যুদ্ধের তহবিল জোগাতে পর্ন ইন্ডাস্ট্রি বৈধের পরিকল্পনা ইউক্রেনের, আয়ের অর্থ দিয়ে কিনবে ড্রোন
কয়েক সপ্তাহ পর পর বাড়ি ছেড়ে সভেতলানা দিভরনিকোভা ফ্রান্স বা স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের একটি ভাড়া করা বিলাসবহুল ভিলায় উঠেন। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কাছেই তার বাড়ি।
সেখানে পৌঁছে তিনি মেকআপ করেন এবং উইগ পরেন, পায়ে গলান হাই হিল আর ধারণ করেন একটি ছদ্মনাম। তবে যুদ্ধ থেকে বাঁচতে তিনি এই ভ্রমণ করেন না। প্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম 'অনলিফ্যানস'-এ তার ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) সাবস্ক্রাইবারের জন্য শো স্ট্রিম করতে তিনি বিদেশে যান। কারণ নিজের দেশ ইউক্রেনে এই কাজ করলে তাকে জেলে যেতে হতে পারে।
ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের চেয়ে ইউক্রেনের চিত্রটা আলাদা। দেশটিতে পর্নোগ্রাফি বানানো, অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নিজের কাছে রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড। তবুও ইউক্রেনে একটি বিশাল ও লাভজনক পর্ন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের সুরক্ষায় এই ব্যবসা চলছে। বর্তমানে ইউক্রেনীয় কর কর্তৃপক্ষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে কর দাবি করছে। কিন্তু যারা কর দিচ্ছেন, তারা অজান্তেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রেখে যাচ্ছেন।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক বিষয়টিকে একটি 'অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হাস্যকর' পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, 'এই নারীরা হয় কর দিচ্ছেন না এবং ফৌজদারি অপরাধের মুখোমুখি হচ্ছেন, অথবা কর দিয়ে পর্নোগ্রাফি আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছেন।'
এই জটিলতা কাটাতে দেশে পর্নোগ্রাফি বৈধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন ঝেলেজনিয়াক। তার মতে, এতে কেবল দুর্নীতির প্রতিরোধ হবে না, বরং বছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কর রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত ইউক্রেনের বার্ষিক প্রদেয় ১২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চাহিদার তুলনায় এই অঙ্ক হয়তো অনেক কম। কিন্তু ঝেলেজনিয়াকের হিসাবে, এই অর্থ দিয়ে অন্তত ৩০ হাজার ড্রোন কেনা সম্ভব।
পর্ন বৈধকরণের বিষয়ে ঝেলেজনিয়াকের সহ-রচিত একটি বিল গত জুলাইয়ে পার্লামেন্টের প্রথম ভোটে অনুমোদন পায়। বর্তমানে এটি দ্বিতীয় পাঠের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, আইনি জটিলতা ও জেল-জরিমানা এড়াতে হাজার হাজার ইউক্রেনীয় নারী বিদেশে গিয়ে কন্টেন্ট তৈরি করছেন। অনেকেই স্থায়ীভাবে দেশ ছেড়েছেন। এতে ইউক্রেনের বদলে অন্যান্য দেশের কর রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১০০ জনেরও বেশি অনলিফ্যানস মডেলের প্রনিধিত্ব করছেন আইনজীবী লেসিয়া মিখালেনকো। তিনি বলেন, 'এটি ভুক্তভোগীহীন একটি অপরাধ। এমন এক সময়ে যেখানে ইউক্রেনের দেশ রক্ষায় মনোযোগী হওয়া উচিত, সেখানে এখন আইনি ব্যবস্থার ওপর অযথা বাড়তি বোঝা চাপানো হচ্ছে।'
দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ এই ছায়া শিল্পের দিকে নজর দেয়নি। দেশের বড় বড় পর্ন স্টুডিওগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশ করে বিপুল মুনাফা করেছে।
সম্প্রতি মে মাসে ইউক্রেনের জেনারেল প্রসিকিউটরের কার্যালয় জানায়, তিনটি পৃথক অঞ্চলের পুলিশ বিভাগ এ খাত থেকে ঘুষ হিসেবে মাসে ২০ হাজার ডলারের বেশি পেত।
২০২২ সালে রাশিয়া আক্রমণ করার পর চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। যুদ্ধের দুই বছর পর ইউক্রেনের কর কর্তৃপক্ষ অনলিফ্যানস-এর যুক্তরাজ্যভিত্তিক মূল কোম্পানি 'ফেনিক্স ইন্টারন্যাশনাল' থেকে বিপুল তথ্য পায়।
সেই তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ জন ইউক্রেনীয় অনলিফ্যানস থেকে ১৩১ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছেন। অর্থাৎ, এখান থেকে লাখ লাখ ডলারের কর বকেয়া পড়েছে।
এরপরই দেশজুড়ে অনলিফ্যানস মডেলদের কাছে নোটিশ পাঠায় কর কর্তৃপক্ষ। অনেকের আয় ছিল মাসে ২০ হাজার ডলারেরও বেশি। ঝামেলা এড়াতে দিভরনিকোভাসহ অনেকেই কর জমা দেন। তবে এতে হিতে বিপরীত হয়। কর জমা দেওয়ায় কর ফাঁকির পাশাপাশি বেআইনিভাবে পর্ন তৈরির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার পথ খুলে যায়।
গত বছরের বসন্তের এক সকালে দিভরনিকোভা ও তার স্বামী যখন মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন পুলিশ তাদের বাড়িতে অভিযান চালায়। পর্নোগ্রাফি তৈরি করে বিক্রির অভিযোগে তার ল্যাপটপ, ফ্ল্যাশ ড্রাইভ এবং করের জন্য আলাদা রাখা ২ লাখ ডলার সমমানের নগদ অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়।
দিভরনিকোভা বলেন, 'পুলিশের কাছে ওয়েবক্যাম মডেলদের তালিকা ও ঠিকানা ছিল। অর্ধেক টাকা ঘুষ দিলে তাকে বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কর্মকর্তারা।' তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
সারাদেশেই এমন অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ২০ বছর বয়সী এক মডেল জানান, পুলিশি অভিযানের পর তিনি ইউক্রেনের অন্য এলাকায় আত্মগোপন করেন। আদালতে তলব করা হলেও ঘুষের ভয়ে তিনি যাননি।
আইনি ঝামেলা এড়াতে শত শত মডেল বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। জর্জিয়ায় বর্তমানে ইউক্রেনীয় অনলিফ্যানস মডেলদের বড় একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। তারা প্রতি মাসে হাজার হাজার ডলার আয় করছেন এবং রাজধানী তবিলিসির নাইট ক্লাবগুলোতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন।
অন্যদিকে, যারা ইউক্রেনের ভেতরে থেকে গেছেন, তারা বিকল্প উপায় বেছে নিয়েছেন।
সাবেক ওয়েট্রেস ইরিনা মোসিচুক 'বিজজোন' নামে একটি ব্যবসা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চালান। এর ওয়েবসাইটে আকর্ষণীয় নীতিবাক্য লেখা থাকলেও বাস্তবে এটি একটি ওয়েবক্যাম স্টুডিও। পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ শহরের উপকণ্ঠে একটি ছাপোষা ভবনে এটি অবস্থিত। সেখানে কয়েক ডজন মডেল মার্কিন গ্রাহকদের জন্য পারফর্ম করেন।
পারফর্ম করার সময় মডেলদের অ্যাপের মাধ্যমে রাশিয়ার বিমান হামলার সতর্কবার্তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সাইরেন বাজলে স্ট্রিম থামিয়ে তাদের বোমা শেল্টারে ছুটতে হয়। আক্ষেপ করে মোসিচুক বলেন, 'মিসাইল হামলা ব্যবসার জন্য খুবই ক্ষতিকর।'
মোসিচুক জানান, তার মডেলরা মাসে ২ হাজার থেকে ৭ হাজার ডলার আয় করেন। তিনি তাদের কর প্রদানে সাহায্য করেন। বিনিময়ে মডেলরা এমন এক চুক্তিতে সই করেন, তারা ক্যামেরার সামনে পুরো পোশাক খুলবেন না। গত বছর পুলিশ এখানে অভিযান চালালেও কোনো অপরাধের প্রমাণ পায়নি।
মোসিচুক ইউক্রেনীয় আইনপ্রণেতাদের চিঠি দিয়ে বলেছেন, তিনি মাসে যে ৫ হাজার ডলার কর দেন, তা ২০ গুণ বাড়ানো সম্ভব। এর জন্য কেবল এই খাতকে উন্মুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, 'আমি চাই না ইউক্রেন অন্য দেশের কাছে অস্ত্র সাহায্য চাক। আমাদের এই শিল্প বাড়লে আমরা নিজেরাই দেশকে সাহায্য করতে পারব।'
অনুরূপ যুক্তি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওয়েবসাইটে একটি আবেদন দাখিল করেন দিভরনিকোভা। তিনি জানান, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে ৪০ মিলিয়ন রিভনিয়া (প্রায় ৯ লাখ ডলার) কর দিয়েছেন। এই অর্থ দিয়ে সেনাবাহিনীর জন্য ১০০টি নতুন পিকআপ ট্রাক বা ২ হাজারটি ড্রোন কেনা সম্ভব।
এক সপ্তাহের মধ্যে তার আবেদনে ২৫ হাজারের বেশি স্বাক্ষর পড়ে, যা প্রেসিডেন্সিয়াল জবাব পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। এরপর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, পর্ন বৈধ করার আইনটি পার্লামেন্টে বিবেচনা করা হবে।
নতুন আইনটি পার্লামেন্টে বিবেচনায় থাকায় দিভরনিকোভার মামলাটি স্থগিত রাখা হয়েছে এবং বাজেয়াপ্ত করা অর্থও ফেরত দেওয়া হয়েছে। আপাতত তিনি দুটি আলাদা জীবন সামলাচ্ছেন। ইউক্রেনে তিনি সাধারণ গৃহিণী, আর বিদেশে গেলে অনলাইন সেলিব্রিটি। ইউক্রেনে তার অনলিফ্যানস অ্যাকাউন্ট দেখা যায় না।
নিজের এই দ্বৈত পরিচয় নিয়ে তিনি বলেন, 'ইউক্রেনে আমি কে তা সবাই জানে, কিন্তু সেই জগতে আমি কে—তা কারো ধারণাতেও নেই।'
