বিশ্বকাপে স্পেনের জয়ে যুদ্ধের মধ্যে মিলল সাময়িক স্বস্তি, আনন্দে মাতল গাজাবাসী
রোববার রাতে মধ্য গাজার খোলা আকাশের নিচের একটি অস্থায়ী ভেন্যুতে বড় একটি পর্দার সামনে এসে বসেন কয়েক ডজন মানুষ। মূলত তরুণদের নিয়ে গঠিত ওই দর্শকদলের প্রত্যেকে পুরুষদের বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখতে ১০ শেকেল (প্রায় ৩ দশমিক ৩০ মার্কিন ডলার) করে প্রবেশমূল্য পরিশোধ করেন। এই মূল্যের মধ্যেই একটি পানীয়ের ব্যবস্থাও ছিল। এভাবে তারা বিশ্বের একশ কোটিরও বেশি দর্শকের সঙ্গে একযোগে ফাইনাল উপভোগ করেন।
অস্থায়ী ওই ক্যাফের মালিক ও আয়োজক ৩১ বছর বয়সী হাইথাম জিদান জানান, বড় পর্দা বসানো এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করেছেন।
খেলা চলাকালে চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রতিবারই জিদান উপস্থিত দর্শকদের অনুরোধ করেন, তারা যেন নিজেদের মোবাইল ফোনের চার্জার খুলে রাখেন, যাতে ক্যাফেটি চালিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকে।
দুই ঘণ্টারও বেশি সময় পর, ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ১-০ গোলের পরাজয়ে সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন।
জিদান বলেন, 'আমার মনে হচ্ছিল, আমি সত্যিই সফল কিছু তৈরি করতে পেরেছি। মরক্কো ও মিসর বিদায় নেওয়ার পর মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজ রাতে আমি দেখেছি, তরুণরা হাসিমুখে, হাততালি দিতে দিতে এবং স্পেনের পতাকা উড়িয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্তত দুই ঘণ্টার জন্য হলেও তারা যুদ্ধের কথা ভুলে থাকতে পেরেছে।'
গাজা ও পশ্চিম তীর—উভয় অঞ্চলের অনেক ফিলিস্তিনি কেবল ফুটবলের কারণেই নয়, এর বাইরেও নানা কারণে পুরো বিশ্বকাপজুড়ে স্পেনকে সমর্থন করেছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল স্পেন। পাশাপাশি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও প্রাথমিক সমর্থকদের একটি দেশ ছিল স্পেন। ২০২৪ সালের মার্চে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।
স্পেন দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ও প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
মে-তে ১৯ বছর বয়সী স্প্যানিশ বিস্ময়কর প্রতিভা লামিন ইয়ামাল এ বছরের স্প্যানিশ লিগ জয়ের পর বার্সেলোনায় উদ্যাপনের সময় ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছিলেন। পরে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায়ও ওই পতাকা হাতে নিজের একটি ছবি প্রকাশ করেন।
স্পেনের জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষ উল্লাস করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্পেনের জার্সি পরে ছিলেন। অনেককে চেয়ার উঁচিয়ে ধরতে এবং আনন্দধ্বনি করতে দেখা যায়।
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলতও রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পেনকে তাদের জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান।
রোববার রাতে গাজার দর্শকদের একজন মুতাজ রাবি বলেন, 'আমরা স্পেনকে সমর্থন করেছি, কারণ আমাদের মনে হয়েছে, তাদের কয়েকজন খেলোয়াড় আমাদের ওপর যা ঘটছে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন। গোলটি হওয়ার পর আমার চোখে পানি চলে এসেছিল।'
অন্যদিকে, ইসরায়েলের অনেক ফুটবল সমর্থকের জন্য রাতটি ছিল হতাশার।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই ইসরায়েলি সমর্থকদের মধ্যে আর্জেন্টিনা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় দল। বিশেষ করে রোববারের ফাইনালে তাদের সমর্থন আরও বেশি ছিল।
ফাইনালের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন জানান এবং দেশটির রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইকে পাঠানো এক শুভেচ্ছাবার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, 'আমরা আপনাদের সমর্থন করছি এবং আগামীকালের ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষেই আছি।'
এ বছরের বিশ্বকাপে ফিলিস্তিন কিংবা ইসরায়েলের জাতীয় ফুটবল দল—কেউই অংশ নেয়নি।
এ কারণে ইসরায়েলি ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক উরি লেভির মতে, উভয় পক্ষের সমর্থকরাই অন্য দেশকে সমর্থন করে 'বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের প্রতিনিধিত্বের অনুভূতি খুঁজছিলেন।'
তবে লেভি সতর্ক করে বলেন, আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা হলে বাস্তবতার অত্যন্ত জটিল একটি চিত্রকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলা হবে।
তিনি বলেন, 'দুর্ভাগ্যজনকভাবে আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নানা স্তরে আলোচনার ধরন নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এখনকার পৃথিবীতে আপনি নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে পারেন না—আপনাকে কোনো না কোনো পক্ষ বেছে নিতেই হবে।'
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, 'আসলে এটাই ফুটবলের সবচেয়ে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।'
লেভি বলেন, ইসরায়েলে আর্জেন্টিনা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হওয়ার একটি কারণ হলো, দেশটি তরুণ ইসরায়েলি ভ্রমণকারীদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য।
এ ছাড়া ২০২২ সালের পুরুষদের বিশ্বকাপজয়ী দল হওয়ায় আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তাও সমর্থকদের আকৃষ্ট করেছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, 'এই দল মানুষকে বাস্তবতা থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে নিয়ে যায়, মানসিক মুক্তির অনুভূতি দেয়।'
তিনি আরও বলেন, 'ফাইনালের আগে পর্যন্ত আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচ যেন একটি চলচ্চিত্রের মতো ছিল।'
আরব বিশ্বেও অনেক সমর্থক আর্জেন্টিনার ওপর আগেই হতাশ হয়েছিলেন, কারণ নাটকীয় শেষ ষোলোর ম্যাচে তারা মিশরকে বিদায় করে দেয়।
ওই ম্যাচে মিশর ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু পরে আর্জেন্টিনা দ্রুত তিনটি গোল করে, যার শেষ গোলটি আসে যোগ করা সময়ে।
রোববার রাতে গাজার সমর্থকদের কাছে এই ম্যাচ ছিল যুদ্ধ ও সংঘাতময় বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তির একটি সুযোগ।
বিরতির সময় দর্শকদের প্রধান আলোচনার বিষয় ত্রাণ সহায়তা, বাস্তুচ্যুতি কিংবা যুদ্ধবিরতির আলোচনা ছিল না। বরং তারা খেলোয়াড় বদলি নিয়ে তর্ক করছিলেন, মিস হওয়া সুযোগ নিয়ে আফসোস করছিলেন এবং লামিন ইয়ামাল গোল করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বিতর্কে মেতে ছিলেন।
ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে কয়েক ডজন মানুষ পরস্পরের সঙ্গে—এবং বিশ্বের বাকি মানুষের সঙ্গে—একটি ক্ষণিকের বন্ধন ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন।
শেষে জিদান বলেন, 'আমার কাছে এটি শুধু ফুটবল ছিল না। শেষ বাঁশি বাজানোর মুহূর্তে মনে হয়েছে, আমরা সবাই মিলে বিরল এক আনন্দের মুহূর্ত ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলাম।'
