নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া এগোনোর পথ নেই, জ্বালানি স্বনির্ভরতায় জোর পোশাক খাতের
তৈরি পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর এবং জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট নেতা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশের আয়োজনে 'র্যাপিড এনার্জি ট্রানজিশন কনফারেন্স: পাওয়ারিং সিকিউরিটি, সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড গ্রোথ ইন বাংলাদেশ আরএমজি' শীর্ষক সম্মেলনে তারা এ আহ্বান জানান। এতে ১০৮টি তৈরি পোশাক কারখানার প্রতিনিধিসহ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিএসআরইএ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানি ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সুযোগ এবং শিল্পজুড়ে এ রূপান্তরে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
ইটিআই বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আবিল বিন আমিন বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ব্যয় শুধু কারখানা ও শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিকেএমইএর পরিচালক প্রকৌশলী ইমরান কাদের তুর্য বলেন, শুধু কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে তৈরি পোশাক খাতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, "আমরা ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামোর এসব উদ্যোগ ১০ থেকে ১২ বছর আগেই বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। এখন দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।"
কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, নির্ভরযোগ্য গ্রিড বিদ্যুৎ, উপযুক্ত জমিতে বড় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সংরক্ষণব্যবস্থার সমন্বয়ে একটি হাইব্রিড পদ্ধতির প্রস্তাব দেন তিনি।
বিজিএমইএর স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এনার্জি অপটিমাইজেশনের চেয়ারম্যান নিশাত নাহরিন হামিদ বলেন, উৎপাদন নিরাপত্তা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, "শিল্প হিসেবে জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের আরও স্বনির্ভর হতে হবে। বাংলাদেশের শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার কৌশলে জ্বালানি সার্বভৌমত্বকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।"
বিজিএমইএর ৪৫৩টি কারখানার ওপর করা এক জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, এসব কারখানায় এখনো প্রায় ১৬৫ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো হয়নি। তবে বিনিয়োগ ব্যয়, ছাদের সীমিত জায়গা, পর্যাপ্ত কারিগরি সহায়তার অভাব এবং সাশ্রয়ী অর্থায়ন পাওয়ার জটিলতা—বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে—বাস্তবায়নে বাধা হয়ে আছে।
বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনে বিলম্ব, মূল্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা, কর এবং প্রকল্পের শুরুতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, "বিলম্ব ব্যয় বাড়ায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই।"
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, আমদানি করা এলএনজি, কয়লা, তেল ও আন্তঃদেশীয় বিদ্যুতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়ছে। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহে আমদানি করা এলএনজির অংশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রায় ১১ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
ক্লিনের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ২ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা গেলে বছরে প্রায় ৩১০ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই বিদ্যুৎ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বছরে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার ফার্নেস অয়েল ব্যয় এড়ানো যেতে পারে।
হা-মীম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বসাক জানান, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে তাদের সম্মিলিত বিদ্যুৎ ব্যয় ইউনিটপ্রতি প্রায় ১ থেকে ১ টাকা ২৫ পয়সা কমেছে। এ বিনিয়োগ উঠে আসতে আনুমানিক সাড়ে চার থেকে ছয় বছর সময় লাগে।
সম্মেলন থেকে ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রাকে বছরভিত্তিক বাস্তবায়ন লক্ষ্যে ভাগ করা, প্রকল্প স্থাপনের আগে সাশ্রয়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন ও ওয়ান-স্টপ নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু, স্বাধীন উৎপাদকদের কাছ থেকে সরাসরি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ এবং ছোট কারখানাগুলোর জন্য ক্লাস্টারভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া শিল্পে বিদ্যুতের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য দীর্ঘ মেয়াদি মূল্যনীতি, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রিনিউয়েবল এনার্জি সার্টিফিকেট ট্র্যাক করার বিশ্বাসযোগ্য দেশীয় ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে ক্রয়নীতি, অর্থায়ন, ন্যায্য মূল্য ও দীর্ঘমেয়াদি সোর্সিংয়ের সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ইটিআই বাংলাদেশের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস মুনির উদ্দিন শামীম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমিক, তাদের আয় ও পরিবারের ওপর পড়ে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর একই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর ও সামাজিকভাবে ন্যায়সংগত হতে হবে।
