ফ্রান্সকে বিদায় করে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন
ফাইনালের প্রথম দল পেয়ে গেল ২০২৬ বিশ্বকাপ। প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২–০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবার ফাইনালে উঠল স্পেন। ম্যাচের ২২ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করে স্পেনকে এগিয়ে দেন মিকেল ওয়ারসাবাল। এরপর ৫৮ মিনিটে দানি ওলমোর বাড়ানো বল থেকে দ্বিতীয় গোলটি করেন পেদ্রো পোরো।
গোটা ম্যাচেই ফরাসিদের টেক্কা দিয়েছে স্প্যানিশ আর্মাডা। মাঝমাঠে কার্যত দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছিলেন স্পেনের ফুটবলাররা। তাদের নিশ্ছিদ্র পাহারায় আটকে যায় কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল ওলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলার মতো ফরাসি তারকাদের গতি। একের পর এক আক্রমণ সহজেই প্রতিহত করে স্পেনের রক্ষণভাগ।
ম্যাচে ফিরতে মরিয়া ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম বেশ কিছু পরিবর্তনে এনেছিলেন। বিরতির সময় মানু কোনে এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দেজিরে দুয়ে-কে মাঠে নামান তিনি। কিন্তু স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের ট্যাকটিকসের কাছে হার মানতে হয় তাকে।
রোববার নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনালে শিরোপার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের জয়ী দল। বুধবার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে লড়বে এই দুই দেশ।
ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রথমার্ধ শেষেই এক গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় থাকা ফ্রান্স উল্টো আরও এক গোল খেয়ে আগের চেয়ে বড় বিপদে পড়ে যায়।
দ্বিতীয় মাঝমাঠ দিয়ে ফাঁকা জায়গা পেয়ে বল পায়ে উঠে আসেন দানি ওলমো। সেখান থেকে সতীর্থ ওয়ারসাবালকে পাস বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তিনি তা করেননি। বল প্রথমে বাঁ দিকে এবং তারপর ডান প্রান্তে পেদ্রো পোরোর কাছে যায়।
ওলমোর সঙ্গে চমৎকার 'ওয়াল পাস' খেলে সোজা ফরাসি বক্সে ঢুকে পড়েন পেদ্রো। বল ধরে দুটি নিখুঁত ছোঁয়ায় ফরাসি গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন টটেনহ্যামের এই রাইট ব্যাক। বল জড়ায় জালের ডান দিকের নিচের কোণে। অনবদ্য আক্রমণ এবং ততোধিক সুন্দর ফিনিশ! এই গোলের পরেই তীব্র চাপে পড়ে যায় ফ্রান্স।
প্রথমার্ধে গোলের সুযোগ খুব একটা তৈরি না হলেও, বলের নিয়ন্ত্রণ একটু বেশি রেখেছে স্পেন। ফরাসি আক্রমণের বিরুদ্ধে দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে স্পেনের রক্ষণভাগ। প্রথমার্ধে ফ্রান্সের আক্রমণ ভাগকে খানিকটা ছন্নছাড়াই দেখিয়েছে।
তবে প্রথমার্ধে দুই দলের বলের দখল ছিল কাছাকাছি। এ সময় একটি পেনাল্টি মূল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। স্পট কিক থেকে গোল করে ১-০-তে এগিয়ে থেকে বিরতিতে গেছে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
২০ মিনিটের মাথায় ফ্রান্সের ডি-বক্সের ভেতর লামিন ইয়ামাল ফাউলের শিকার হওয়ায় পেনাল্টি পায় স্পেন। কুকুরেয়ার বক্সের মধ্যে বাড়ানো ক্রস দিনিয়ে বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইলেও সামনে ইয়ামাল থাকায় তাকে ফাউল করে বসেন।
ইয়ামাল ঠিক কোথায় ছিলেন, তা টেরই পাননি লুকাস ডিনে। পরিস্থিতি বোঝার আগেই তিনি ইয়ামালের পায়ে আঘাত করে বসেন। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন।
পেনাল্টি কিক নেন ওয়ারসাবাল। ফরাসি গোলকিপার মাইগনান ঠিক দিকেই ডাইভ দিয়েছিলেন। কিন্তু বল তার নাগালের বাইরে দিয়ে জালে জড়ায়।
এই গোলের মাধ্যমে এক বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে সর্বাধিক গোল করার নজির ছুঁলেন মিকেল ওয়ারসাবাল। এই বিশ্বকাপে এটি তার পঞ্চম গোল।
২০১০ সালের বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করে স্পেনকে তাদের একমাত্র বিশ্বকাপটি জিতিয়েছিলেন ডেভিড ভিয়া। এর আগে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেও পাঁচবার বল জালে জড়িয়েছিলেন এমিলিও বুত্রাগেনিয়ো। সেবার অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল স্পেনকে।
এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেছিলেন ওয়ারসাবাল। এরপর রাউন্ড অভ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে আরও দুবার লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। মঙ্গলবার সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে স্পেনের সেই নজির স্পর্শ করলেন লা রোজাদের এই তারকা।
প্রথম গোলের এর কিছুক্ষণ পরই ফ্রান্সের দুশ্চিন্তা বাড়ে। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবাকে।
প্রথমার্ধে ফরাসিরা যখনই খেলায় ফেরার চেষ্টা করেছে, কড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে স্পেন।
এর মধ্যেই বল নিয়ে প্রায় ফাঁকায় বেরিয়ে যাচ্ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। কিন্তু দারুণ দক্ষতায় পরিস্থিতি বুঝে স্লাইড করে তা আটকে দেন স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। এমবাপে অনসাইডেই ছিলেন। ফলে সিমনের এই 'সেভ' নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত।
৩৮ মিনিটে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে ফ্রান্স! স্পেনের একটি অবিশ্বাস্য গোল প্রায় হয়েই গিয়েছিল। পায়ের দারুণ সব কাজ ও স্কিলের পর ফরাসি গোলপোস্তের মাত্র ছয় গজ দূর থেকে বল পেয়েছিলেন ফাবিয়ান রুইজ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ফ্রান্সের রক্ষণভাগে তা আটকে যায়, নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় স্পেন।
চলতি বিশ্বকাপে অনেকেরই ফেভারিট দিদিয়ের দেশমের দল। তবে সেমিফাইনাল সে অর্থে কোনো কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি লা ব্লু-দের। তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের পথে তাদের সামনে ইউরো ২০২৪-এর চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে নিয়ে গড়া গ্রুপ থেকে সহজেই শীর্ষস্থান দখল করেছিল ফ্রান্স। এরপর নকআউট পর্বে সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোকে হারায় তারা। ওই পর্বে একটিও গোল হজম করেনি ফরাসি রক্ষণ। টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পথে তাদের সামনে একমাত্র বাধা ছিল স্পেন।
অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের বিশ্বকাপ যত্রার শুরুটা বেশ মন্থর ছিল। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে তারা। তবে তারপর সৌদি আরবকে ৪-০ ও উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে ছন্দে ফেরে স্পেন।
রাউন্ড অভ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ ও প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারায় তারা। ওই ম্যাচগুলো পর্যন্ত একটিও গোল খায়নি স্পেনীয় রক্ষণ। তবে শেষ আটের লড়াইয়ে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে স্পেন সেমিফাইনালে উঠলেও টুর্নামেন্টে প্রথম গোল হজম করতে হয় তাদের।
ঘটনাচক্রে ২০২৪ সালের ইউরো কাপেও সেমিফাইনাল মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। সেই ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল স্পেন; শেষপর্যন্ত ইউরো চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। দুই বছর পর আবারও একই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে এবার বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিল স্পেন।
