স্বাগতম ইসরায়েলে—ট্রাম্পের নিজের দেশে
বিশ্ব মানচিত্রে এমন একটি দেশ রয়েছে, যেখানে ভোটযুদ্ধে দাঁড়ালে ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব অনায়সেই যেকোনো জাতীয় নির্বাচনে জিততে পারেন, এবং তিনি নিজেও বিষয়টি খুব ভালো করেই জানেন।
"আমি চাইলে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন করতে পারি," গত মে মাসে কৌতুকের ছলে এ কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, সেখানে তাঁর জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ! যদিও কোনো জনমত জরিপেই এ ধরনের ৯৯ শতাংশ সমর্থনের অঙ্ক মেলেনি। কিন্তু তাঁর এই কৌতুকটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে এক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, কারণ এটি নেহাৎ রসিকতা ছিল না—এর পেছনে লুকিয়ে ছিল গভীর এক রাজনৈতিক বাস্তবতা।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন। তবে নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে এসে দেখা যাচ্ছে, এই পুরো নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হলেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প—যদিও ব্যালট পেপারে তাঁর কোনো নাম নেই! থাকার কথাও নয়, যেহেতু তিনিই বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু, যে ব্যক্তি বিগত এক দশক ধরে ট্রাম্পের সাথে গভীর সখ্য তৈরি করে নিজের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছেন—বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—তিনি আজ তিক্তভাবে আবিষ্কার করছেন যে, ট্রাম্পের সেই উষ্ণ আলিঙ্গন এখন অনেকটাই আলগা হয়ে এসেছে।
এক বছরের 'বীর বন্দনা' ও সখ্যতা
ট্রাম্প ও ইসরায়েলি রাজনীতির মধ্যকার এই মধুচন্দ্রিমার সম্পর্ক গত বছরের এই সময়ে এক চরম শিখরে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ট্রাম্পের টিমের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত এক গাজা চুক্তির আওতায়, হামাসের কাছে বন্দি জীবিত থাকা শেষ ২০ জন ইসরায়েলি স্বদেশে ফিরে আসেন এবং একই দিনে ট্রাম্প ইসরায়েলি সংসদ 'নেসেট'-এ ভাষণ দেন। ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ট্রাম্পের সেই ভাষণ এবং জিম্মিদের পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের দৃশ্য একইসঙ্গে সম্প্রচার করেছিল। ফলে সাধারণ ইসরায়েলিদের কাছে এই দুটি দৃশ্য যেন এক ও অভিন্ন হয়ে ফুটে উঠেছিল।
এর পরপরই শুরু হয় ট্রাম্পকে সম্মান জানানোর পালা। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের "ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু" হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে কেবল নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা 'ইসরায়েল পুরস্কার' একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান—ট্রাম্পকে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর আসে ২০২৬ সাল: ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি এবং জুলাই মাসে ট্রাম্প কর্তৃক ঘোষিত হামাসের অস্ত্রসংবরণ চুক্তি।
অর্থাৎ, ইসরায়েলের চাহিদামাফিক তেল আবিবের চিহ্নিত শত্রুদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছেন। আবার হামাসের হাত থেকে ইসরায়েলি বন্দি মুক্তিতেও ভূমিকা রেখেছেন। ইসরায়েল যেখানে সামরিক অভিযান চালিয়েও সফল হয়নি, হামাসের থেকে সেই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে ট্রাম্পের কূটনীতিক চাপ। তাই তাঁর প্রতি ইসরায়েলিদের সমর্থন কম তো হওয়ার নয়।
আর সেটা ৯৯ শতাংশ না হলেও, মোটেও কম নয়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৯ শতাংশ ইসরায়েলি ট্রাম্পের ওপর গভীর আস্থা রাখেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'জ্যুইশ পিপল পলিসি ইনস্টিটিউট'-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, ৭৩ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সাধারণ প্রেসিডেন্টের চেয়ে বহুগুণ ভালো বলে মনে করেন। তেল আবিব ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একে বর্ণনা করেছেন "ট্রাম্প ইফেক্ট" হিসেবে: ইসরায়েলের সাধারণ ইহুদিরা—বিশেষ করে কট্টর ডানপন্থীরা—ফিলিস্তিনিদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে অনেকটাই নমনীয় হয়ে ওঠেন, যখন তাদের বলা হয় যে এই শান্তি প্রস্তাবের নেপথ্যে ট্রাম্প রয়েছেন। এভাবে কোনো ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতা যা করতে পারেননি, ট্রাম্প তা অনায়াসেই করে দেখিয়েছেন।
যে সমর্থন আর কখনোই মিলছে না
২০১৯ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল 'লিকুদ পার্টি' আয়ালোন মহাসড়কে বিশাল আকারের বিলবোর্ড ঝুলিয়েছিল: সেখানে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হাত মেলাচ্ছেন এবং নিচে লেখা ছিল "অন্য উচ্চতার নেতৃত্ব" (ইন অ্যানাদার লিগ)। ট্রাম্প নিজেও সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিলেন। সমীকরণটা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: বিবি (নেতানিয়াহু) ট্রাম্পের জৌলুস ধার করে নিজের রাজনীতি চালাতেন, আর ট্রাম্প সেই প্রশংসা ও শ্রদ্ধা উপভোগ করতেন।
কিন্তু এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন তাঁর হাত দুটি নিজের পকেটেই গুটিয়ে রেখেছেন! গত জুনে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে প্রতিপক্ষের ওপর ভিত্তি করে তিনি "সম্ভবত" নেতানিয়াহুকেই সমর্থন করবেন। কিন্তু যখন গাদি আইজেনকোট নির্বাচনী ময়দানে নামলেন, ট্রাম্প মন্তব্য করে বসলেন যে আইজেনকোটের বিরুদ্ধে তিনি খারাপ কিছু শোনেননি। এমনকি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুকে সমর্থনের প্রশ্নটি তিনি অন্তত তিনবার কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। গত মঙ্গলবার 'মেরিন ওয়ান' হেলিকপ্টারে ওঠার আগে ট্রাম্প কেবল রহস্যময়ভাবে এটুকুই বলেন: "আমরা হয়তো কাউকে সমর্থন দিতে পারি।" কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম তিনি মুখে আনেননি।
সবচেয়ে কাছাকাছি তিনি যেটি করেছিলেন তা হলো—গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ নিউজম্যাক্স-এর একটি খবরের লিঙ্ক শেয়ার করা, যেখানে এক জরিপে নেতানিয়াহুর জোটকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে ট্রাম্প নিজে সেটি পোস্ট করেছিলেন কিনা তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। এর মধ্যেই ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিপক্ষ গাদি আইজেনকোট এবং নাফতালি বেনেটের শিবিরগুলো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের সাথে গোপনে কথা বলে তাঁকে এই নির্বাচনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। আর এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের সেই অনুরোধ পূরণ হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
ইসরায়েলের এই জাতীয় নির্বাচন এতটাই হাড্ডাহাড্ডি হতে যাচ্ছে যে, ট্রাম্পের এই নীরবতা একটি বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে। গত মাসের পাঁচটি পৃথক জরিপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইজেনকোটের দল ইয়াশার গড়ে ২২.২টি আসন পেতে যাচ্ছে, যেখানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পাচ্ছে ২১.২টি আসন। আর জোটের হিসাবে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পাচ্ছে গড়ে ৫৪.৪টি আসন এবং বিরোধী জায়নবাদী জোট পাচ্ছে ৫১টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কিন্তু কোনো পক্ষই এককভাবে ছুঁতে পারছে না।
বেদিতে দেখা দেওয়া ফাটল
এই দূরত্ব কিন্তু কেবল একতরফা নয়, দুই তরফ থেকেই তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যখন তেহরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি ও দরকষাকষি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন তিনি লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করতে এবং সিরিয়ার কিছু অঞ্চল থেকে সরে আসতে ইসরায়েলের ওপর মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। এক উত্তপ্ত ফোনালাপের সময় নেতানিয়াহুকে "পাগল" বলেও ডাকার কথা ট্রাম্প স্বীকার করেছেন। ইসরায়েলঘনিষ্ঠ মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে নাকি প্রায়ই বলেন— "বিবি (নেতানিয়াহু) নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু।"
ইসরায়েলি জনগণও বিষয়টি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট-এর গ্রীষ্মকালীন এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেন বলে বিশ্বাস করা মানুষের সংখ্যা মে মাসের ৪৪ শতাংশ থেকে কমে জুনে মাত্র ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কেবল ইহুদি উত্তরদাতাদের মধ্যে, ট্রাম্পের ওপর ইসরায়েল সম্পূর্ণ নির্ভর করতে পারে—এই বিশ্বাসের হার মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ৩৮ পয়েন্টের বিশাল পতন ঘটেছে। মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলি মনে করেন, ইরান যুদ্ধের আগের তুলনায় বর্তমানে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান ভালো রয়েছে।
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, নীতিগত বিষয়ে অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কিন্তু ইসরায়েলে এক চুলও কমেনি! ইসরায়েলিরা তাঁর নীতিকে সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি ট্রাম্পকে তারা ঠিকই ভালোবাসে। নেতানিয়াহুর নিজের প্রচারণাতেই এর প্রমাণ মেলে: সম্প্রতি লিকুদ পার্টির প্রার্থী তালিকায় নেতানিয়াহু এক ব্যবসায়ীকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যিনি অতীতে ট্রাম্পকে "নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত" বলে সমালোচনা করেছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হতেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান এবং ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু বলে আখ্যা দেন। এভাবে ইসরায়েলে বসে ট্রাম্পের সামান্য সমালোচনা করাও এখন নির্বাচনী প্রচারণার জন্য এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
তাহলে এই দেশ আসলে কার?
ইসরায়েলের ওপর একচ্ছত্র ট্রাম্পের মালিকানা, "ট্রাম্পের দেশ" উক্তি আসলে সেটা বোঝায় না। এর অর্থ হলো—ট্রাম্প এখন এমন এক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন, যাকে ঘিরে সব ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের ঘুরতে হয়। নেতানিয়াহু নির্বাচন করছেন ট্রাম্পের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিচয়ে। আবার আইজেনকোট নির্বাচন করছেন ট্রাম্পের শত্রু না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পুরো রাজনীতির ময়দান এখন কেবল একটি বিতর্ক নিয়েই ব্যস্ত—কে ট্রাম্পকে সবচেয়ে ভালোভাবে সামলাতে পারবেন?
আন্তর্জাতিক স্তরে ও জাতীয়ভাবে দম্ভ ও অহমিকার এক দেশ ইসরায়েল; যার রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক মতভেদে বিভক্ত, কিন্তু গণতান্ত্রিক একটি ইহুদিবাদী সমাজব্যবস্থা। তাদের জন্য এই ধরনের অন্ধ পরনির্ভরতা সত্যিই এক নজিরবিহীন ঘটনা। এবং এটি অদ্ভুত কিছু বার্তাও দিচ্ছে। ট্রাম্প একসময় নেতানিয়াহুকে এমন এক ২০ দফার গাজা পরিকল্পনা মানতে বাধ্য করেছিলেন, যা কোনো ইসরায়েলি শাসক জোট কখনোই মেনে নিত না। আবার তিনিই প্রেসিডেন্ট হারজগকে চিঠি লিখে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি মামলায় তাঁর খাস ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলেছিলেন—যে ধরনের হস্তক্ষেপ অন্য কোনো বিদেশি নেতার কাছ থেকে এলে তেল আবিবে চরম হট্টগোল পড়ে যেত।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলিরা তাদের নিজেদের প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার জন্য ভোট দেবেন। তবে ভোট দিতে যাওয়ার সময় অনেক ইসরায়েলির মনেই নীরবে একটি অভিন্ন প্রশ্ন ঘুরপাক খাবে: বিজয়ের শুভেচ্ছা জানিয়ে ওয়াশিংটন থেকে কার কাছে আগে ফোন আসবে?
অতএব, স্বাগতম ইসরায়েলে—যেখানে নির্বাচনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও দিকনির্ণায়ক মানুষটি (ট্রাম্প) নিজে কোনো ভোট দিতে পারবেন না, এবং আপাতত তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করছেন না!
লেখক: লিওন হাদার একজন আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, ব্লগার, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গ্রন্থকার এবং পরামর্শক।
