বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছিল যে ফুটবলারকে
১৯৯৪ সালের ২ জুলাই। রাত তখন ২টা। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন সান্তিয়াগো এসকোবার। হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। কলম্বিয়া জাতীয় দলের ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবারের বড় ভাই সান্তিয়াগো তখন পরিবারের বিশাল এক দল নিয়ে সেখানে ছুটিতে ছিলেন।
কলম্বিয়া নকআউট পর্বে অনেক দূর যাবে—এমন পরিকল্পনা করেই এসকোবার পরিবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে এসেছিল। কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকেই কলম্বিয়া বিদায় নেওয়ায় তাদের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের পরিকল্পনা হঠাৎ বদলে যায়। ১৩ বছরের পেশাদার ফুটবলিং ক্যারিয়ার শেষে সদ্য অবসর নেওয়া সান্তিয়াগোর সঙ্গে লাস ভেগাসে ছিলেন তার বাবা দারিও ও অন্য ভাইবোন-আত্মীয়রা।
আন্দ্রেসেরও সেখানে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সান্তিয়াগোর শত অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি মেদেলিনে নিজ শহরে ফিরে যান। তার বাগদত্তা পামেলা কাসকার্ডো তখন মেদেলিনে ডেন্টাল স্কুলে পড়ছেন, যা আন্দ্রেসের ফিরে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল।
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার সব ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন আন্দ্রেস। সেবারই প্রথম কলম্বিয়া গ্রুপ পর্ব পার হয়েছিল। এরপর ইউরোপীয় ফুটবলে তার দলবদলের বড় সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের আগে এসি মিলান তাদের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসির উত্তরসূরি হিসেবে আন্দ্রেসকে দলে নেওয়ার কথা ভেবেছিল। কিন্তু ওই বিশ্বকাপ কলম্বিয়ার জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
সেই আত্মঘাতী গোল
২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কলম্বিয়ার দ্বিতীয় ম্যাচে একটি আত্মঘাতী গোল করেন আন্দ্রেস। ওই ম্যাচে কলম্বিয়া ২-১ ব্যবধানে হারে। মেদেলিনের বাড়ি থেকে সান্তিয়াগো বলেন, 'আমাদের জন্য এটি খুব কঠিন ছিল। আমরা স্টেডিয়ামে ছিলাম এবং আন্দ্রেসকে ওভাবে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখাটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল।'
সেই আত্মঘাতী গোল শুধু বিশ্বকাপের স্বপ্নই ধূলিসাৎ করেনি, আন্দ্রেস মনে করেছিলেন এর ফলে ইতালির বড় ক্লাবে তার যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যাবে। হারের পরপরই হোটেলের কক্ষে বড় ভাইকে তিনি বলেছিলেন, 'সারা জীবনে কখনোই নিজের জালে গোল করিনি, অথচ বিশ্বকাপের মাঝখানে সেটাই করতে হলো।' সান্তিয়াগো জানান, এই ঘটনা আন্দ্রেসকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল।
সান্তিয়াগো তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, 'ওসব ভুলে যাও। এসি মিলান তোমাকে এক-দুই বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছে। একটি বা দুটি ম্যাচের ওপর ভিত্তি করে তারা খেলোয়াড় কেনে না।' জবাবে আন্দ্রেস বলেছিলেন, 'তারা আমাকে আর নেবে না।'
হুমকির মধ্যে ফুটবল
রোজ বোল স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচে কলম্বিয়া শিবিরে কী পরিমাণ মানসিক চাপ ছিল, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না। ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে মিডফিল্ডার গ্যাব্রিয়েল গোমেজ এবং কোচ ফ্রান্সিসকো মাতুরানা প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন। সেই হুমকি দলের প্রতিটি সদস্যের হোটেলের টেলিভিশন পর্দায় ভেসে উঠেছিল। এছাড়া, ম্যাচের এক দিন আগে রাইট-ব্যাক লুইস হেরেরার বড় ভাই কলম্বিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
সেই সময় কলম্বিয়া ছিল রাষ্ট্র ও মাদক কার্টেলগুলোর যুদ্ধের ময়দান। এর মধ্যে মেদেলিন কার্টেলের নেতা পাবলো এসকোবারের গোষ্ঠী ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে পুলিশের বিশেষ অভিযানে পাবলো এসকোবার নিহত হলেও কলম্বিয়া ফুটবল দল তার তৈরি করা অন্ধকারের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি। সান্তিয়াগো বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বা পরে আন্দ্রেস আমাকে এসব হুমকির বিষয়ে কিছু বলেননি।'
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় দিয়ে কলম্বিয়া বিশ্বকাপ শেষ করে। সান্তিয়াগো বুঝতে পেরেছিলেন দেশে ফিরলে খেলোয়াড়দের জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে। তিনি আন্দ্রেসকে বলেছিলেন, 'কলম্বিয়ায় ফিরো না। আমাদের সাথে এখানে থাকো এবং পামেলাকেও এখানে ডেকে নাও।' কিন্তু আন্দ্রেস জেদ ধরে বলেছিলেন, 'না, আমাকে কলম্বিয়ায় ফিরে সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।' সান্তিয়াগো বলেন, 'ও কখনোই ভাবেনি তারা ওর সাথে এমন কিছু করতে পারে।'
সেই অভিশপ্ত ফোন কল
এসকোবার পরিবারের ঘনিষ্ঠ গোমেজ জানতেন তারা লাস ভেগাসের কোন হোটেলে আছে। তিনিই ফোন করেছিলেন। সান্তিয়াগো বলেন, 'সে আমাদের বলল—ওরা আন্দ্রেসকে মেরে ফেলেছে।'
শোকে মুহ্যমান পরিবারটি লাস ভেগাস থেকে হিউস্টন হয়ে মিয়ামি এবং শেষে মেদেলিনে পৌঁছায়। সান্তিয়াগো বলেন, 'লাস ভেগাসের সেই স্মৃতিগুলো আমাকে কখনো ছেড়ে যায়নি। এটি আমার জীবনের কঠিনতম মুহূর্ত ছিল। ওর এভাবে মারা যাওয়ার কথা ছিল না।'
নাইটক্লাবের বাইরে সেই রাত
৩২ বছর ধরে এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন সান্তিয়াগো। তিনি জানান, আন্দ্রেস কলম্বিয়ায় ফেরার মাত্র চার দিনের মাথায় খুন হন। নীল রঙের হোন্ডা সিভিক গাড়ির চালকের আসনে বসে থাকা অবস্থায় তাকে খুব কাছ থেকে ছয়টি গুলি করা হয়।
সেদিন রাতে নাইটক্লাব পাদোভাতে যাওয়ার সময় ভক্তরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। তিনি অনেকের সাথে বিশ্বকাপের বিষয়ে কথাও বলেছিলেন। তবে সান্তিয়াগো একটি অস্বাভাবিক বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন। ২ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে আন্দ্রেস তার তিন বন্ধুকে ফোন করে সাথে থাকার কথা বলেছিলেন। সান্তিয়াগো বলেন, 'বন্ধুদের এটি অদ্ভুত লেগেছিল কারণ আন্দ্রেস প্রায় কখনোই তার বন্ধুদের এভাবে ফোন করতেন না। ফুটবলের কারণে তার হাতে খুব একটা অবসর সময় থাকত না।'
সান্তিয়াগো আরও বলেন, 'আন্দ্রেস অত্যন্ত পেশাদার ছিলেন। তিনি জানতেন একজন ফুটবলারের জীবন সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। ফুটবলের মৌসুমে তিনি নাইটক্লাবে যেতেন না, মদ পান করতেন না। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন তিনি এমন এক জায়গায় ছিলেন যেখানে তার থাকার প্রয়োজন ছিল না।'
নাইটক্লাব থেকে বের হওয়ার সময় কেউ একজন চিৎকার করে বলে, 'সেই চমৎকার আত্মঘাতী গোলের জন্য অভিনন্দন!' এরপর সেখান থেকে বের হলে দুই মাদক চোরাচালানকারী ভাই তাকে গালিগালাজ ও অপমান করতে শুরু করে।
সাধারণত শান্ত ও সংযমী হিসেবে পরিচিত আন্দ্রেস সেদিন তীব্র ক্ষোভ নিয়ে তার গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। স্থান ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে সেই দলটির দিকেই ফিরে আসেন, যারা তাকে উত্ত্যক্ত করছিল। গাড়ির চালকের আসনে বসেই আন্দ্রেস তাদের কাছে ন্যূনতম সম্মানটুকু দাবি করেন। ঠিক তখনই আচমকা ছয়টি গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে।
মাদক চোরাচালানকারী গ্যালন ভাইদের ব্যক্তিগত বডিগার্ড হুম্বারতো মুনিয়োজ কাস্ত্রো পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন। আদালত তাকে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দিলেও মাত্র ১১ বছর সাজা খেটেই তিনি মুক্তি পান। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে ভূমিকার জন্য গ্যালন ভাইদের ১৫ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মেক্সিকোতে ওই দুই ভাইয়ের একজন, সান্তিয়াগো গ্যালন গুলিতে নিহত হন। এ নিয়ে সান্তিয়াগো এসকোবার বলেন, 'এটি আমাকে আনন্দ দেয় না। কারণ এটি আন্দ্রেসকে ফিরিয়ে আনবে না। আমার কাছে শুধু আন্দ্রেস এবং ওর অভাববোধটাই গুরুত্বপূর্ণ।'
কিশোর আন্দ্রেসের তারকা হয়ে ওঠা
১৯৮৫ সালে সান্তিয়াগো এসকোবার নিজের ক্যারিয়ারের চূড়ায়। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি আতলেতিকো নাসিওনালের মাঝমাঠ দাপিয়ে বেড়ানো এক দক্ষ 'বক্স-টু-বক্স' মিডফিল্ডার ছিলেন তিনি। আর সে সময়ে তার ছোট ভাই আন্দ্রেস ছিলেন এক কৃশকায় কিশোর, যার চোখে ছিল ভাইয়ের দেখানো পথে হাঁটার স্বপ্ন।
এক দুপুরে সান্তিয়াগো তার বেশ কয়েকজন সতীর্থকে নিজেদের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান। খেলোয়াড়েরা যখন আড্ডায় মগ্ন, আঠারো বছর বয়সী লাজুক আন্দ্রেস তখন রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলেন; আড্ডায় যোগ দেওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। সান্তিয়াগোর স্মৃতিতে সেই মুহূর্তটি আজও উজ্জ্বল।
'আমি ওকে বললাম—ভেতরে এসো, সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই,' স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সান্তিয়াগো বলেন। 'আমি সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। দুপুরের খাবার শেষে সবাই চলে যাওয়ার পর আন্দ্রেস আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা সান্তি (ও আমাকে সান্তি বলে ডাকত), আমিও কি কখনো পেশাদার ফুটবলার হতে পারব?' আমি তাকে বললাম, 'যেদিন তোমার ভেতর শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠা আসবে, নিজের ডায়েট বদলাবে এবং জিমে যাওয়া শুরু করবে, সেদিনই পারবে'। আমি তাকে কিছু পরামর্শ দিলাম এবং সে বলল, 'আমি সেটাই করব'।'
ঠিক এক বছর পর, সেই লাজুক কিশোরেরই নাসিওনালের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক ঘটে। তিন বছরের মাথায় ডাক পান কলম্বিয়ার জাতীয় দলে। ১৯৮৮ সালে জেতেন দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসর কোপা লিবার্তোদোরেস—যা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সমকক্ষ। কলম্বিয়ার কোনো ক্লাবের জন্য সেটিই ছিল প্রথম শিরোপা জয়। আন্দ্রেসের এই উল্কাগতির উত্থান ছিল নজিরবিহীন।
সান্তিয়াগো বলেন, 'দুই-তিন বছরের মধ্যেই আন্দ্রেস এমন খেলোয়াড়ে পরিণত হলো যে সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করত—আন্দ্রেস কোত্থেকে এল? ও কে?'
ওই কথাটি মনে পড়লে সান্তিয়াগোর এখনো হাসি পায়—শুরুতে মানুষ আন্দ্রেসকে একজন পেশাদার ফুটবলারের ভাই হিসেবে চিনত। কিন্তু আন্দ্রেসের নিজের ক্যারিয়ার শুরু হতেই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়।
'আন্দ্রেস যখন তারকা হয়ে উঠল, তখন মানুষ আমাকে দেখে বলত—"ওই যে সাচি যাচ্ছে, আন্দ্রেসের ভাই",'সান্তিয়াগো বলেন। 'আমার নিজের চেয়ে ভাইয়ের পরিচয়েই আমি বেশি পরিচিত হতে শুরু করলাম। এই নিয়ে আমরা দুজনে প্রায়ই মজা করতাম।'
আন্দ্রেস এসকোবার ভালো লিখতেও পারতেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তিনি কলম্বিয়ার প্রখ্যাত পত্রিকা 'এল তিয়েম্পো'-তে কলাম লিখতেন। তার শেষ কলামটি মৃত্যুর তিন দিন আগে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, 'দয়া করে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন। সবার জন্য ভালোবাসা। শিগগিরই দেখা হবে, কারণ জীবন এখানেই শেষ নয়।'
'ওর মৃত্যু আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল,' বলছিলেন সান্তিয়াগো। 'আমি ওকে বড্ড ভালোবাসতাম। আরও কিছুদিন ওকে নিজের কাছে আগলে রাখতে চেয়েছিলাম। খুব তাড়াহুড়ো করে ও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ৩২ বছর কেটে যাওয়ার পরও আমি আজও আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদি। যে মানুষ নিজের সবচেয়ে ভালোবাসার কাজটি ছাড়া আর কিছুই করেনি, তার এই পরিণতি আমি মানতে পারি না। ও তো কেবল ফুটবল খেলত। মানুষকে আনন্দ দিত, সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাত আর নিজের দেশ ও শহরের জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দিত।'
সান্তিয়াগো চান আন্দ্রেসকে যেন তার চমৎকার ব্যক্তিত্বের জন্য মনে রাখা হয়; শুধু ২ জুলাইয়ের ঘটনার জন্য নয়।
মেদেলিনের দেয়ালে দেয়ালে আজও আন্দ্রেসের ম্যুরাল শোভা পায়। সেখানে আন্দ্রেসের নামে স্পোর্টস সেন্টার হয়েছে, তার ভাস্কর্য রয়েছে। সান্তিয়াগোর ভাষায়, 'আন্দ্রেস এখনো আমাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে, কোথাও যায়নি। আমরা তাকে যেতে দিইনি।'
