বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি: অর্থনীতির গভীরে জমে থাকা সংকট
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন ক্রমেই একটি কঠিন নীতিগত ধাঁধায় পরিণত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ, এমনকি যারা সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে ছিল, তারা যখন তুলনামূলক দ্রুত মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে, তখন বাংলাদেশে কেন মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে? এডিবির সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮.৭ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯.০ শতাংশ হতে পারে।
এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিকে শুধু বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বা সাময়িক সরবরাহ-সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। এসব কারণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিগত দুর্বলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
খাদ্যের দাম, বিনিময় হার অবমূল্যায়ন এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ব্যয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি একই সঙ্গে দুর্বল প্রতিযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থার বাধা, দুর্বল পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা, বাজারে অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং বিলম্বিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমন্বয়ের প্রতিফলন। খরচ বাড়লে দাম দ্রুত বাড়ে, কিন্তু চাপ কমলে দাম সেই গতিতে নামে না। বাজার তদারকির দুর্বলতা এবং প্রতিযোগিতা নীতি কার্যকর না হওয়ায় এই অসমতা টিকে থাকে। তাই মুদ্রানীতি কঠোর করা প্রয়োজন, কিন্তু কেবল সুদের হার বাড়িয়ে পণ্যবাজার ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যর্থতা ঠিক করা সম্ভব নয়।
আরেকটি ঝুঁকি আসছে রাজস্বনীতি থেকে। সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য খাতে সরকারের ব্যয়ের অঙ্গীকার বাড়ছে, অথচ রাজস্ব আহরণ এখনো কাঠামোগতভাবে দুর্বল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়লে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে। বেশি সরকারি ঋণ দেশীয় তারল্যের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, অর্থায়নের খরচ বাড়াতে পারে এবং ঘাটতি অর্থায়ন অতিরিক্তভাবে সহনশীল হয়ে পড়লে মূল্যস্ফীতির চাপও জোরদার হতে পারে। এখানে বড় ঘাটতি হলো নতুন ব্যয়ের অঙ্গীকারকে টেকসই রাজস্ব উৎসের সঙ্গে যুক্ত করে এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।
সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আরও তাৎক্ষণিক মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে। ডিজেলের ব্যবহার পণ্য পরিবহন, সেচ, গণপরিবহন, জেনারেটর এবং শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব খুব দ্রুত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি খাতে অদক্ষতা, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর করভার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা নিয়েও গুরুতর আলোচনা প্রয়োজন। এসব কাঠামোগত সমস্যা না মিটিয়ে শুধু বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে প্রয়োজনীয় মূল্যসমন্বয় বারবার মূল্যস্ফীতির নতুন উৎসে পরিণত হতে পারে।
তৃতীয় উদ্বেগ হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল রয়ে গেছে, আর ব্যবসায়ীরা নীতিগত অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক জটিলতা, জ্বালানি ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কথা বলে আসছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ, আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয়ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে আরও পিছিয়ে দিতে পারে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক সরাসরি। বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে ভবিষ্যতের উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত হয়। সরবরাহ সক্ষমতা ধীরগতিতে বাড়তে থাকলে, অথচ নামমাত্র চাহিদা বাড়তে থাকলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। কম বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধিকেও দুর্বল করে, ফলে পরিবারগুলোর পক্ষে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানো আরও কঠিন হয়।
বাংলাদেশ তাই একটি অস্বস্তিকর সমন্বয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে: দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা রাজস্বচাপ, জ্বালানি ব্যয়ের নতুন ধাক্কা এবং দুর্বল বিনিয়োগ। মূল্যস্ফীতিকে প্রধানত মুদ্রানীতির সমস্যা হিসেবে দেখলে বড় ছবিটি বাদ পড়ে যাবে। প্রয়োজন মুদ্রানীতির শৃঙ্খলার সঙ্গে রাজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতা, শক্তিশালী প্রতিযোগিতা নীতি, জ্বালানি খাতের সংস্কার, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা এবং পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশের সমন্বয়। তা না হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাময়িক ব্যতিক্রম না থেকে অর্থনীতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন স্থির বা ধীরে সমন্বিত আয়ের মানুষ। তাই মূল্যস্থিতি ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত সুদের হার নয়, বরং সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার প্রশ্ন, যেগুলো খরচ, ঋণ, সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
ড. সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক
