‘স্বার্থের সংঘাত’
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও গার্মেন্ট কারখানার মালিক মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
আর সেই প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতারও রক্ষক—যা বর্তমানে দুর্বল এবং এসবখাতে জরুরি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
ফলে এই বিতর্ক কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং মুদ্রা ব্যবস্থার অখণ্ডতা বা সততা নিয়েও।
সমালোচনার কেন্দ্রেই রয়েছে 'স্বার্থের সংঘাত' বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের প্রশ্ন—যা আরও তীব্র হয়েছে এই প্রতিবেদনের পর যে তিনি সম্প্রতি একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল সুবিধার আওতায় ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করিয়েছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ব্যাংকঋণ, বিনিময় হার নীতি ও রপ্তানি প্রণোদনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একজন রপ্তানিমুখী ব্যবসার মালিক গভর্নর হিসেবে এমন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে অবস্থান করবেন, যা তার নিজ খাতকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সততা থাকলেও এখানে যে 'ধারণা' বা 'পারসেপশন' তৈরি হয় সেটাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং দাঁড়িয়ে থাকে মূলত বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর, আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল কার্যক্রমে নয়, দৃশ্যমান নিরপেক্ষতার ওপরও নির্ভর করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ. রুমী আলী বলেন, "এখানে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।" তিনি বলেন, নতুন গভর্নর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদিত নীতিসহায়তার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা নিয়েছেন।
এছাড়া দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রশ্নও উঠেছে। একটি কারখানার ব্যালান্স শিট পরিচালনা করা, আর একটি দেশের মুদ্রানীতি কাঠামো পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। গভর্নরকে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, বিনিময় হারের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পর্যাপ্ততা এবং সামগ্রিক ব্যাংকিং ঝুঁকি—এসব জটিল বিষয় বৈশ্বিক নজরদারির মধ্যেই সামলাতে হয়। আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেলিং, আর্থিক স্থিতিশীলতা তদারকি এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অপরিহার্য। বাজার সাধারণত দীর্ঘ অভিযোজনকাল দেয় না।
এ ধরনের নিয়োগের মাধ্যমে যে সংকেত যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগকে বিনিয়োগকারী, বহুপাক্ষিক ঋণদাতা ও রেটিং সংস্থাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্বতার সূচক হিসেবে দেখে। মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকখাত ও বৈদেশিক চাপের মুখে থাকা অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হতে পারে—এমন সামান্য ইঙ্গিতও ঝুঁকি প্রিমিয়াম বাড়াতে পারে এবং মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
সুশাসনের পক্ষের ব্যক্তিরাও এই সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গতকাল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রশ্ন তুলেছে, নতুন গভর্নর করপোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে পারবেন কি না। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, "স্বার্থের সংঘাতে জড়িত একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।"
নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়া সুশাসনের নীতি ও আইনের শাসন থেকে সরকারের স্পষ্ট বিচ্যুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক।
তিনি সতর্ক করেন, "আর্থিক ও অর্থনৈতিক খাতকে যদি রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা না যায়, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে বেশি সময় লাগবে না।"
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, এই নিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সঙ্গে নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক; সেখানে একজন ব্যবসায়ীকে প্রধান হিসেবে বসালে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরাসরি বলেন, "তিনি ভালো মানুষ, ভদ্রলোক। কিন্তু, তিনি তো আর বিয়ে করতে যাচ্ছেন না। এই পদে ভিন্ন ধরনের পটভূমি দরকার।" তার মতে, গভর্নরকে নিয়মিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে কাজ করতে হয় এবং অর্থ সরবরাহ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—বিস্তৃত বিষয়ে তাঁর দক্ষতা থাকা অপরিহার্য।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্যতা প্রমাণ করে না। তবে গভর্নরের চেয়ারে বসতে হলে নিখুঁত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। উদীয়মান অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বিলাসিতা নয়; এটি স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা থাকলেই তা কারো অযোগ্যতা প্রমাণ করে না। তবে গভর্নরের চেয়ারে বসতে হলে নিখুঁত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। উদীয়মান অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বিলাসিতা নয়; বরং এটিই স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
দ্বিতীয় বিতর্ক: ড. আহসান এইচ মনসুরের বিদায় ঘিরে
বিতর্ক নতুন নিয়োগেই শেষ নয়। ড. আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে সরানো হয়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ কম নয়।
২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া ড. মনসুরের বিদায় প্রসঙ্গে বেসরকারি একটি ব্যাংকের অপর এক সিইও প্রশ্ন তোলেন, "এ কেমন সংস্কৃতি?" মনসুরের দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকখাত অভ্যন্তরীণ ঋণ বিতরণ ও উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে নাজুক অবস্থায় ছিল।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, তার অপসারণ কী বার্তা দেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আহসান মনসুরকে অপসারণের সময় কাঠামোগত সংস্কার চলছিল। বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক গতি দেখা দিয়েছিল এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেও তিনি পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। একদল দক্ষ, তরুণ এবং সংস্কারমনা পেশাজীবীদের নিয়ে তিনি একটি শক্তিশালী টিম গঠন করেছিলেন। সংস্কারের স্বার্থে তিনি বেশ কিছু সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা আর্থিক খাতের স্থবিরতা কাটাতে সহায়ক ছিল।
"তার সব সিদ্ধান্তের সাথে সবার একমত হওয়ার প্রয়োজন না থাকলেও, সংকটের সময়ে নেওয়া তার এই উদ্যোগগুলো আরও বেশি স্বীকৃতি ও সম্মান পাওয়ার যোগ্য ছিল"- বলে মন্তব্য করেন ড. জাহিদ।
তিনি উল্লেখ করেন, "অপসারণের মাত্র একদিন আগে তিনি (আহসান মনসুর) নতুন অর্থমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিলেন, যেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত ছিল না। এমনকি পরদিন সংবাদ সম্মেলন শেষ করার পর তিনি গণমাধ্যমের খবর থেকে জানতে পারেন যে, তিনি আর গভর্নর পদে নেই। অন্তত তাকে আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো যেত। যেকোনো স্তরেই প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত এই পর্যায়ে তো বটেই।"
"কিন্তু তাঁর বিদায়ের ধরনটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এটি এমন এক বার্তা দেয় যে, এরকম গুরুদায়িত্ব পালনকারী যোগ্য ব্যক্তিরাও হয়তো যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পাবেন না। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে দক্ষ ব্যক্তিরা এ ধরনের পদে দায়িত্ব নিতে দু'বার ভাবতে পারেন"- যোগ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক সেলিম জাহানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, মনসুরের আমলে সংস্কার শুরু হয়েছিল, ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়েছিল, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়েছিল এবং রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।
তিনি বলেন, "এগুলো ছোটখাটো অগ্রগতি নয়। আমি বলব, ড. মনসুরের মেয়াদে অর্থনৈতিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল।"
এখন প্রশ্ন রয়ে গেছে—তাকে এত হঠাৎ কেন বিদায় নিতে হলো?
নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের নতুন গভর্নর নিয়োগের অধিকার অবশ্যই রয়েছে—এটি অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু অনেককে বিস্মিত করেছে দায়িত্বশীল একজন গভর্নরকে বিদায়ের ধরন।
অথচ এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অপসারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "কিছু বলার নেই।" নতুন গভর্নরও মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। একপর্যায়ে ব্রিফিংয়ের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হলেও পরে জানা যায়, তিনি চলে গেছেন।
নিয়োগের প্রক্রিয়ায় নিয়ে হতাশ এক ব্যবসায়ী বলেন, "এটা আমার হিসেব-নিকেশের সঙ্গে মেলে না। কারণটা কী তা কেবল সরকারই জানে।"
নতুন নিয়োগে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন এবং সাবেক গভর্নরের আকস্মিক বিদায়—এই দুই বিতর্ক এমন এক সময়ে ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যখন দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো–স্থিতিশীলতা ও আস্থা।
