূড়ান্ত বার্তার মাধ্যমে এর সমাপ্তি টানা হয়েছে: 'ফিফা আমাদের উপেক্ষা করেছে, কিন্তু স্পেন তাদের কথা রেখেছে। ধন্যবাদ স্পেন।'
বিশ্বকাপ ফাইনালে কী ঘটেছিল?
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে তারা আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১০৬ মিনিটের মাথায় নিকো উইলিয়ামসের পাসে বল পেয়ে একমাত্র জয়সূচক গোলটি করেন ফেরান তোরেস।
বিতর্কে মোড়ানো ফাইনালের দায়িত্ব সামলেছিলেন স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। আর্জেন্টিনার ম্যাক অ্যালিস্টার ও নিকোলাস তালিয়াফিকো এমন ফাউল করেও কার্ডের হাত থেকে বেঁচে যান, যা অনেকের মতেই শাস্তিযোগ্য ছিল। অন্যদিকে স্পেনের নিকো উইলিয়ামস ও ফেরান তোরেসের দুটি গোল বাতিল করে দেওয়া হয়।
এই হার শেষবেলায় এসে লিওনেল মেসিকে আরও একটি শিরোপা থেকে বঞ্চিত করেছে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আগেই জানিয়েছিলেন, দেশের হয়ে এটাই তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ইন্টার মায়ামি তারকা কেবল শিরোপাই হারাননি, হাতছাড়া করেছেন গোল্ডেন বুট ও টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুটও। ২২ গোল নিয়ে দুটি খেতাবই বগলদাবা করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।
একের পর এক বিতর্ক
কেবল ফাইনালই একমাত্র বিতর্কিত ম্যাচ ছিল না। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই রেফারিংয়ের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনাকে ঘিরে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে খেলোয়াড়দের উগ্র আচরণ—ধাক্কাধাক্কি, জার্সি টেনে ধরা থেকে শুরু করে বেপরোয়া ট্যাকল।
বিতর্কের শুরু আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচে, আইসা মান্ডির ওপর মেসির ভয়ানক ট্যাকল দিয়ে। বেশ কয়েকজন রেফারিং বিশেষজ্ঞের মতে, ওই ফাউলের জন্য ট্যাঙ্গো অধিনায়কের লাল কার্ড পাওয়াই উচিত ছিল।
বারুদে আসল অগ্নিসংযোগটা ঘটে শেষ ষোলোতে, মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে। মেসি ও তার সতীর্থরা খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেন। কিন্তু ম্যাচ শেষে মিশরেয় ম্যানেজার হোসাম হাসান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, মাঠ ও মাঠের বাইরের নানা সমীকরণে হেরেছে তার দল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, টুর্নামেন্টে মেসিকে টিকিয়ে রাখার পেছনে মার্কেটিং স্বার্থ কাজ করেছে।
ফাইনাল পুনরায় খেলানোর দাবিতে পিটিশন
ব্রাজিলীয় ওয়েবসাইট গ্লোবো-র তথ্যমতে, জিজেলা সানচেজ নামক এক আর্জেন্টাইন সমর্থক রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এক পোস্টে তিনি ফিফার কাছে রেফারির সেই সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি জানান, যার ফলে ম্যাচের গতিপথই বদলে গিয়েছিল বলে তার দাবি।
সানচেজের যুক্তি, ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই শিরোপাবঞ্চিত হয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি পুনরায় খেলানোর দাবিতে চেঞ্জ ডট ওআরজি-তে একটি পিটিশন খোলা হয়েছে। এতে ইতিমধ্যেই ৬১ হাজারের বেশি সই পড়েছে সই পড়েছে।
তবে এই অভিযোগের সপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। একই অভিযোগ তুলে অতিরিক্ত সময়ে নিষ্পত্তি হওয়া এই ফাইনাল আবার খেলার দাবি জানিয়ে আসছেন আরও অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থক।
