শোককে কি শক্তিতে পরিণত করতে পারবেন তারেক রহমান?
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের যে নজিরবিহীন ঢল নেমেছিল, তা কেবল তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনই ছিল না বরং ছিল অধিকার আদায় ও গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে তার রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন।
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তার প্রস্থান বিএনপিকে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই নির্বাচনে খালেদা জিয়া নিজে প্রার্থী হয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়ার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের বিপরীতে নিজ দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই মায়ের মৃত্যুর শোক সামলে তারেক রহমানের কাঁধে এখন দলকে এগিয়ে নেওয়ার পূর্ণ ভার।
নেত্রীর বিয়োগে বর্তমানে পুরো বিএনপি পরিবার শোকাতুর এবং দেশব্যাপী সাত দিনের শোক কর্মসূচি পালন করছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো এই গভীর শোক কি বিএনপির জন্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারবে? নেত্রীর সেই আপসহীন স্পৃহা কি দলটিকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে?
কোটি মানুষের হৃদয়ে খালেদা জিয়ার যে আসন, সেই প্রবল জনপ্রিয়তা ও আবেগ যদি ভোটের মাঠে প্রতিফলিত হয়, তবে দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জন্য এটি হতে পারে মসনদে ফেরার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দল গঠনের পর এটিই দলটির জন্য দীর্ঘতম সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার রেকর্ড।
অতীতের অভিজ্ঞতা বিএনপি ও তার সমর্থকদের জন্য ভাবনার খোরাক এবং আশার ইঙ্গিত দেয়।
১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ওই বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়ার ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা বিএনপিকে জয়ী হতে সাহায্য করেছিল। তার উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে বিশাল জয় লাভ করেন। এই জয় জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল।
খালেদা জিয়া নিজেও বিপুল রাজনৈতিক সমর্থনের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন প্রয়াত জিয়াউর রহমানের থেকে। সেটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিএনপিকে পুনর্গঠিত করেন এবং স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে জোরদার করেন। ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এর ঠিক চার মাসের পরেই এরশাদ ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে এ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন।
ওইসময় সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজপথের একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার উত্থান হয়। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দল পুনর্গঠন এবং অন্যান্য দলের সাথে জোট গঠনের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করেন। তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেননি, কারণ তার মতে এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানে তাকে বৈধতা দেওয়া। যখন আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল, তখন খালেদা জিয়া একাই তার অবস্থানে অটল ছিলেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যান। তাকে স্তব্ধ করতে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছিল কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।
ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলে, যা খালেদা জিয়ার অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করে। এটি রাজনীতিতে তার অবস্থানকে আরও সুসংহত করে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সংসদ থেকে পদত্যাগ করে এবং আন্দোলনকে তীব্রতর করতে সহায়তা করে। ততদিনে খালেদা জিয়া একজন আপসহীন নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তার ভাবমূর্তি যে গণজোয়ার তৈরি করেছিল, তা ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এক অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে বিজয়ী হতে বিশাল ভূমিকা রাখে।
২০০৭-০৮ সালের জরুরি অবস্থার সময় রাজনীতি ছাড়ার দেশ ত্যাগ করার সব চাপ উপেক্ষা করেন খালেদা জিয়া। দুর্নীতির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।
খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন, শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না এই অবস্থান থেকে তিনি বিএনপি জোটকে নেতৃত্ব দিয়ে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেন।
খালেদা জিয়ার বক্তব্য আবারও সত্য প্রমাণিত হয়। ২০১৪ সালের পর অনুষ্ঠিত টানা তিনটি নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। এসব নির্বাচন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে এবং তাকে কর্তৃত্ববাদী শাসকে পরিণত করে যার পরিণতি আসে ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে; শেষ পর্যন্ত তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
তবে এখন যখন আরেকটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হয়েছে, তখন দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য খালেদা জিয়া আর বেঁচে নেই। তিনি লড়াইয়ের মশালটি তুলে দিয়ে গেছেন তার সন্তান তারেক রহমান ও দলের নেতাকর্মীদের হাতে।
আসন্ন এই নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং বিএনপির জন্য 'মেক অর ব্রেক' অর্থাৎ সাফল্য বা ব্যর্থতার এক নির্ণায়ক। এই নির্বাচনে জয়ী হতে পারাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তার দলের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কি পারবে সেটি অর্জন করতে?
ইংরেজি ভাষায় এই আর্টিকেলটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন
