রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, অর্ধেকই জনতা ব্যাংকের: সংসদে অর্থমন্ত্রী
চলতি বছরের জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ব জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মোট খেলাপির অর্ধেকেরও বেশি।
রোববার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বাগেরহাট-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এছাড়া বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৩২.৭৮ শতাংশ। তিন মাস আগে গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
১৪ লাখের বেশি কৃষকের ঋণ মওকুফ
চুয়াডাঙ্গা-৪ আসনের মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এ বাবদ ব্যাংকগুলোর পাওনা ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করেছে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরাচালানিদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম স্বর্ণ এবং ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রৌপ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
'কোনো ব্যক্তির কারণে একটি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যায় না'
এদিকে ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়া নিয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি ও আর্থিক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতি রয়েছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এক নয়। একটি কোম্পানি একটি আইনগত ও করপোরেট সত্তা।
আমির খসরু বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে এবং আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির কারণে একটি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যায় না। কারণ, ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা কাজ করেন, প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও দায় রয়েছে এবং অর্থনীতিতে ওই প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে।
এস আলম গ্রুপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিচার অব্যাহত থাকবে। তবে কোনো কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতিতে তার কী প্রভাব পড়বে, সেটিও হিসাব করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'ইমোশনের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ভঙ্গ করে কাউকে ঋণ দিচ্ছে না। যেখানে পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো সে সুযোগ নিতে পারবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলবে।
সম্পূরক প্রশ্নে হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে ঋণ খেলাপির দিক থেকে চ্যাম্পিয়ন। অন্যতম শীর্ষ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
তিনি জানতে চান- সরকার এসব ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলে কিংবা রাষ্ট্রয়াত্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে, বিশেষ ঋণ দেওয়ায় মূলত ঋণ খেলাপিদের উৎসাহিত করছে কি না, এর মাধ্যমে বিদেশি ঋণদাতারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত হবে কি না?
জবাবে মন্ত্রী বলেন, জনগণের মাথাপিছু ঋণের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। সরকারি নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়কে অধিকতর সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করার এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়ন চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা
কুষ্টিয়া-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ঋণের হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা।
ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
নিজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারের ঋণের প্রয়োজন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থায়নের চাহিদা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
