আহসান মনসুরের অপসারণ: ‘ভবিষ্যতে এমন পদে দায়িত্ব নিতে দুবার ভাববেন যোগ্যরা’
এই পুরো ঘটনাটি আসলে যে বার্তা দিচ্ছে
আহসান এইচ মনসুর যখন দায়িত্ব থেকে অপসারিত হন, তখন ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার চলছিল। তার মেয়াদে বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক গতি দেখা দিয়েছিল এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেও তিনি পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। একদল দক্ষ, তরুণ এবং সংস্কারমনা পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী টিম গঠন করেছিলেন। তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যপ্রণালি এবং মুদ্রানীতির কাঠামোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল। সংস্কারের স্বার্থে তিনি বেশ কিছু সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা আর্থিক খাতের স্থবিরতা কাটাতে সহায়ক ছিল।
তার সব সিদ্ধান্তের সাথে সবার একমত হওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও, সংকটের সময়ে নেওয়া তার এই উদ্যোগগুলো আরও বেশি স্বীকৃতি ও সম্মান পাওয়ার যোগ্য ছিল।
এটি এমন এক বার্তা দেয় যে, এরকম গুরুদায়িত্ব পালনকারী যোগ্য ব্যক্তিরাও হয়তো যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পাবেন না। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে দক্ষ ব্যক্তিরা এ ধরনের পদে দায়িত্ব নিতে দুবার ভাবতে পারেন।
সরকার চাইলে যেকোনো পর্যায়ে নেতৃত্বে রদবদল করতে পারে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, ড. মনসুরের মতো একজন অর্থনীতিবিদকে এমন এক মর্যাদাপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদ থেকে যেভাবে সরানো হয়েছে, তা মোটেও সৌহার্দ্যপূর্ণ বা সম্মানজনক ছিল না। একটি সুন্দর ও মার্জিত বিদায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারত।
জানা গেছে, অপসারণের মাত্র একদিন আগে তিনি নতুন অর্থমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিলেন, যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত ছিল না। এমনকি পরদিন সংবাদ সম্মেলন শেষ করার পর তিনি গণমাধ্যমের খবর থেকে জানতে পারেন যে, তিনি আর গভর্নর পদে নেই। অন্তত তাকে আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো যেত। যেকোনো স্তরেই প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি একটি বড় উদ্বেগের জন্ম দেয়: ভবিষ্যতে যারা এ ধরনের পদে আসবেন, তাদের কাছে এর বার্তা কী? বিশেষজ্ঞদের যদি সংস্কারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, কিন্তু তাদের বিদায় যদি অমর্যাদাপূর্ণ হয়, তবে সংকটের সময়ে এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব নিতে অনেকেই দুবার ভাববেন। এটি মনে রাখা জরুরি যে, ড. মনসুর অত্যন্ত কঠিন এক সময়ে প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এমন কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা সবসময় সহজ বা জনপ্রিয় ছিল না। তার সেই অবদানের স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল।
একই সঙ্গে, আর্থিক খাতের সংস্কার যে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ওপর তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি থাকবে। আশা করা যায়, তিনি সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন এবং অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আর্থিক খাত এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে, একে স্থিতিশীল করা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সামনের দিনগুলোতে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কার কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত। দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগিয়ে নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও একটি বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে থাকবে; যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদটি নিঃসন্দেহে একটি 'কণ্টকাকীর্ণ আসন'। নতুন গভর্নরকে কেবল সংস্কারই এগিয়ে নিতে হবে না, বরং প্রভাবশালী মহলের চাপও মোকাবিলা করতে হবে। সংস্কারের গতি বজায় থাকে কি না এবং স্বার্থান্বেষী মহলের চাপের মুখে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কি না; তা আগামী মাসগুলোতেই স্পষ্ট হবে।
লেখক: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ
