ভাইকিং যোদ্ধাদের মতোই ক্ষিপ্র গতিতে খেলেন আর্লিং হলান্ড
নরওয়ের বিশালদেহী, উন্মত্ত স্বভাবের স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ডের মধ্যে এমন অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলোকে একেবারেই নরওয়েজীয় বলে মনে করা হয়। তিনি কখনো কখনো বনের মধ্যে গাছ কেটে ব্যায়াম করেন। তিনি প্রতিদিন ছয় হাজার কিলোক্যালরি শক্তিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করেন (গরুর হৃৎপিণ্ড তার অত্যন্ত প্রিয় খাবার)। অনুশীলন শেষ হওয়ার পর তিনি কাঁচা দুধ পান করেন।
লুক্সেমবার্গে 'পিলিজ' বা লুণ্ঠন নামে একটি কর-সুবিধাপ্রাপ্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান রয়েছে হলান্ডের। তিনি ত্রয়োদশ শতকের প্রাচীন নর্স কাহিনিগ্রন্থ 'হেইমস্ক্রিংলা'-এর একটি সংস্করণ এক লাখ ত্রিশ হাজার মার্কিন ডলারে কিনেছিলেন। পরে সেটি নিজের এলাকার গ্রন্থাগারে দান করে দেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, 'আমি কখনোই খুব একটা বইপড়ুয়া মানুষ ছিলাম না।'
তার ঢেউখেলানো সোনালি চুলের তুলনা প্রায়ই ভাইকিং বা জলদস্যু যোদ্ধাদের সঙ্গে করা হয়। খেলাধুলায় তিনি যেন লুটতরাজে বের হওয়া একদল যোদ্ধার তীব্রতা নিয়ে নামেন।
উল্লেখ্য, 'ভাইকিংস' মূলত একটি যুদ্ধবাজ জাতির নাম। তবে শাব্দিক অর্থে ভাইকিং বলতে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি বিশেষ দলকে বোঝায়। এই দলটি মূলত অষ্টম শতক থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত বংশ পরম্পরায় ইউরোপের বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিজেদের বসতি স্থাপন করেছিল। ইতিহাসে এরা 'নর্থম্যান' বা 'নর্সম্যান' নামেও পরিচিত। আইসল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রাচীন সাহিত্যে এই ভাইকিংদের শৌর্য-বীর্য ও বীরত্বগাথার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।
ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব খেলোয়াড়ের তুলনায়ই হলান্ড অনেক বেশি হারে গোল করেন। একটি জুনিয়র ম্যাচে তিনি হন্ডুরাসের বিপক্ষে একাই নয়টি গোল করেছিলেন। সেই ম্যাচে হন্ডুরাসের কয়েকজন খেলোয়াড় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।
তিনি একবার বলেছিলেন, 'আমি সব সময় ফুটবল নিয়েই ভাবি।' প্রতিদিন সকালে তাকে ঘুম থেকে জাগায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সুর।
একবার তিনি বিমানে বসে তোলা নিজের একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন। ছবিতে তাকে সামনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবির সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, 'সাত ঘণ্টার বিমানযাত্রা কাটিয়ে দিলাম—কোনো মুঠোফোন নয়, ঘুম নয়, পানি নয়, খাবার নয়; কেবল মানচিত্র দেখে।'
একবার 'দ্য গার্ডিয়ান' তাকে আখ্যা দিয়েছিল 'অতৃপ্ত ক্ষুধার্ত উত্তরাঞ্চলীয় গোল-খেকো ইয়েতি' হিসেবে।
আন্তর্জাতিক ফুটবল কখনো কখনো অদ্ভুত ধরনের জাতিগত ধারণার জন্ম দেয়। যেমন, জার্মানরা নাকি কেবল নির্মম শৃঙ্খলার কারণেই সফল হয়। ব্রাজিলিয়ানরা নাকি একদিকে অসাধারণ প্রতিভাবান, অন্যদিকে নিজেদের চাকচিক্যময় ফুটবলশৈলীর কারণেই অভিশপ্ত। আর ইংলিশরা এখনো নিজেদের এমনভাবে বোঝায় যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তারা আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। নরওয়ে কখনোই বিশ্বকাপে বিশেষ সফল দল ছিল না। এবারের আসরটি দেশটির জন্য মাত্র চতুর্থ বিশ্বকাপ, যেখানে তারা খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। (একটি পুরো প্রজন্মজুড়ে নরওয়ের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত টম লুন্ড ইউরোপের বাইরে জাতীয় দলের হয়ে কখনো কোনো ম্যাচ খেলেননি, কারণ তিনি বিমানে চড়তে ভয় পেতেন।) জাতীয় পরিচয়ের কোনো ভার এই দলকে বহন করতে হয় না। ফলে হলান্ড নিজের মতো করে সেই পরিচয় গড়ে তোলার স্বাধীনতা পেয়েছেন। তিনি এমনভাবে ফুটবল খেলেন, যেন নরওয়েজীয়রা স্বপ্ন দেখে—নরওয়েজীয়দের ঠিক এভাবেই ফুটবল খেলা উচিত।
হালান্ডের খেলার ধরন বিস্ময় নয়, বরং আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তিনি বিশালদেহী। তার উচ্চতা ছয় ফুট পাঁচ ইঞ্চি, ওজন প্রায় দুইশ পাউন্ড; আকার ও গতির দিক থেকে তিনি অনেকটা মার্কিন পেশাদার ফুটবলের কিংবদন্তি ওয়াইড রিসিভার র্যান্ডি মসের মতো। তাকে খেলতে দেখলে কখনো কখনো আমার এমন হাসি পায়, যেমন ভাঙাচোরা গাড়ির প্রতিযোগিতায় কোনো বিশাল, বিকট সংঘর্ষ দেখা যেতে পারে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক যে খেলাটি আমার মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করেছিল, সেটি ছিল ইরাকের বিপক্ষে নরওয়ের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। সেই সময় হলান্ড ইতোমধ্যে দুটি গোল করে ফেলেছিলেন।
ইরাকের মার্কো ফারজি নিজের পেনাল্টি এলাকার সামনে দিয়ে বল নিয়ে এগোচ্ছিলেন। তখন হলান্ড তার থেকে প্রায় বিশ গজ দূরে ছিলেন। হঠাৎ করেই হলান্ড অবিশ্বাস্য হিংস্রতায় দৌড় শুরু করেন। তার দৌড়ানোর একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, দৌড়ের সময় তার দুই হাত প্রচণ্ডভাবে এদিক-সেদিক দুলতে থাকে। তিনি সোজা ফারজির দিকে ধেয়ে যান। ফারজি তখনও হলান্ড থেকে অনেক দূরে ছিলেন, কিন্তু মনে হলো তিনি যেন মুহূর্তের মধ্যেই ফুটবলের সব স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হারিয়ে ফেললেন। তিনি বল নিয়ে উল্টো দিকে, মাঠের পাশের রেখার দিকে দৌড়ে পালাতে শুরু করলেন। অন্যদিকে, কোনো এক অজানা কারণে হলান্ড তার পিছু ধাওয়া করতেই থাকলেন।
অবশেষে দুজন মাঠের সীমানার বাইরে চলে যাওয়ার ঠিক আগে হলান্ড ফারজিকে ধরে ফেলেন। কিন্তু অতিরিক্ত উদ্দীপনার কারণে বল কেড়ে নেওয়ার আগেই তিনি ফারজিকে মাটিতে ফেলে দেন এবং একটি ফাউল করে বসেন। এরপর তিনি দীর্ঘ এক চিৎকার ছেড়ে দেন।
সেটি হতাশার প্রকাশ ছিল, নাকি যুদ্ধের আগে যোদ্ধার গর্জনের মতো নিজের আবেগ ঝেড়ে ফেলার এক ধরনের আর্তনাদ ছিল—আমি নিশ্চিত নই। আমার জীবনে এমন কিছু আগে কখনো দেখিনি। আমি আরও দেখতে চেয়েছিলাম।
নরওয়ের দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল সেনেগালের বিপক্ষে, নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত একটি রাতের খেলা। এই ম্যাচে জিততে পারলে নরওয়ে নকআউট পর্বে উঠে যেত। আমি আমার এক নরওয়েজীয় বন্ধু, এরলেন্ড মর্কের সঙ্গে খেলা দেখতে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম।
মর্ক যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নরওয়ে দলের সফর অনুসরণ করছিলেন এবং দেশটির জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমের জন্য একটি ধারাবাহিক শ্রুতিনাট্য অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছিলেন।
মর্ক একজন কৌতুকশিল্পী ও লেখক। তার টেলিভিশন অনুষ্ঠান 'হেলেরুদসভিঙ্গেন'-এর জন্য, যা 'সাউথ পার্ক'-ধাঁচের একটি অ্যানিমেশন ধারাবাহিক, তিনি দুই পর্বের একটি কাহিনি লিখেছিলেন। সেখানে হলান্ডের একটি কাল্পনিক রূপ দেখানো হয়, যে প্রায় পুরো সময়টাই পশুর মতো গর্জন করতে থাকে। (শেষ পর্যন্ত হলান্ড নিজের জীবন উৎসর্গ করে মূল চরিত্রদের রক্ষা করে নায়কে পরিণত হয়।) খেলা শুরুর আগে মর্ক বিকেলের ম্যাচগুলো দেখার জন্য ব্রুকলিনে আমার বাসায় এসেছিলেন।
তিনি অত্যন্ত গম্ভীরভাবে বললেন, 'এটি আমাদের জীবদ্দশায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনা।' তিনি সঙ্গে করে মিমির ক্রিস্তিয়ানসনকে নিয়ে এসেছিলেন।
তিনি এই সফরের সঙ্গী এবং শ্রুতিনাট্য অনুষ্ঠানের নিয়মিত অতিথি। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কয়েক দিন বনজঙ্গলে কাটিয়ে এসেছেন। তার গায়ে ছিল কুঁচকে যাওয়া একটি জামা এবং পুরোনো হাঁটুর ওপর পর্যন্ত প্যান্ট। মর্ক আমাকে জানালেন, ক্রিস্তিয়ানসন আসলে নরওয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিকদের একজন। তিনি নরওয়ের পার্লামেন্টের সদস্য। তিনি মার্ক্সবাদী 'রেডস' দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে রক্ষণশীলদের মধ্যেও তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যথেষ্ট। অন্যদের সহযোগিতায় তিনি নিজের দলকে প্রান্তিক অবস্থা থেকে তুলে এনে ক্ষমতাসীন জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছেন। মর্ক বললেন, 'তিনি যেন আমাদের দেশের মামদানি।'
ক্রিস্তিয়ানসন পার্লামেন্টে হলান্ডের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে তিনি আমাকে বললেন, 'হলান্ড 'রেডস' দলকে ভোট দিয়েছেন—এমন সম্ভাবনা খুবই কম বলে আমার মনে হয়।' ক্রিস্তিয়ানসন একটি কোমল পানীয় পান করতে করতে ম্যাচগুলো দেখছিলেন। তিনি বললেন, 'নরওয়েতে আমাদের একটি শব্দ আছে—'ফলকেলি'। এর অর্থ হলো একেবারে সাধারণ, আটপৌরে মানুষ।' এটি এমন একটি আদর্শ, যা ক্রিস্তিয়ানসন এবং হলান্ড—দুজনের জনপ্রিয়তার কারণ ব্যাখ্যা করে। ক্রিস্তিয়ানসনের বাড়ি দক্ষিণ-পশ্চিম নরওয়ের তেলসমৃদ্ধ শহর স্টাভাঙ্গারে। হলান্ডের বাড়ি কাছের কৃষিপ্রধান ছোট শহর ব্রিনেতে। উত্তর সাগরের কাছাকাছি সমতল গ্রামীণ এলাকায় শহরটির অবস্থান। ব্রিনের মানুষ খুব বেশি কথা বলেন না।
এই অঞ্চলের একজন নরওয়েজীয় লেখক একবার স্থানীয় মানুষদের বর্ণনা করেছিলেন এভাবে—'তারা এমন এক গম্ভীর জনগোষ্ঠী, যারা গভীর চিন্তা আর কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবনের পথ খুঁড়ে এগিয়ে যায়।'
স্থানীয় ফুটবল ক্লাবের প্রথম মাঠটি ছিল নদীর দুই শাখার মাঝখানের জমিতে। একবার এক শিকারি উড়ন্ত ফুটবলকে হাঁস ভেবে গুলি করে বসেছিলেন। ক্রিস্তিয়ানসন বললেন, 'তাদের মধ্যে কৃষকসুলভ পরিচয় খুবই প্রবল।' 'কোনো খেলোয়াড় ম্যাচসেরা হলে তাকে ডিম উপহার দেওয়া হয়।''একজন খেলোয়াড় হ্যাটট্রিক করার পর তাকে একটি ভেড়া উপহার দেওয়া হয়েছিল।''তাদের মাঠে এমন একটি জায়গাও আছে, যেখানে আপনি নিজের ট্র্যাক্টরে বসেই বিনা মূল্যে খেলা দেখতে পারবেন।'
তেলের বিশাল মজুদের কারণে নরওয়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। দেশটির রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সম্পদ তহবিল। জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্বের অন্যতম বেশি সংখ্যক কোটিপতির বাস নরওয়েতে। তবে সাংস্কৃতিকভাবে দেশটি স্ক্যান্ডিনেভীয় সমতাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী।
মর্ক বললেন, 'এখানে এমন একটি ধারণা রয়েছে যে, নিজের সম্পর্কে খুব বেশি উচ্চ ধারণা পোষণ করা উচিত নয়। এমনকি ধনী ও সফল মানুষদেরও সংযত থাকতে উৎসাহিত করা হয়। নিজের সাফল্য নিয়ে বড়াই করা এখানে ভালো চোখে দেখা হয় না।'
হলান্ড বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলেন। তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মহাতারকা। তবু তিনি এখনো ব্রিনেতেই সময় কাটান। তিনি এখনো স্থানীয় 'ইয়ামি টাইম' কাবাবের দোকানে যান। তিনি এখনো নিজের স্বতন্ত্র গ্রামীণ উচ্চারণেই কথা বলেন। তার সতীর্থরা গোল করলে তাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত মনে হয়।
ক্রিস্তিয়ানসন বললেন, 'এসব কারণে আপনি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে চলাফেরা করেন, কর কম দেওয়ার নানা ব্যবস্থা নেন—তারপরও সবাই আপনাকে বিনয়ী ও সাধারণ মানুষ বলেই মনে করে।' আমি ভেবেছিলাম, ক্রিস্তিয়ানসন যেহেতু 'রেডস' দলের রাজনীতিক, তাই হয়তো হলান্ডকে নিয়ে তার কিছু দ্বিধা থাকবে। কিন্তু তেমন কিছুই নয়। তিনি হলান্ডকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসেন।
আমরা আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার মধ্যকার ম্যাচ দেখছিলাম। সেই ম্যাচে লিওনেল মেসি দুটি গোল করেন। এতে দুজনই ভীষণ আনন্দিত হন। ঊনচল্লিশ বছর বয়সী মেসি এখনো ফুটবলের একক ও অনন্যসাধারণ খেলোয়াড়।
ক্রিস্তিয়ানসন বললেন, 'গত দশ বছর ধরে সবাই আলোচনা করছে, মেসির সিংহাসনে কে বসবে। এমন অনেক 'নতুন মেসি' ইতোমধ্যেই অবসর নিয়ে ফেলেছে।'
তবে একসময় মেসির সময়ও শেষ হবে।
মেসির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী, একচল্লিশ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যার সামর্থ্য এখন অনেকটাই কমে গেছে, দেখিয়ে দিয়েছেন অতিরিক্ত দীর্ঘ সময় ধরে খেলে যাওয়ার ঝুঁকি। ক্রিস্তিয়ানসন বললেন, 'তাকে এখন দিন দিন আরও বেশি জো বাইডেনের মতো মনে হচ্ছে।'
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং স্পেনের লামিন ইয়ামালের মতো নতুন প্রজন্মের মহাতারকাদের মধ্যে পঁচিশ বছর বয়সী হলান্ড একেবারেই ব্যতিক্রম।
মেসি খাটো গড়নের এক অসাধারণ ফুটবল প্রতিভা, যিনি বলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে পুরো খেলায় প্রভাব বিস্তার করেন। অন্যদিকে হলান্ড লম্বা, শক্তিশালী এবং শারীরিক সামর্থ্যে ভরপুর একজন খেলোয়াড়। অনেক সময় তিনি দীর্ঘক্ষণ বল স্পর্শই করেন না। তিনি সাধারণত চোখের পলকে ঘটে যাওয়া দ্রুত আক্রমণ থেকে গোল করেন।
তার অসাধারণ শারীরিক শক্তি অনেক সময় তার অস্বাভাবিক দূরদৃষ্টি ও সহজাত ফুটবল-প্রতিভাকে আড়াল করে ফেলে।
মর্ক বললেন, 'আমি একবার দেখেছি, গোল করার আগেই সে উদ্যাপন শুরু করে দিয়েছিল। গোলটি ছিল একেবারেই সহজ। সে যেন ভাবছিল, "ওহ, ঠিক আছে, আগে তো গোলটা করেই নিই।"' নরওয়ে হলান্ডের 'ভাইকিং' পরিচয়টিকে পুরোপুরি নিজেদের করে নিয়েছে।
দলটি একটি ফিয়র্দের মোহনায় আনুষ্ঠানিক আলোকচিত্র ধারণ করেছিল। সেখানে তিনটি ভাইকিং দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজ রাখা হয়েছিল এবং খেলোয়াড়দের প্রাচীন নর্স যোদ্ধাদের পোশাকে সাজানো হয়েছিল। হলান্ডের হাতে ছিল একটি তলোয়ার। সরকার দলটিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিদায় জানানোর সময় সঙ্গে পাঠিয়েছিল তিনশ কিলোগ্রাম আটলান্টিক স্যামন ও সাদা সামুদ্রিক মাছ, পাশাপাশি একশ কিলোগ্রাম নরওয়েজীয় পনির। নরওয়ের সমর্থকেরা 'ভাইকিং বৈঠা' নামে একটি অভিনয় করে। এতে সবাই মাটিতে বসে পড়ে। একজন ঢাক বাজায়।
আর সবাই একসঙ্গে 'রো!' বলে চিৎকার করতে করতে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি করে, যেন তারা একটি ভাইকিং দীর্ঘ যুদ্ধজাহাজে বসে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে। তারা নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারেও এটি করেছে। আবার বোস্টনের একটি চলন্ত সিঁড়িতেও একই অভিনয় করেছে, যেখানে নরওয়ে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলেছিল। দেখলে মনে হয় এটি বহু পুরোনো একটি ঐতিহ্য। কিন্তু বাস্তবে এটি মাত্র কয়েক মাস আগে চালু হয়েছে। এর একটি কারণ ছিল, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের বহু শতাব্দী আগে লেইফ এরিকসন উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন—সেই ইতিহাসকে স্মরণ করা। তবে সবাই এই ভাইকিং-নির্ভর প্রচারণা পছন্দ করেননি।
মর্ক বলেন, 'এ নিয়ে বেশ বড় ধরনের বিতর্ক হয়েছিল। সমালোচকেরা বলেছিলেন, এটি বিব্রতকর, ডানপন্থী ভাবধারার ইঙ্গিত বহন করে এবং নাৎসিদের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।'
ক্রিস্তিয়ানসন এসব অভিযোগ শুনে শুধু চোখ উল্টে বিরক্তি প্রকাশ করেন।
তিনি বললেন, 'চার্লি কার্ক নিহত হওয়ার পর কাশ প্যাটেল বলেছিলেন, "ভ্যালহালায় দেখা হবে।" বিষয়টি খুবই অদ্ভুত ছিল। কারণ কাশ প্যাটেল ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, আর চার্লি কার্ক ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান। ওই দুজনের কেউই ভ্যালহালায় যাচ্ছেন না। কিন্তু এটি তো আমাদের প্রকৃত ইতিহাসেরই অংশ।'
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আমরা ঘোড়দৌড়ের মাঠে আয়োজিত নরওয়েজীয় সমর্থকদের উৎসবে গিয়েছিলাম। সেখানে মর্ক ও ক্রিস্তিয়ানসনকে ঘিরে ধরেছিলেন অসংখ্য মানুষ। ক্রিস্তিয়ানসন একজনের ফুটবল জার্সিতে স্বাক্ষর দেন। মর্ককে বারবার মানুষের সঙ্গে নিজের ছবি তুলতে হয়। আমি বহু বছর ধরে মর্ককে চিনি।
কিন্তু তিনি যে এত বড় একজন পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছেন, তা কখনো বুঝতে দেননি। সম্ভবত এটাই সেই 'একেবারে সাধারণ মানুষ' হয়ে থাকার নরওয়েজীয় সংস্কৃতি।
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। তবু সবার মনোবল ছিল চাঙ্গা। হাতে হাতে ছিল প্রচুর ঠাণ্ডা পানীয়। একজন সমর্থক প্লাস্টিকের ভাইকিং হেলমেটের একটি শিং খুলে সেটিকে পানীয় এক ঢোকে পান করার পাত্র হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। আরও দুজন বিশাল কাদাপানিভরা গর্তে লাফিয়ে পড়ে 'ভাইকিং বৈঠা' অভিনয় শুরু করলেন।
চারদিকে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করছিল, 'রো!' হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই খেলা শুরু হয়। মাঠে বসে দেখলে বোঝা যায়, একটি ফুটবল মাঠ আসলে অবিশ্বাস্য রকমের বড়। এটি আমেরিকান ফুটবলের মাঠের চেয়েও অনেক বড়।
সেই বিশাল সবুজ মাঠে খেলোয়াড়দের দেখতে ছোট ছোট জাহাজের মতো লাগছিল, যেন তারা সমুদ্রের ওপর ভেসে রয়েছে। এমনকি হলান্ডকেও প্রায় স্বাভাবিক গড়নের মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।
নরওয়ের খেলোয়াড়েরা ভাইকিংদের মতোই শুরু থেকেই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু রক্ষণভাগে তারা খুব একটা সংগঠিত ছিল না। তাদের কিছুটা উদ্বিগ্নও মনে হচ্ছিল। মাঝেমধ্যেই ঢাকের শব্দ উঠছিল।
আর আমরা সবাই আবার 'ভাইকিং বৈঠা' অভিনয় শুরু করছিলাম। খেলায় পানি পান করার বিরতির সময় পর্যন্ত কোনো দলই গোল করতে পারেনি। ফল ছিল শূন্য-শূন্য।
হলান্ড তখন পর্যন্ত খুব কমবারই বল স্পর্শ করেছিলেন। তিনি যেন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন। বেশির ভাগ সময় তিনি শুধু সুযোগের আশায় ওত পেতে ছিলেন।
অন্ধকার পানিতে চক্কর দিতে থাকা একটি হাঙরের কথা হলান্ডকে দেখে মনে পড়ে যেতে পারে। মর্ক বলেন, তার কাছে হলান্ডকে দেখলে 'জস' চলচ্চিত্রের উত্তেজনাপূর্ণ তারবাদ্যযন্ত্রের সুরের কথাই মনে হয়। খেলার তেতাল্লিশতম মিনিটে উত্তর মেরুবৃত্তের ওপরে অবস্থিত শহর হামারফেস্ট থেকে উঠে আসা বদলি খেলোয়াড় মার্কুস হোমগ্রেন পেডারসেন সবাইকে অবাক করে একটি গোল করেন। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ১–০, নরওয়ের পক্ষে। এর কিছুক্ষণ পরই হলান্ড হঠাৎ তার প্রায় উন্মত্ত দৌড়গুলোর একটি শুরু করেন। তিনি সোজা ধেয়ে যান সেনেগালের গোলরক্ষকের দিকে। তিনি বলটি দখল করতে সক্ষম হন। এরপর খুব সংকীর্ণ কোণ থেকে শট নেন। কিন্তু বলটি গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। বিরতির সময় পুরো পরিবেশ ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। এক গোলের ব্যবধানকে খুব একটা নিরাপদ বলা যায় না। হলান্ড খুব বেশি গোলের সুযোগ পান না। আর এরই মধ্যে তিনি একটি বড় সুযোগ নষ্টও করে ফেলেছেন।
মর্ক বলেন, 'এখানে শুধু অপেক্ষা, অপেক্ষা, অপেক্ষা; আশা, আশা, আশা।' খেলার আটচল্লিশতম মিনিটে নরওয়ের আরেক তারকা মার্টিন ওডেগার্ড পেনাল্টি এলাকার ভেতরে একটি পাস বাড়িয়ে দেন।
হলান্ড বজ্রগতিতে সেটির পেছনে ছুটে যান। ফলাফল—নরওয়ের দ্বিতীয় গোল। চারদিকে সবাই চিৎকার করে ওঠে। অনেকেই আনন্দে নিজেদের পানীয় আকাশে ছুড়ে দেন। মর্ক ও ক্রিস্তিয়ানসন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর সেনেগাল একটি গোল শোধ করে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই হলান্ড আবার গোল করেন। আকাশে ভেসে আসা বল তিনি এক স্পর্শেই জালে পাঠিয়ে দেন।
নরওয়ের সমর্থকদের আনন্দ তখন যেন সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরপর আবার পানি পান করার বিরতি আসে। এই বিরতি নিয়ে অনেক সমর্থক সমালোচনা করেছেন।
তাদের অভিযোগ, এটি ফুটবলের পবিত্র ছন্দ নষ্ট করে শুধু অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দেয়। কিন্তু সেই সময় উপস্থিত সমর্থকেরা সবাই মিলে 'ডোন্ট স্টপ বিলিভিন' গানটির কথা উচ্চস্বরে গাইতে শুরু করেন।
তারা তখন পরম উল্লাসে ভাসছিলেন। ক্রিস্তিয়ানসন হাততালি দিতে দিতে চিৎকার করে বলছিলেন, 'পানি পান করার বিরতি! পানি পান করার বিরতি!'
এই দলটিকে নরওয়ের 'সোনালি প্রজন্ম' বলা হয়। দেশটির নতুন রাষ্ট্র-সমর্থিত ক্রীড়া উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল এই দলের খেলোয়াড়েরা পেয়েছেন। কিন্তু হলান্ড ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার একজন খেলোয়াড়।
মর্ক বলেন, 'নরওয়েতে আমরা প্রতিদিন নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাই, কিন্তু জানি যে আমাদের তেলের সম্পদভান্ডার আমাদের ভরসা। ফুটবলে হলান্ডই আমাদের সেই তেলের সম্পদভান্ডার।'
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি নরওয়ে ৩–২ ব্যবধানে জিতে নেয়। এই জয়ের ফলে তারা নকআউট পর্বে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে। ঘটনাটি যেন কেউই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ম্যাচ শেষে হলান্ডকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। সেটি ছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে।
তবে নকআউট নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় সেই ম্যাচের গুরুত্ব তখন অনেকটাই কমে গিয়েছিল। হলান্ড বললেন, 'সম্ভবত ওরাই জিতবে।' এরপরও কেউ স্টেডিয়াম ছেড়ে চলে যায়নি।
সবাই মিলে নরওয়ের ফুটবল সংগীত 'উত্তরের কৃষকেরা' গাইতে শুরু করে। হলান্ড ও তার সতীর্থরা ভেজা মাঠে বসে পড়েন। ওডেগার্ড তখন ঢাক বাজাচ্ছিলেন।
হাজার হাজার সমর্থকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারাও 'ভাইকিং বৈঠা' অভিনয় করতে থাকেন। আমিও তাদের সঙ্গে বৈঠা চালানোর ভঙ্গি করছিলাম। পুরো অভিজ্ঞতাটি ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর।
ক্রিস্তিয়ানসন তখন আমাকে মনে করিয়ে দিলেন, পুরো বিষয়টির মধ্যেই আসলে এক ধরনের অভিনয় রয়েছে। তিনি বলেন, 'লেইফ এরিকসন তো আসলে আইসল্যান্ডের মানুষ ছিলেন। তার বাবা এরিক দ্য রেডের বাবাকে একজনকে হত্যার কারণে নরওয়ে থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। এরপর এরিক দ্য রেড নিজেও একজনকে হত্যা করার কারণে আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হন।'
কিন্তু এসব নিয়ে ক্রিস্তিয়ানসনের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। অন্য কারওও ছিল না। তাই আমরা সবাই বৈঠা চালানোর অভিনয় চালিয়েই গেলাম।
