বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে বাণিজ্যিক চাষ: বাংলাদেশে আবারও বাড়ছে দেশীয় মাছের সংখ্যা
গবেষকদের মতে, চায়না জাল, কারেন্ট জালের মতো সূক্ষ্ম জালের নির্বিচার ব্যবহার, আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির বিস্তার, দূষণ এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে।
তবে গত দুই দশকে প্রজনন ও চাষাবাদ প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে মৎস্য বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রায় ৪১টি বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৯টি প্রজাতি এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে—যা স্থানীয় বাজারকে বদলে দিচ্ছে এবং একসময় দুর্লভ মাছগুলোকে আবার সাধারণ ভোক্তার কাছে ফিরিয়ে এনেছে।
২০০০ সালের শুরুর দিকে পাবদা ও গুলশাসহ কিছু মাছের কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। পরে কই, শিং, ট্যাংরা, দেশীয় পুঁটিসহ আরও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে কাজ বিস্তৃত হয়। ২০০২ সালের মধ্যে হ্যাচারিগুলো বাণিজ্যিকভাবে পোনা উৎপাদন শুরু করে, যা বড় পরিসরে চাষাবাদের ভিত্তি তৈরি করে।
বর্তমানে এসব মাছ শুধু বড় শহরের বাজারেই নয়, রাস্তার পাশের ছোট দোকানেও বিক্রি হচ্ছে। বিদেশি মাছের মতোই এখন এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে পাবদা ৩৫০-৬০০ টাকা, গুলশা ৫০০-৭০০ টাকা, কই ২৭০-৩৫০ টাকা, শিং ৪০০-৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৬০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাগুর, ফলি ও ভেদাসহ অন্যান্য দেশীয় মাছও পাওয়া যাচ্ছে।
ছোট দেশীয় মাছ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন) এসব মাছের অনেকগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তিনি বলেন, "আমরা ইতোমধ্যে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু মাছকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বাণিজ্যিক চাষের আওতায় এনেছি। বাকি প্রজাতিগুলো নিয়েও কাজ চলছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা প্রয়োজনীয় মাছ শনাক্ত করতে সহায়তা করে।"
তবে তিনি জানান, এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না।
তার ভাষ্যমতে, ২০০০ সালের দিকে গবেষণা শুরু হলেও শুরুতে বাণিজ্যিক বিস্তার ধীরগতির ছিল। মাছ চাষ অনেকাংশে খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রতিটি প্রজাতির জন্য আলাদা খাদ্যের প্রয়োজন হয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪১টি বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লইট্যা ট্যাংরা, খলিশা, শোল, গুলশা, বোয়ালী পাবদা, তিতপুঁটি, ট্যাংরা, পাবদা, সরপুঁটি, কই, শিং, মাগুর, দারকিনা, বাটা, গুতুম, ভেদা, চিতল, গজার, ফলি ও মহাশোলসহ আরও অনেক প্রজাতি।
এর মধ্যে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, বাটা, কই, শিং, মাগুর, চিতল, কুচিয়া ও ভেদাসহ ১৯টি প্রজাতি এখন ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে।
আইইউসিএনের ২০০০ সালের জরিপে ৫৪টি মাছকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, আর ২০১৫ সালের জরিপে আরও ৬৪টি প্রজাতি যুক্ত হয়। সর্বশেষ রেড লিস্ট অনুযায়ী, ৬৪টি প্রজাতি ঝুঁকিতে রয়েছে—এর মধ্যে ৯টি মহাবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২৬০-২৬৫টি দেশীয় স্বাদুপানির মাছ রয়েছে, যা প্রায় ৫০টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১০০টি প্রজাতির প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিক্স বিভাগের শিক্ষক মো. গোলাম কাদের খান বলেন, চায়না জাল ও কারেন্ট জাল শুধু ছোট মাছই নয়, ব্যাঙ, সাপ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, কেঁচোসহ প্রায় সব ধরনের জলজ প্রাণী ধরে ফেলে, যা জলজ জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সাকার ফিশ ও গোরামির মতো আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতি দেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব মাছ দেশীয় মাছের আবাসস্থল ও খাদ্য দখল করছে এবং ছোট দেশীয় মাছ ও তাদের পোনা খেয়ে ফেলছে। দ্রুত বংশবৃদ্ধি ও তুলনামূলক বড় আকারের কারণে এগুলো দেশীয় মাছের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
এই বাজার পরিবর্তনের পেছনে রয়েছেন হাজার হাজার চাষি ও হ্যাচারি মালিক।
ময়মনসিংহের সততা হ্যাচারির মালিক এবং বাংলাদেশ হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম তালুকদার ১৯৯৪ সাল থেকে পোনা উৎপাদন করছেন। কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর থেকেই তিনি দেশীয় মাছ নিয়ে কাজ শুরু করেন।
তিনি বলেন, "শুরুতে চাহিদা কম ছিল। তবে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মানুষের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।"
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার হ্যাচারি রয়েছে, যেখানে দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদন হয়; এর প্রায় অর্ধেকই ময়মনসিংহে অবস্থিত। শফিকুল প্রায় ৩০টি দেশীয় মাছের পোনা উৎপাদন করেন, যার অনেকগুলোই একসময় বিলুপ্তপ্রায় ছিল।
