আমরা বাংলাদেশি বলেই কি এই আচরণ?: আইসিসির অ্যাক্রিডিটেশন বাতিলের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন বা সংবাদ সংগ্রহের অনুমতি বাতিল করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই গণহারে সাংবাদিকদের এই অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করার ঘটনায় বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের মতে, শুধু 'বাংলাদেশি' হওয়ার কারণেই আইসিসি এমন বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।
বার্তা২৪.কম-এর স্পোর্টস এডিটর আপন তারিক দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে ক্রীড়া সাংবাদিকতা করছেন। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিষেক আসর থেকেই তিনি মাঠ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ভোরের কাগজ, দৈনিক আমার দেশ, বিডিনিউজ২৪, দৈনিক সকালের খবর এবং ঢাকা পোস্টের মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সংবাদ সংগ্রহের জন্য গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর আবেদন করেছিলেন আপন তারিক। কিন্তু গত ২৬ জানুয়ারি আইসিসি থেকে পাঠানো এক মেইলে তাকে জানানো হয় যে, তার আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, '২৬ জানুয়ারি ইমেইলের মাধ্যমে জানতে পারি আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে। প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় সহকর্মীদের পোস্টে দেখেছিলাম যে সবার অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল করা হচ্ছে। পরে মেইল চেক করে দেখি আমারটাও একই তালিকায়। আইসিসি থেকে পাঠানো একটি অটো-জেনারেটেড মেসেজে কোনো কারণ ছাড়াই আবেদন বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।'
আপন তারিকের মতো আরও শতাধিক বাংলাদেশি সাংবাদিকের আবেদন বাতিল করেছে আইসিসি। ধারণা করা হচ্ছে, টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের বিতর্কিত বিদায়ের পর সাংবাদিকদের ওপর এই খড়গ নেমে এসেছে। আইসিসির কোনো বৈশ্বিক ইভেন্টে এর আগে এমন নজির দেখা যায়নি। সাধারণত কোনো দেশ বিশ্বকাপে না থাকলেও সেই দেশের সাংবাদিকরা পেশাগত কারণে সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু এবার সেই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করেনি আইসিসি।
আপন তারিক আরও বলেন, 'সবাই খুব হতাশ। বাংলাদেশ ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বকাপে খেলছে এবং আমাদের সিনিয়র সাংবাদিকরা তার আগে থেকেই আইসিসি ইভেন্ট কাভার করছেন। বাংলাদেশে ক্রিকেট অত্যন্ত জনপ্রিয়। এমনকি ক্রিকেট সাংবাদিকরা এখানে সেলিব্রেটিও হয়েছেন। বিগত ১২টি আইসিসি ইভেন্ট কাভার করা আমার এক সহকর্মীর অ্যাক্রিডিটেশনও এবার বাতিল করা হয়েছ। তার মতে, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কট করায় আইসিসি যেন এখন বাংলাদেশি সাংবাদিকদের বয়কট করছে। অতীতে বাংলাদেশ না থাকলেও আমরা গিয়েছি, তাই এবারের পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক ও দুঃখজনক।'
আইসিসির নীরবতা ও বৈষম্যের অভিযোগ
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, আইসিসি এই অ্যাক্রিডিটেশন বাতিলের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। বহু সাংবাদিক আইসিসির মিডিয়া বিভাগের সাথে মেইলে যোগাযোগ করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
পাঁচটি বিশ্বকাপ ও চারটি এশিয়া কাপ কাভার আজকের পত্রিকার স্পোর্টস এডিটর রানা আব্বাসও এবার বাদ পড়েছেন। বিসিবি মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের মতে, এবার প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিকের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
রানা আব্বাস বলেন, '২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রায় ৮০ জন বাংলাদেশি সাংবাদিক ছিলেন। এবার কলকাতায় বাংলাদেশের ম্যাচ থাকায় এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার জানামতে অধিকাংশ সাংবাদিকই অনুমতি পাননি। এটি সম্ভবত আইসিসির ইতিহাসে প্রথম ঘটনা যেখানে একটি নির্দিষ্ট দেশের সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন গণহারে বাতিল করা হলো।'
দৈনিক কালবেলার ডিজিটাল স্পোর্টস ইন-চার্জ নাজমুল সাকিব মনে করেন, শুধুমাত্র জাতীয়তার কারণেই সাংবাদিকদের বঞ্চিত করা হয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সাকিব বলেন, '২০১৩ সালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলেনি, কিন্তু আমাদের সাংবাদিকরা সেখানে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। ফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলে না, কিন্তু আমাদের সাংবাদিকরা কাতার বা রাশিয়ায় গিয়ে কাজ করে এসেছেন। তাহলে এবার কেন আমাদের আলাদা করা হচ্ছে? আমরা মনে করি, শুধুমাত্র আমরা বাংলাদেশি বলেই এমন আচরণ করা হয়েছে।'
ভবিষ্যতে আইসিসি ইভেন্টের অ্যাক্রিডিটেশন পেতে এই ঘটনা কোনো বাধা হবে কি না, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আপন তারিক ও রানা আব্বাস আশা করন, এটি ভবিষ্যতের ইভেন্টে প্রভাব ফেলবে না। তবে নাজমুল সাকিব মনে করেন, এই অ্যাক্রিডিটেশন বাতিলের ঘটনা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয় এবং তারা এর একটি সুষ্ঠু ব্যাখ্যা চান।
আপন তারিক বলেন, 'শ্রীলঙ্কায় তো খেলা হচ্ছে, সেখানে আমাদের যেতে বাধা কোথায় ছিল? সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।'
