চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ১০ বিতর্ক
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ মাঠ এবং মাঠের বাইরে নানা আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণত বড় ম্যাচে কোনো দল হারলে রেফারি বা আয়োজকদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়া নতুন কিছু নয়। তবে এবারের আসরে ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্ব এবং ফিফার স্বচ্ছতা নিয়ে যে মাত্রায় প্রশ্ন উঠেছে, তা নজিরবিহীন। এই আসরের সবচেয়ে আলোচিত ১০টি বিতর্ক বিশ্লেষণ করা হলো—
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নিষেধাজ্ঞা মওকুফ
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নিষেধাজ্ঞা মওকুফ করে বিতর্কের জন্ম দেয় ফিফা। গত ১৩ নভেম্বর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাছাইপর্বের ম্যাচে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কনুই দিয়ে আঘাত করায় রোনালদো লাল কার্ড পেয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী তার তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচও ছিল। কিন্তু ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি এক বছরের 'প্রবেশন' দিয়ে তার শাস্তি স্থগিত করে।
ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডের অধ্যায় দুইয়ের ১৪(১) ধারায় পরিষ্কার বলা আছে, প্রতিপক্ষকে কনুই দিয়ে আঘাত করলে অন্তত তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। কিন্তু রোনালদোর ব্যাপারে ফিফা এই ছাড় দেয়। কাকতালীয়ভাবে, এই সিদ্ধান্তের এক সপ্তাহ আগেই রোনালদো হোয়াইট হাউসে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন। মূলত রোনালদোকে খেলিয়ে টিকিটের আকাশচুম্বী চাহিদা বজায় রাখতেই ফিফা এমন নমনীয়তা দেখিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের জন্য 'ফিফা শান্তি পুরস্কার'
গত ৫ নভেম্বর ফিফা হঠাৎ করেই 'ফিফা পিস প্রাইজ' নামে একটি নতুন পুরস্কার ঘোষণা করে। ইনফান্তিনো জানান, ফুটবলের মাধ্যমে যারা শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবেন, তাদের এই সম্মাননা দেওয়া হবে। ৫ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের সময় প্রথম পুরস্কারটি দেওয়া হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, ফিফার ৩৭ সদস্যের কাউন্সিল এবং ভাইস প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। ইনফান্তিনো নিজে থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেন। ট্রাম্প যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ফিফা তাকে এই বিকল্প পুরস্কার দিয়ে সম্মান জানায়। অনুষ্ঠানের শেষে ট্রাম্পের নির্বাচনী সভার থিম সং 'ওয়াইএমসিএ' বাজিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হয়।
সেরা দলগুলোকে আলাদা রাখতে 'টেনিস স্টাইল' ড্র
এবারের বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবারের মতো টেনিসের মতো 'ড্র' পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। এর লক্ষ্য ছিল সেরা দলগুলো যাতে ফাইনালের আগে একে অপরের মুখোমুখি না হয়। আগে উন্মুক্ত ড্রয়ের মাধ্যমে সেরা দলগুলো যেকোনো পর্যায়ে মুখোমুখি হতে পারত। কিন্তু ফিফার নতুন নিয়মে স্পেন ও আর্জেন্টিনাকে ব্র্যাকেটের দুই প্রান্তে রাখা হয়। একইভাবে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকেও আলাদা রাখা হয়েছিল।
ফিফা একে 'প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য' বললেও এটি মূলত বড় দলগুলোকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল ছিল। ১৯৯২ সালে র্যাঙ্কিং পদ্ধতি শুরুর পর এবারই প্রথম শীর্ষ চার দল সেমিফাইনালে উঠেছে। স্পনসরদের সুবিধা দিতেই এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
হাইড্রেশন ব্রেক
ম্যাচের মাঝে বিরতি নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ফিফা। এবার খেলার প্রতি অর্ধে একটি করে বিরতি বা 'হাইড্রেশন ব্রেক' বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে প্রচণ্ড গরমে খেলোয়াড়দের স্বস্তির জন্য এটি করা হয়েছে, তবে সমালোচকদের মতে এটি মূলত ব্রডকাস্টারদের বিজ্ঞাপনের সুযোগ করে দেওয়ার একটি কৌশল।
উরুগুয়ের কোচ মার্সেলো বিয়েলসা বলেন, কোয়ার্টারের বিরতির এই ধারণা 'ফুটবলে কিছুই যোগ করে না, বরং অনেক কিছু কেড়ে নেয়'। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল মনে করেন, এই বাড়তি বিরতি ম্যাচের 'স্বকীয়তা' বদলে দিচ্ছে। ডাচ ডিফেন্ডার ভার্জিল ভ্যান ডাইক বলেন, 'টিভিতে সাধারণ দর্শকদের জন্য এটি খুব একটা সুখকর নয়। তবে প্রচণ্ড গরম থাকলে এটি ভালো, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব অনুযায়ী এটি বিবেচনা করা উচিত।'
মিশর বনাম 'ভার্জেন্টিনা' বিতর্ক
আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দিতে ফিফা টুর্নামেন্ট 'ফিক্স' করছে—এমন একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আসরজুড়ে ডালপালা মেলেছে। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির একটি ফাউলে শাস্তি না দেওয়া থেকে এর শুরু। তবে এই বিতর্ক চরমে পৌছায় শেষ ১৬-র ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে মিশর ২-০ তে এগিয়ে গেলেও ভিএআর-এর মাধ্যমে একটি গোল বাতিল করা হয়।
ম্যাচ শেষে মিশরের কোচ হোসাম হাসান বলেন, 'মনে হচ্ছে রেফারির ওপর আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে এক ধরনের চাপ ছিল। জীবন অন্যায্য হতে পারে, কিন্তু খেলাধুলায় কেন ন্যায়বিচার থাকবে না? আমি এই ফলাফলে সন্তুষ্ট নই।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'হয়তো তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্টে রাখতে চেয়েছিল? ফুটবল কখনো কখনো মাঠের কৌশলের বাইরে চলে যায়।' সাবেক রেফারি গ্রাহাম স্কটও মনে করেন, মিশরের গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
সুইজারল্যান্ডের বিদায়ে 'মিসটেকেন আইডেন্টিটি' বিতর্ক
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। শুরুতে মনে হয়েছিল আর্জেন্টিনার পারেদেস ফাউল করেছেন এবং রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু ভিএআর হস্তক্ষেপ করে জানায় পারেদেস নয়, বরং এমবোলো ডাইভ দিয়েছেন। ফলে পারেদেসের কার্ড বাতিল করে এমবোলোকে কার্ড দেওয়া হয় এবং তিনি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।
সুইজারল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রানিত জাকা বলেন, 'নিয়ম তো নিয়মই, কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত খেলাকে নষ্ট করে দেয়।' সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন একে রেফারির ভুল হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বালোগানের শাস্তি মওকুফ ও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ
আসরের অন্যতম বড় বিতর্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। বসনিয়ার বিপক্ষে লাল কার্ড পেলেও বেলজিয়াম ম্যাচের আগে ফিফা জানায় বালোগান খেলতে পারবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপের মুখে ফিফা এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে ধারণা করছেন অনেকে।
বেলজিয়াম এই সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানালেও ফিফা তা 'অগ্রহণযোগ্য' বলে নাকচ করে দেয়। ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ফিফা সঠিক কাজটিই করেছে।' তবে মাঠের সিদ্ধান্তে এভাবে সরকারি হস্তক্ষেপের ঘটনা ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচে ক্যামেরার তার বিতর্ক
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের সমতাসূচক গোলের আগে বলটি মাঠের ওপরে থাকা ক্যামেরার তারে লেগেছিল বলে অভিযোগ করেছে নরওয়ে। এর ফলে বলের গতিপথ বদলে গিয়ে ইংল্যান্ডের অনুকূলে যায়।
নরওয়ের কোচ স্টালে সলবাকেন বলেন, 'রেফারি নিজে এটি দেখেননি। ফিফা বলছে বলের চিপে কোনো স্পর্শ ধরা পড়েনি। কিন্তু বলটি সরাসরি নিচে পড়েছিল। সবাই দেখেছে কী ঘটেছে।' ফিফা অবশ্য প্রযুক্তিগত তথ্যের দোহাই দিয়ে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
মেক্সিকো বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচ আগানোর চেষ্টা
মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকাতে ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর ম্যাচটি ছয় ঘণ্টা এগিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল ফিফা। কারণ হিসেবে 'বন্যার আশঙ্কা'র কথা বলা হলেও আসলে উভয় দলের সমর্থকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগুইরে এই প্রস্তাবকে 'পেটে লাথি মারার' মতো বলে বর্ণনা করেন। শেষ পর্যন্ত দুই ফেডারেশনের তীব্র আপত্তির মুখে ফিফা এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
তবে শেষ পর্যন্ত ঝড়ের কারণে ম্যাচটিকে এক ঘণ্টা পেছানো হয়।
আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচের নাটকীয়তা
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার ৩-৩ ড্র নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়। এই ফলাফলে দুই দলই পরবর্তী রাউন্ডে যায় এবং ইরান আসর থেকে বিদায় নেয়। প্রথমার্ধে আক্রমণাত্মক খেললেও শেষ দিকে দুই দলই অনেকটা ম্যাচ ছেড়ে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। অস্ট্রিয়ার কোচ রাল্ফ রাংনিক অবশ্য ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, '৩-৩ ড্রয়ের পর কেউ বলতে পারে না যে এটি পাতানো ছিল। আলফ্রেড হিচককও এমন নাটকীয়তা লিখলে আমি সেটিকে পাগলামি বলতাম।'
