আমাদের সন্তানরা অপরাধী হয়ে উঠছে কেন
প্রতিদিন দেখতে পারছি শিশু ধর্ষণ ও শিশু মৃত্যুর খবর। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেমন শিশুকে হত্যা করছে, ধর্ষণ করছে, শিশুও শিশুকে হত্যা ও ধর্ষণ করছে। পরপর কয়েকটি ঘটনায় এরকম চিত্রই উঠে এসেছে। এখানেই আমাদের মূল শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ—যে শিশু অপরাধ করছে, আর যে শিশু ভিক্টিম দুজনেই আমাদেরই সন্তান। আমরা কাকে দায়ী করব? কাকে অপরাধী বানাব? কেন শিশুদের একটা অংশ খুব বিপদজ্জনক পথে হাঁটছে? আমাদের পরিবারে ও সমাজে সমস্যাটা কোথায়?
শিশু 'অপরাধী' হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। তাহলে শিশুর সাথে কী এমন ঘটে যে মা-বাবার বুকের ধন একসময় অপরাধী হয়ে উঠে? শিশু যখন অপরাধী হয়, সেটা কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণের ফলে হয় না। এর সাথে জড়িত থাকে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে আছে পরিবারে ঘটে যাওয়া ঘটনার অমীমাংসিত ট্রমা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, সহিংস পরিবেশ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা।
এক শিশু কেন আরেকটি শিশুকে বা কোনো বয়স্ক মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ ও গুরুতর আঘাত করছে এই দিকটা নিয়ে এখনই ভাবার সময় এসেছে। একে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, শিশুদের একটা বড় অংশ অপরাধী হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ ১৭ বছর বয়সী শিশু রয়েছে প্রায় ৫.৬৯ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (সূত্র: ইউনিসেফ)। কাজেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
কোনো শিশু যখন অপরাধ করে, আমরা অনেকসময় ধরে নিই এই শিশু-কিশোর 'খারাপ' বা 'জন্মগতভাবে হিংস্র'। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। শিশু-কিশোরদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতা জৈবিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক কারণের সম্মিলিত ফল বলে মনেকরেন মনোবিজ্ঞানীরা।
যারা ছোটবেলা থেকে মারধর, অপমান, পারিবারিক কলহ বা সহিংসতা দেখে বড় হয়, তাদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের ঝুঁকি বেশি থাকে। বাংলাদেশে হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে, পরিবারের মধ্যে বেড়েছে অস্থিরতা ও বিভক্তি, বেড়েছে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি এবং নানা ধরনের দ্বন্দ্ব, যা শিশু-কিশোরদের উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ অবহেলা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, নিরাপত্তাহীনতা শিশুর সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
মনোবিজ্ঞান বলে, শিশু বয়সে এবং কৈশোরকালে মস্তিষ্কের যে অংশ মানুষের সিদ্ধান্তগ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত কাজ করতে থাকে। কৈশোরে যথাযথ দিকনির্দেশনা ও মানসিক সহায়তা না পেলে পরবর্তীকালে ব্যক্তির রাগ, প্রতিশোধ বা আবেগ বেড়ে যায় এবং এর ফলে মানুষ যেকোনো ধরনের সহিংসতা ঘটাতে পারে।
কিশোর বলেই যে এরা ছোটখাটো অপরাধ করছে, তা নয়। মাদক বিক্রি ও সেবন, যৌন হয়রানি, চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি ও খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এরা।
কানাডিয়ান-আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার 'বোবো ডল' ছিল খুব শক্তিশালী একটি তত্ত্ব। তিনি ১৯৬১ সালে এক পরীক্ষায় দেখিয়েছিলেন শিশুরা যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে একটি পুতুলের প্রতি আক্রমণাত্মক বা নিরপেক্ষ আচরণ করতে দেখে, তখন তারা সেই আচরণটাই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শিখে ফেলে। যেসব শিশু দেখেছে যে বড়রা পুতুলটির উপর আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে, তারা পরবর্তীতে নিজেরাও ওই পুতুলটিকে মারধর করেছে বা আক্রমণাত্মক আচরণ করেছে।
আমরা বলি, 'শিশু যা দেখে, তাই শেখে'। বান্দুরার বোবো ডল তত্ত্বটি সেকথাই প্রমাণ করে। পরিবারে, পাড়ায় বা অনলাইনে যদি শিশু বারবার সহিংসতা দেখে, এবং বুঝতে পারে যে এর জন্য তেমন কোনো জবাবদিহি নেই, তাহলে তারা সহিংসতাকে 'সমস্যা সমাধানের গ্রহণযোগ্য উপায়' হিসেবে শেখে। তারা দেখছে পরিবার ও সমাজের মধ্যে চরম অব্যবস্থাপনা, মূল্যবোধের অভাব, ভালবাসাহীনতা, অসততা এবং অর্থের প্রতি মোহ। পরিবারের 'ভিতরে অপরাধী' বা 'অপরাধের উপস্থিতি' শিশুকে বিপদের মুখে এনে দাঁড় করায়।
পরিবার ও সমাজের অভিভাবকরা যদি ভুল পথে যায়, তাহলে শিশু-কিশোর সেই দিকেই যাবে। এই সমাজে অভিভাবকদের অসচেতনতা, অসততা, দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদ, প্রতিহিংসা, ক্ষমতা ও অর্থলোভের মতো নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো সন্তানদের ধ্বংসের পথে পরিচালিত করছে।
শিশু-কিশোরের এই আচরণ এক ধরনের অসহিষ্ণু সমাজের কথা বলছে। শিশু অপরাধ বিষয়ক গবেষকরা মনে করেন, অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের সামাজিক বন্ধন খুব দুর্বল থাকে। এদের অনেকেই মা-বাবা ও পরিবারের ভালোবাসা, যত্ন ও মনোযোগ না পেয়ে অনাদরে অবহেলায় বড় হয়।
অন্যদিকে আরেক শ্রেণির শিশু-কিশোর যখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কিছু পেয়ে যায়, যখন তাদের কাজ বা আচরণের জন্য কোথাও কোনো জবাবদিহি করতে হয় না এবং যখন তারা দেখে তাদের অভিভাবক অসৎ ও অন্যায় করেও শক্তির জোরে টিকে থাকছে, তখন তারাও খুব সহজেই এমন বিপজ্জনক পথে পা বাড়ায়।
আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানী জন ডলার্ড 'হতাশা-আগ্রাসন হাইপোথিসিস'-এ ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে হতাশা সবসময়ই আগ্রাসনের জন্ম দেয়। এসব আক্রমণাত্মক আচরণের পেছনে সবসময়ই কোনো না কোনো পূর্ববর্তী হতাশা, দীর্ঘদিনের অপূর্ণ চাহিদা, অপমান, বঞ্চনা বা হতাশা কাজ করে। ডলার্ডের এই ধারণা আমাদের সমাজের জন্য সত্য হয়ে উঠছে।
কিশোর অপরাধী চক্রের সদস্যদের মধ্যে বড় অংশই কিশোরএবং দরিদ্র ঘরের সন্তান। ছোটবেলা থেকে জীবনের অপ্রাপ্তি, হতাশা, বেদনা তাদের মধ্যে ক্রোধ তৈরি করছে। যখন তারা দেখে তাদের বয়সী আরো শিশুরা সুখ, ভালবাসা, যত্ন ও ঐশ্বর্য ভোগ করছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে একধরনের দুঃখ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
তাদের ভেতরের এই ক্ষোভকেই কাজে লাগায় এলাকার সন্ত্রাসী ও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা। 'বস' বা 'বড় ভাই' নামে পরিচিত চক্রের সদস্যরা এসব হতাশ শিশু-কিশোরদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয় ও অপরাধ করতে শেখায়। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা 'গডফাদারের' পেছনে থেকে পথভ্রষ্ট হয়।
কিশোর গ্যাংয়ের অনেকেই বলেছে, তাদের জীবনের লক্ষ্য 'অপরাধ সাম্রাজ্যের বড় ভাই' হওয়া, কারণ সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি কিশোরদের প্রলুব্ধ করছে। কিশোররা যখন দেখে অপরাধীরা হিরো এবং বড়রা নানা অপরাধ করে ক্ষমতাবান হচ্ছে, তখন তারাও গ্যাং গঠন করে নিজেকে ক্ষমতাবান করতে চায়।
পড়াশোনার সুযোগ ও সামাজিক সুবিধা বঞ্চিত শিশু-কিশোরের সংখ্যা অনেক বেশি। এরা অনেকেই গৃহহীন, যত্ন ও ভালোবাসাহীন। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে পড়াশোনা না জানা, বখে যাওয়া এইসব ছেলেদের পেছনে ছুটছে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ও ধনী ঘরের সন্তানরা। কাজেই এ কথা ভাবার কোনো সুযোগ নাই যে আপনার সন্তান নিরাপদে আছে।
কিশোর অপরাধী নতুন নয়, গত কয়েকবছর ধরেই এরা বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। অর্থ আর ক্ষমতা পাওয়ার জন্য যেকোনো ধরনের অপরাধের সাথে খুব সহজেই সম্পৃক্ত হচ্ছে এরা। অপরাধী চক্রের সাথে জড়িত শিশু-কিশোরদের একটা বড় অংশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে স্কুল-কলেজের ছাত্ররাও এসব চক্রে জড়িয়ে পড়ছে।
একটা সময় কিশোররা পাড়া-মহল্লায় ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি করত, রকে বসে আড্ডা দিত, বিড়ি-সিগারেট টানত। কিন্তু ক্রমশ এরা গ্যাংয়ের অংশ হয়ে শক্তি প্রদর্শন করছে। কিশোর অপরাধের হার বেড়েছে, চরিত্র পাল্টেছে, অপরাধের ধরনে ভয়াবহতা এসেছে, হাতে এসেছে নানান ধরনের অস্ত্র। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এভাবে তাদের জড়িয়ে পড়ার হার খুবই উদ্বেগজনক।
এই সমাজ তাদের শিখিয়েছে ভিলেনরাই ক্ষমতাধর, ভিলেনরাই প্রকৃত রোল মডেল। এখানে পড়াশোনা করে, ভাল মানুষ হয়ে একজন মানুষ যা পায়, দুর্নীতি করে বা অন্যেরটা কেড়ে নিয়ে এর চাইতে অনেক বেশি পাওয়া যায় এবং আরামেও থাকা যায়। তাই হয়তো এই পথকেই পছন্দ করছে আমাদের সন্তানরা।
অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, পরিবারে সহিংসতা, অবহেলা যেমন শিশুকে ক্ষুব্ধ করে, তেমনি অতিরিক্ত শাসন ও বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে শিশুরা পরিবার, ভালবাসা, শিক্ষা, বিনোদন, আনন্দ, খেলাধুলা থেকে বিচ্ছিন্ন, একসময় তারাই সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বড় একটি কারণ দ্রুত নগরায়ন, নগরের বস্তিজীবন, ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। শিশুর জন্য নেই কোন খোলা ময়দান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিকল্পিত আবাসন। ইনফ্যাক্ট নগরগুলোতে শিশুর জন্য কোনো আশ্রয় ও ভালোবাসা নাই। আছে উদ্বেগ, হতাশা, ট্রমা, ক্ষোভ ও আত্মসম্মানবোধের সংকট। আর সমাজবিচ্ছিন্ন শিশুরা অপরাধীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি খোঁজে। এককথায় বলা যায় সামাজিক বৈষম্য অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়।
শিশু-কিশোরদের ফেরাতে হলে অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সচেতন হতে হবে। দ্রুত উপায় খুঁজে বের করতে হবে যেন শিশু বেড়ে উঠতে পারে একটি আনন্দময় পরিবেশে। বড়দের পক্ষ থেকে শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেন তারা ঝুঁকির মুখে না পড়ে। শিশুরা হারিয়ে গেলে, পরিবার, সমাজ, দেশ সব ভেঙে পড়বে। হয়তো একটা সময় ফিরে আসার আর পথ থাকবে না।
-
শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক -
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
