‘হঠাৎ করেই নিজেকে অজেয় মনে হয়’: বিশ্বকাপে ছোট দলের গোলরক্ষকেরা কেন এত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন?
'এটা গোলকিপারদের বিশ্বকাপ।'
রোববার বেলজিয়ামের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দকে নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কথাটি বলেছিলেন থিবো কোর্তোয়া। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই গোলরক্ষকের সেই মন্তব্য হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাগুলোর একটিকেই তুলে ধরেছে।
কোর্তোয়া বলেছিলেন, 'ও দারুণ একজন গোলরক্ষক এবং আজ ও আবারও তা প্রমাণ করেছে। মাঝেমধ্যে এমনটা হয়, তারা আরও ভালো খেলতে শুরু করে, এটা তো বিশ্বকাপ। একটা সেভ, দ্বিতীয় সেভ আর হঠাৎ করেই ওরা নিজেদের অজেয় মনে করতে শুরু করে।'
এটি শুধু একজন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের প্রশংসা ছিল না। বরং একজন অভিজ্ঞ গোলকিপারের চোখে আরেক গোলকিপারের মানসিক অবস্থার ব্যাখ্যা। কোর্তোয়া শুধু বেইরানভান্দের দক্ষতার কথা বলেননি, তিনি এমন এক মানসিক পরিবর্তনের কথাও বলেছেন, যা আত্মবিশ্বাস, ম্যাচের গতি আর পরিস্থিতি একসঙ্গে মিললে একজন গোলরক্ষকের মধ্যে তৈরি হতে পারে।
বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে বেইরানভান্দের আলোচনায় আসা অবশ্য এবারই প্রথম নয়।
২০১৮ বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি ঠেকিয়ে টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছিলেন তিনি। আট বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন ইরানের এই গোলরক্ষক।
তবে তিনি একা নন।
গ্রুপ পর্বে ইকুয়েডরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ১৫টি সেভ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম। অন্যদিকে স্পেনের বিপক্ষে গোল হজম না করে কেপ ভার্দেকে ঐতিহাসিক ফল এনে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন ভোজিনিয়া। সেই ম্যাচের পর বিশ্বজুড়েই প্রশংসা কুড়ান তিনি।
বিশ্বকাপের এমন এক বিশেষ ক্ষমতা আছে, যা একজন গোলরক্ষককে মুহূর্তের মধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করতে পারে। এই মঞ্চে একটি ভালো পারফরম্যান্সও অসাধারণ হয়ে ওঠে, কারণ সেটি একই সময়ে দেখেন বিশ্বের শত কোটি দর্শক।
তবে বিশ্বকাপের আলো-ঝলমলে মঞ্চ যেন আমাদের আসল বিষয়টি ভুলিয়ে না দেয়। এসব গোলরক্ষক যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, সেগুলোর মান সত্যিই অসাধারণ।
ইকুয়েডরের বিপক্ষে এলোয় রুমের পারফরম্যান্স যেকোনো প্রতিযোগিতাতেই বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়ার মতো ছিল। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট ধরে একের পর এক আক্রমণ সামলে একই মাত্রার মনোযোগ ধরে রাখা কতটা কঠিন, তা ভাষায় বোঝানো মুশকিল।
একইভাবে স্পেনের বিপক্ষে ভোজিনিয়ার গোলশূন্য থাকার কৃতিত্ব শুধু ক্ষিপ্রতা বা অ্যাথলেটিক দক্ষতার ফল ছিল না। নিখুঁত পজিশনিং, প্রতিপক্ষের আক্রমণ আগে থেকে বুঝে ফেলা, উড়ন্ত বল নিয়ন্ত্রণ, সতীর্থদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও মানসিক স্থিরতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন প্রায় নিখুঁত। বেলজিয়ামের বিপক্ষে আলিরেজা বেইরানভান্দের পারফরম্যান্সেও একই গুণগুলোর প্রতিফলন দেখা গেছে। তাদের কেউই ভাগ্যের জোরে এমন ম্যাচ খেলেননি।
বিশ্বকাপে বদলে যায় মূলত এসব পারফরম্যান্সের গুরুত্ব। ফুটবল ইতিহাস শুধু মুহূর্তগুলো মনে রাখে না, সবচেয়ে বেশি মনে রাখে সবচেয়ে বড় মঞ্চে তৈরি হওয়া মুহূর্তগুলো।
এ কারণেই ২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে টিম হাওয়ার্ডের পারফরম্যান্স এক দশকেরও বেশি সময় পর আজও কিংবদন্তির মর্যাদা পায়। যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল। কিন্তু কোনো মার্কিন সমর্থককে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, জাতীয় দলের হয়ে দেখা সেরা গোলকিপিং পারফরম্যান্স কোনটি, বেশির ভাগই টিম হাওয়ার্ডের সেই ম্যাচের কথাই বলবেন।
শুধু ফুটবলে নয়, প্রায় সব খেলাতেই একই নিয়ম কাজ করে। লিগের সাধারণ ম্যাচের চেয়ে প্লে-অফের পারফরম্যান্সকে আমরা বেশি মূল্য দিই। অক্টোবরে পাওয়া কোনো লিগ জয়ের চেয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্মরণীয় রাতগুলো অনেক বেশি দিন মনে থাকে। সবচেয়ে বেশি চাপের মুহূর্তে যারা নিজেদের সেরাটা উপহার দিতে পারেন, তাদেরই আমরা সবচেয়ে বেশি উদযাপন করি। কারণ সেই সময়ই একজন ক্রীড়াবিদের সামর্থ্য ও মানসিক দৃঢ়তার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়।
এসবের মধ্যেও বিশ্বকাপের অবস্থান আলাদা। এটি এমন একটি টুর্নামেন্ট, যা এক রাতেই একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আর ছোট দেশগুলোর গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে সেই প্রভাব আরও অনেক বেশি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো আন্ডারডগ দলগুলোর মানসিকতা। শিরোপার দাবিদার দলগুলো যেখানে প্রত্যাশার ভার নিয়ে মাঠে নামে, সেখানে ছোট দেশগুলো অনেকটাই ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে খেলে। অনেক সময় শুধু বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়াই তাদের দেশের মানুষের কাছে বীরের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এই মানসিকতাই ছোট দলগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ব্যর্থ হলে কী হবে, সেই চিন্তার বদলে তখন পুরো মনোযোগ থাকে একটি সুযোগকে কাজে লাগানোর দিকে—বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার দিকে যে আপনি আসলে কী করতে পারেন।
একজন গোলরক্ষকের জন্য এই মানসিকতা হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি।
এলোয় রুমের বিশ্বকাপ যাত্রাই তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। টুর্নামেন্টে কুরাসাওয়ের প্রথম ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে সাত গোল হজম করেছিলেন তিনি। অনেক গোলরক্ষকের জন্য এমন একটি ম্যাচ আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহ পর ইকুয়েডরের বিপক্ষে তিনি খেললেন পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ম্যাচ।
একজন গোলরক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি বোঝা যতটা কঠিন মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়।
জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হারলে ফলটা অনেক সময় মেনে নেওয়াই সহজ হয়ে যায়। হ্যাঁ, হার অবশ্যই কষ্ট দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে আপনি এটাও বুঝতে পারেন, প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনায় এমন ফল অসম্ভব কিছু ছিল না।
স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দেও প্রায় একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। যখন কোনো দল স্পষ্ট আন্ডারডগ হিসেবে মাঠে নামে, তখন ম্যাচের মানসিক চিত্রটাই বদলে যায়। সব চাপ থাকে ফেবারিট দলের ওপর। বলের দখল রাখা, সুযোগ তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করার প্রত্যাশা থাকে তাদেরই।
এমন পরিস্থিতিতে আন্ডারডগ দলের গোলরক্ষক যদি একের পর এক সেভ করতে শুরু করেন, তখন ম্যাচের গতি ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে। আত্মবিশ্বাস বাড়ে আন্ডারডগদের, আর চাপ বাড়তে থাকে ফেবারিটদের ওপর।
ঠিক এখানেই থিবো কোর্তোয়ার মন্তব্যটির গভীরতা বোঝা যায়। তিনি যখন বলেছিলেন, কয়েকটি সেভের পর একজন গোলরক্ষকের মনে হতে থাকে যে তাকে আর হারানো সম্ভব নয়, তখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি গোলকিপারই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন।
এই অনুভূতিটা ম্যাচ শুরুর আগেই তৈরি হয় না। বরং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। প্রতিটি সফল সেভ, প্রতিটি সঠিক সিদ্ধান্ত আর প্রতিটি কার্যকর হস্তক্ষেপ গোলরক্ষককে বুঝিয়ে দেয়—আজ তাঁর অবস্থান ঠিক আছে, সিদ্ধান্তগুলো সঠিক হচ্ছে, প্রতিক্রিয়াও কাজ করছে নিখুঁতভাবে।
একটি সেভ আত্মবিশ্বাস বাড়ায় হাতে বল নিয়ন্ত্রণে। উঁচু বল নিরাপদে ধরতে পারা নিশ্চিত করে সময়জ্ঞান ঠিক আছে। বক্স ছেড়ে বেরিয়ে এসে সফলভাবে বিপদ সামলে দেওয়া প্রমাণ করে ম্যাচের পরিস্থিতি তিনি ঠিকভাবে পড়তে পারছেন। আর কঠিন কোনো সেভ যেন সেই আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।
এভাবে একের পর এক মুহূর্ত জমতে থাকলে মানসিক দিক থেকেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। খেলাটা যেন ধীর হয়ে আসে। সিদ্ধান্ত নিতে আর ভাবতে হয় না, সবকিছুই স্বতঃস্ফূর্তভাবে হতে থাকে। ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন 'ফ্লো স্টেট'—যে অবস্থায় একজন ক্রীড়াবিদ নিজের সেরাটা সহজাতভাবেই বের করে আনতে পারেন। গোলরক্ষকেরা অবশ্য বিষয়টি আরও সহজ ভাষায় বলেন—তাঁদের মনে হয়, মাঠের সবকিছুই তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন।
একসময় সেই আত্মবিশ্বাস বাইরেও ফুটে ওঠে।
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানোর ভঙ্গি বদলে যায়। সতীর্থদের আরও জোরালোভাবে নির্দেশ দেওয়া শুরু করেন। উড়ন্ত বলের দিকে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এমনকি শরীরী ভাষাও বদলে যায়।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ঘটে প্রতিপক্ষের মনে।
আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা ধীরে ধীরে হতাশ হতে শুরু করেন। যে সুযোগগুলো সাধারণত গোল হওয়ার কথা, সেগুলোও কোনোভাবে রুখে দেন গোলরক্ষক। প্রতিটি সেভের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষের চিন্তায় আরও বড় জায়গা করে নেন তিনি। একসময় আক্রমণকারীদের মনেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন জন্ম নেয়—
'আজ কি তাহলে সত্যিই আমাদের দিন নয়?'
সাধারণত এই মুহূর্তেই একজন গোলরক্ষক নিজের সেরা ছন্দে পৌঁছে যান।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমারও এমন একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তখন আমি সুইডেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব অ্যাঞ্জেলহোমসে খেলতাম। সুইডিশ কাপের গ্রুপ পর্বে স্টকহোমে আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল শীর্ষ লিগের শক্তিশালী ক্লাব হামারবি। বাস্তবতা হলো, সেই ম্যাচ জেতার মতো দল আমরা ছিলাম না। তাদের বাজেট বড়, দল শক্তিশালী, আর প্রায় সবাই ধরেই নিয়েছিল হামারবি সহজেই জিতে যাবে।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, ঠিক এই কারণেই ম্যাচটি আমি উপভোগ করেছিলাম।
এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই সপ্তাহে প্রস্তুতিটাই ছিল অন্য রকম। অনুশীলনে কোনো চাপ ছিল না। আত্মবিশ্বাসও এসেছিল স্বাভাবিকভাবেই। ভালো ঘুম হয়েছিল, ওয়ার্ম-আপও হয়েছিল দারুণ। উত্তেজনা ছিল ঠিকই, কিন্তু উদ্বেগ ছিল খুবই কম।
এরপর শুরু হলো ম্যাচ।
শুরুতেই একটি সেভ করলাম। তারপর আরেকটি। সময় যত গড়াল, প্রতিটি সেভের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসও বাড়তে লাগল। একটি কঠিন সেভের পর পুরো গ্যালারির সম্মিলিত বিস্ময়ের শব্দ আজও কানে বাজে। তখনই বুঝেছিলাম, সেই মুহূর্তগুলো আমাকে কতটা শক্তি দিচ্ছিল। হাজার হাজার সমর্থক গোল উদ্যাপন করতে মাঠে এসেছিলেন, আর আমার কাজ ছিল তাঁদের প্রত্যেককে হতাশ করা।
একজন গোলরক্ষকের জন্য নিশ্চিত গোলের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আনন্দের মতো অনুভূতি খুব কমই আছে। আমাদের কাছে সেটাই সম্ভবত গোল করার সবচেয়ে কাছাকাছি অনুভূতি।
ম্যাচ যত এগিয়েছে, আমি যেন পুরোপুরি খেলার ভেতরে ডুবে গিয়েছিলাম। কয়েকটি সেভের পর নিজেরই হাসি পাচ্ছিল, কারণ বুঝতেই পারছিলাম না কীভাবে বল জালে ঢোকেনি। পুরো ম্যাচে আমরা ছিলাম চাপে। তবু শেষ পর্যন্ত ০-০ ড্র করি। হামারবি লক্ষ্যে ১২টি শট নিয়েছিল, আর আমি ১২টিই ঠেকিয়েছিলাম।
ম্যাচ শেষে আমাদের সেন্টার-ব্যাককে বলেছিলাম, ভেতরটা কেমন আবেগে ভরে গেছে। কিছুক্ষণ পর ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পানি চলে আসে। মনে হয়েছিল, জীবনের বিরল সেই দিনগুলোর একটি, যেদিন নিজের পারফরম্যান্সের প্রতিটি দিক ঠিক জায়গায় ছিল। পুরো ৯০ মিনিট যেন সবকিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে এলোয় রুমকে আবেগাপ্লুত হতে দেখে তাই আমি এক মুহূর্তেই বুঝতে পেরেছিলাম, কেন তার এমন অনুভূতি হয়েছিল।
এমন মুহূর্ত একজন গোলরক্ষকের জীবনে কখনো হারিয়ে যায় না।
এবার কল্পনা করুন, সেই অনুভূতিটা যদি কোনো ঘরোয়া কাপের ম্যাচে নয়, বরং বিশ্বকাপে নিজের দেশের জার্সি গায়ে হয়। এমন একটি ম্যাচে, যা হয়তো পুরো ক্যারিয়ারের পরিচয় হয়ে থাকবে।
এ কারণেই ছোট দেশগুলোর গোলরক্ষকেরা প্রায়ই এমন স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দেন। মানসিক স্বাধীনতার পাশাপাশি তাদের সামনে ম্যাচে প্রভাব রাখার সুযোগও বেশি আসে। আন্ডারডগ দলগুলোর গোলরক্ষকদের মোকাবিলা করতে হয় বেশি শট, বেশি ক্রস আর আরও বেশি বিপজ্জনক আক্রমণ। এতে চাপ যেমন বাড়ে, তেমনি খেলার ছন্দও তৈরি হয়—যা একজন গোলরক্ষকের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবতা হলো, অনেক গোলরক্ষকই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করেন। এতে পুরো ম্যাচজুড়ে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়, খেলার সঙ্গে সংযোগও বজায় থাকে। একের পর এক পরিস্থিতি সামলাতে সামলাতে আত্মবিশ্বাসও স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠে।
এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায় বড় ক্লাবগুলোর গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ তাঁদের কোনো কাজই থাকে না। তারপর হঠাৎ ম্যাচের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এমন একটি সেভ করতে হয়, যা পুরো ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারে।
এর জন্য প্রয়োজন একেবারেই ভিন্ন ধরনের দক্ষতা।
বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকেরা অবশ্য দুই ধরনের পরিস্থিতিতেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। তবে এটাও সত্য, কেউ কেউ আন্ডারডগ দলের হয়ে খেলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। নিজের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকালে আমিও নিজেকে সেই দলে রাখব। প্রতিপক্ষের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার ভূমিকাটা আমি সবসময় উপভোগ করতাম।
অন্যদিকে বড় ক্লাবের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হওয়ার চাপ ছিল একেবারেই আলাদা। সেখানে প্রতিটি ম্যাচের ফলাফলের গুরুত্ব অনেক বেশি। সমর্থক, কোচ এবং ক্লাব—সবার প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে খেলতে হয়। একটি খারাপ ম্যাচ খেললেই বুঝে যেতেন, দলে নিজের জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
কিছু গোলরক্ষক এমন চাপের মধ্যেই নিজেদের সেরা খেলাটা খেলেন। আবার কেউ কেউ সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন তখনই, যখন তাঁদের সামনে থাকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চমকে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বকাপ গোলরক্ষকদের জন্য এতটা আকর্ষণীয় হওয়ার এটিও একটি বড় কারণ। এই টুর্নামেন্ট দুই ধরনের গোলরক্ষকের সামনেই নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ এনে দেয়। তবে বারবার দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষের হৃদয় জয় করেন আন্ডারডগ দলের গোলরক্ষকেরাই। তারাই এমন সব পারফরম্যান্স উপহার দেন, যা সময় পেরিয়ে গেলেও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে।
