‘দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল মৃত’: বিশ্বকাপ ব্যর্থতায় ক্ষোভে ফুঁসছে সমর্থকরা, ব্যাপক সংস্কারের দাবি
"দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল এখন মৃত"—সিউলের ইনচিওন বিমানবন্দরের বাইরে উত্তেজিত জনতার ভিড়ের ওপর ভেসে থাকা এই একটি প্ল্যাকার্ডই সব বলে দিচ্ছিল। বিশ্বকাপ থেকে গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিয়ে দেশে ফেরা জাতীয় ফুটবল দলকে এভাবেই চরম ক্ষোভ ও অপমানের মুখে পড়তে হয়েছে।
সমর্থকদের এই রোষের মূল লক্ষ্য ছিলেন একজন কোচ হং মিউং-বো। একসময়ের জাতীয় নায়ক ও সাবেক এই অধিনায়ককে এখন সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে দলের শোচনীয় পারফরম্যান্সের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে সমর্থকরা ড্রাম বাজিয়ে চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিলেন— "হং আউট!" (হং বিদায় হও)। দলের খেলোয়াড়দের অনেকে হাততালির মাধ্যমে স্বাগত জানালেও হংকে তার গাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করেন অনেক সমর্থক। একজন ভক্ত বিবিসিকে জানান, বিশ্বকাপের আগেই মানুষ দল নিয়ে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছিল এবং বারবার বলছিল যে হং-এর পদত্যাগ করা উচিত।
এই নিয়োগ নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র বিরোধিতা ছিল, যা কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (কেএফএ) এক দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কে জড়িয়ে ফেলে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সংস্থায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের অভাব রয়েছে। তারা প্রায়ই যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে কোচ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের বেছে নেয়—যদিও কেএফএ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ক্রীড়া বিশ্লেষক চোই ডং-হো বলেন, "সমস্যার মূলে রয়েছে কেএফএ-র চরম অযোগ্যতা।"
বিশ্বকাপ থেকে অপ্রত্যাশিত এই বিদায়ে সেই পুরনো অভিযোগ ও প্রশ্নগুলো আবার সামনে এসেছে, যা দক্ষিণ কোরীয় ফুটবলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে হং ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, "এই ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ আমার।" এদিকে দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং এই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, "যখন একজন কমান্ডার নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্ব প্রাধান্য পায়, তখন এর ফলাফল দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।" তিনি আরও যোগ করেন, এটি দৃশ্যত সাংগঠনিক ও জনবল সংক্রান্ত ব্যর্থতার ফল।
নায়ক যখন খলনায়ক
২০০২ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়াকে অবিশ্বাস্যভাবে চতুর্থ স্থানে পৌঁছে দেওয়া অধিনায়ক হং মিউং-বো একসময় দেশটির অন্যতম সম্মানিত ফুটবলার ছিলেন। তার কোচিং ক্যারিয়ারের শুরুটাও ছিল চমৎকার। ২০০৯ সালে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এবং ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে তার অধীনে দলটি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল।
এত সাফল্য সত্ত্বেও ২০২৪ সালে যখন তাকে জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন সমর্থকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এটি ছিল তার দ্বিতীয় দফার দায়িত্ব। অনেক ভক্ত এখনও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করেন। সেবার আলজেরিয়ার কাছে ৪-২ গোলে বিধ্বস্ত হওয়াকে অনেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বাজে পারফরম্যান্স হিসেবে মনে করেন—যতক্ষণ না এবারের আসরে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১-০ গোলে পরাজয় সেই রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেল।
কেএফএ-র ভেতরে কি 'কার্টেল' সক্রিয়?
আসলে এবার হং-এর দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল না। তার পূর্বসূরি ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানকে ২০২৩ এএফসি এশিয়ান কাপের সেমিফাইনালে হতাশাজনক বিদায়ের পর বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর জেসি মার্শের মতো অনেক হাই-প্রোফাইল নাম আলোচনার টেবিলে থাকলেও শেষ পর্যন্ত হং-কেই বেছে নেওয়া হয়।
অভিযোগ ওঠে, কেএফএ-র চেয়ারম্যান চুং মং-গিউ (যিনি হুন্দাই পরিবারের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী) ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন বলেই হং-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ দাবি করেন যে তারা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন বলেই এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই বিতর্ক আরও উসকে দেন কোচ বাছাই কমিটির সদস্য ও সাবেক খেলোয়াড় পার্ক জু-হো। তিনি একটি ইউটিউব ভিডিওতে অভিযোগ করেন, হং-এর নিয়োগে কোনো নিয়ম মানা হয়নি এবং অন্যান্য যোগ্য প্রার্থীদের সাথে অবিচার করা হয়েছে।
যদিও কেএফএ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পার্কের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছিল, কিন্তু পার্কের সমর্থনে এগিয়ে আসেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক মিডফিল্ডার ও কিংবদন্তি ফুটবলার পার্ক জি-সাং। তিনি বলেন, "মানুষ কেএফএ-র ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং এই বিশ্বাস ফিরে পেতে অনেক সময় লাগবে।"
২০২৪ সালের শেষের দিকে একটি সরকারি অডিটে ক্লিন্সম্যানের বিদায় এবং হং-এর নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাবের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। সেখানে দেখা যায়, অনুমোদন ছাড়াই কারিগরি পরিচালককে নির্দেশ দিয়ে একতরফাভাবে হং-এর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। এমনকি বোর্ড মিটিংয়ে নাম উপস্থাপনের আগেই তাকে কার্যত নির্বাচন করে রাখা হয়েছিল। সংসদীয় শুনানিতেও এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং 'ইউনিভার্সিটি কানেকশন' বা কার্টেল নিয়ে বিতর্ক ওঠে। সরকার তিন নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও কেএফএ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে এবং কার্যক্রম স্থগিত রাখতে সক্ষম হয়।
অসংখ্য সমালোচনা মাথায় নিয়ে হং বিশ্বকাপের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে শুভসূচনা করলেও মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে দলের আত্মসমর্পণ ভক্তদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ম্যাচে পিছিয়ে থাকার পরেও আক্রমণাত্মক না হয়ে রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সবচাইতে বড় ধাক্কাটি ছিল দলের অধিনায়ক ও সুপারস্টার সোন হিউং-মিনকে মূল একাদশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে গোল্ডেন বুট জেতা প্রথম এশিয়ান সোন-এর সাথে কোচের সম্পর্ক কোনোকালেই ভালো ছিল না। ২০১২ অলিম্পিকে তাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এবার বিশ্বকাপের আগে নতুন অধিনায়ক নিয়োগের ইঙ্গিত দিয়ে হং নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। বিশ্লেষক চোই বলেন, "হং জানতেন না কীভাবে সনের সেরাটা বের করে আনতে হয়। তিনি রণকৌশল পরিবর্তনের চেয়ে খেলোয়াড় পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন।"
বিদায়ের পর সোন ইনস্টাগ্রামে ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়ে লিখেছেন, "আমি জানি না কোথা থেকে শুরু করব। সত্য বলতে, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন... আমি বিশ্বাস করি ভক্তরা যা অনুভব করছেন, আমার অনুভূতিও তার চেয়ে আলাদা নয়।"
বিপর্যস্ত স্বপ্ন ও জাপানের সাথে ব্যবধান
২০০২ সালে জাপানের সাথে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু আজ অনেক বছর পর দেখা যাচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ জাপান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ৩২তম স্থানে নেমে গেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে জাপান ১৭তম স্থানে উঠে এসে এশিয়ার সেরা দলে পরিণত হয়েছে।
একসময় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান ফুটবল মাঠে সমানে সমান লড়াই করলেও এবার ভক্তদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস আর নেই। জাপানি সংবাদমাধ্যম যখন ভবিষ্যদ্বাণী করছিল যে শেষ ১৬-তে কোরিয়ার মুখোমুখি হলে জাপান সহজেই জিতবে, তখন অনেক কোরীয় ভক্ত উল্টো বিদ্রূপ করে লিখেছিলেন, "তারা যে কোরিয়াকে নকআউট পর্বে যাওয়ার যোগ্য মনে করছেন, এটাই অনেক বেশি সৌজন্য।"
ক্রীড়া বিশ্লেষক চোই ডং-হোর মতে, জাপান একটি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের ভিত্তিতে কাজ করে শক্তিশালী টিমওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া প্রতি চার বছর পর পর সবকিছু শূন্য থেকে শুরু করে। ২০০২ সালের পর থেকে ১০ জনের বেশি কোচ পরিবর্তনই এর বড় প্রমাণ। এর ফলে দলের কোনো সুনির্দিষ্ট ফুটবল দর্শন বা পরিচয় তৈরি হতে পারেনি।
প্রেসিডেন্ট লি-সহ সাধারণ ভক্তদের দাবি এখন একটাই—কেএফএ-তে আমূল সংস্কার। একজন সমর্থক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রতিযোগিতার বিশ্বে বৈষম্য বা অন্যায্যতা নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তারা দেখছেন ক্রীড়াঙ্গনের মতো জায়গাতেও নীতিনির্ধারকরা ন্যায্যতার নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। "মানুষ এটি আর মুখ বুজে সইবে না।" স্বচ্ছতা আর দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের ওপর ভিত্তি করে কোরিয়ান ফুটবলকে পুনর্গঠন করাই এখন সময়ের দাবি।
