১২৫ বছর আগে ঢাকায় শুরু হয়েছিল ‘শক্তি ঔষধালয়’; শাখা ছিল মাদ্রাজ, রেঙ্গুন, লক্ষ্ণৌ
খবরের কাগজে বেরিয়েছে একখানা বিজ্ঞাপন। হেডলাইন—'অধ্যক্ষ মথুর বাবুর ঢাকা শক্তি ঔষধালয়'। তাতে ওষুধের নামধাম, শাখার ঠিকানা, আর কোন ওষুধ 'ব্যবহার করিলে' কোন রোগ 'প্রশমিত হয়', তার বর্ণনা আছে। বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন—'ভারতবর্ষ মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ অকৃত্রিম সুলভ আয়ুর্ব্বেদীয় ঔষধালয়ের'।
প্রচারপত্রটি আরও জানায়, 'আয়ুর্ব্বেদ চিকিৎসা সম্বলিত ক্যাটালগ, বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার গভর্নর বাহাদুরের অভিমত এবং দেশবন্ধু দাশ প্রভৃতি বহু গণ্যমান্য মহোদয়গণের বিশেষ অভিমত ও প্রশংসাপত্রাদি এবং অনেক জ্ঞাতব্য বিষয়াদি সন্নিবিষ্ট পুস্তিকা পত্র লিখিলে বিনামূল্যে পাঠানো হয়!'
বিজ্ঞাপনটি যিনি দিয়েছেন, তিনি নারিন্দার বাসিন্দা। মথুরা মোহন চক্রবর্তী (বি.এ) তার নাম। 'হিন্দু কেমিস্ট ও জুবিলী হাইস্কুলের ভূতপূর্ব্ব হেডমাস্টার'—এই তার পরিচয়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞাপনটি পড়লে বেশ অবাকই হতে হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকায় জন্ম নেওয়া 'শক্তি ঔষধালয়ের'-এর সুনাম এত দূর ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মাদ্রাজ (চেন্নাই), এলাহাবাদ কিংবা রেঙ্গুন (মিয়ানমার) সহ তৎকালীন ভারতবর্ষের দূরবর্তী শহরগুলোতে ছিল এর শাখা! শুধু তা-ই নয়, স্বয়ং বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার গভর্নর 'শক্তি'র জন্য লিখেছিলেন প্রশংসাপত্র।
শক্তির শুরু, শিক্ষক থেকে কেমিস্ট
মথুরা মোহন চক্রবর্তী ওরফে মথুর বাবু ছিলেন জুবিলী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। উনিশ শতকের শেষের দিকের কথা। হঠাৎ নিদারুণ এক অসুখে পড়লেন তিনি। বহু জায়গায় ঘুরলেন, নানান চিকিৎসা নিলেন। কিছুতেই কিছু হলো না। শেষে তিনি শরণাপন্ন হলেন বারদীর লোকনাথ ব্রহ্মচারীর। বাবা লোকনাথের খাঁটি ভারতীয় চিকিৎসাতেই রোগ নিরাময় হলো। সুস্থ হয়ে উঠলেন মথুর বাবু।
ভারতীয় প্রাচীন এই চিকিৎসাশাস্ত্রের নামই আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, সুস্থ হয়ে ওঠার পর লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আদেশেই মথুরামোহন আয়ুর্বেদ চর্চায় মন দেন। সেই চর্চা একসময় তাকে নিয়ে যায় আরও বড় এক উদ্যোগের দিকে। ১৯০১ সাল (বাংলা ১৩০৮), অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১২৫ বছর আগে স্থাপিত হয় 'শক্তি ঔষধালয়ের'।
মথুরামোহন চক্রবর্তীর বাড়ি ছিল দয়াগঞ্জ শরৎগুপ্ত রোডে। বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটা পথ স্বামীবাগ রোড। সেখানেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন ওষুধের কারখানা। এখনও অক্ষত আছে সেই আলিশান বাড়িটি। নানা হাতবদলের পরও ওষুধ কোম্পানিটি এখনও সচল।
ঢাকা ও কলকাতায় দুটি আলাদা হেড অফিস ছিল শক্তি ঔষধালয়ের। ঢাকার অফিসটি ছিল পাটুয়াটুলিতে, আর কলকাতারটি বিডন স্ট্রিটে। কলকাতায় ছিল চারটি বিক্রয়কেন্দ্র। এছাড়া ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, লক্ষ্ণৌ, শ্রীহট্ট (সিলেট), রাজশাহী, জলপাইগুড়ি, চাঁদপুর, কাশী, মেদিনীপুর, গুয়াহাটি, ভাগলপুর, কানপুরসহ ২২টিরও বেশি শাখা গড়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই।
শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত 'ঢাকা কোষ' বই থেকে জানা যায়, ওষুধ বিক্রি করে যে আয় হতো, তার অর্ধেক তিনি মানবকল্যাণে ব্যয় করতেন; বাকি অর্ধেক দিয়ে নিজের জীবনযাপন করতেন। তিনটি মূলমন্ত্র ছিল তার ব্যবসার: বিশুদ্ধ ওষুধ, অল্প লাভ আর অধিক কাটতি।
আয়ুর্বেদ মানেই তখন ঢাকা
শুরুটা খুব বড় পরিসরে ছিল না। শক্তি ঔষধালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল চ্যবনপ্রাশ ও স্বর্ণসিন্দুর, এই দুই ওষুধ দিয়ে। পরে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একসময় শক্তি ও সাধনার জন্মস্থান হিসেবে আয়ুর্বেদীয় ওষুধ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয় ঢাকা।
মথুর বাবুর উদ্ভাবিত প্রথম ওষুধ ছিল আমলকীর ক্বাথ দিয়ে তৈরি 'চ্যবনপ্রাশ'। 'মকর ধ্বজ' ছিল আরেকটি জনপ্রিয় ওষুধ। এগুলো ছাড়াও শক্তির প্রথমদিককার বেশ কয়েকটি ওষুধ দেশজুড়ে নাম কামিয়েছিল। বিজ্ঞাপনে সেগুলোর গুণাবলি ও দাম লেখা থাকত। এই যেমন 'দশন সংস্কার চূর্ণ'। এর বিশেষত্ব হিসেবে লেখা থাকত, 'এই চূর্ণ ব্যবহার করিলে দন্তরোগ ও নানাবিধ মুখ-রোগ প্রশমিত হয়।' 'বৃহৎ খদির বাটিকা'র বেলায় লেখা থাকত, 'পানের সহিত ২/৩ বার করিয়া সেবন করিলে দন্ত সুদৃঢ় হইবে, দন্তের সকল প্রকার রোগ নষ্ট করিবে। মুখে সুগন্ধ বাহির হইবে।'
পুরোনো বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে বোঝা যায়, ওষুধের নামের সঙ্গে তার গুণাগুণও বেশ জোর দিয়ে প্রচার করা হতো। 'ছাগলাদ্য ঘৃত'কে বলা হতো 'মেধা-স্মৃতিবর্ধক ও ছাত্রগণের সহায়ক'; আর 'মরিচাদি মলম'কে বলা হতো 'খুজলি ও পাঁচড়ার মহৌষধ'। আবার 'একদিনে দদ্রু নিশ্চয় আরোগ্য' গুণের 'দাদমার', 'ম্যালেরিয়া, সর্ববিধ জ্বরের মহৌষধ' হলো 'অমৃতারিষ্ট'।
সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় আরও বিভিন্ন ধরনের আয়ুর্বেদীয় ওষুধ তৈরি হতে থাকে। তরল টনিক, বড়ি, অর্ধতরল হালুয়া, বিভিন্ন চূর্ণ ও তেল তৈরির কথা জানা যায়। একসময় 'শক্তি'র ওষুধের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৫টি।
১৯৪২ সালে মৃত্যুর আগে নিজের প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন মথুর বাবু। জুবিলী হাইস্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র যোগেশচন্দ্র ঘোষের 'সাধনা ওষুধালয়'-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে থাকে 'শক্তি'। তবে দেশভাগ কেড়ে নিয়েছিল দুটিরই সেরা সময়।
শত্রু সম্পত্তি থেকে রাষ্ট্রীয় নিলাম
মথুরামোহন ছিলেন নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর 'শক্তি'র মালিকানা পান তার ভাই লালমোহন চক্রবর্তী। পরে ব্যবসার হাল ধরেন মথুর বাবুর পালকপুত্র ননিগোপাল চক্রবর্তী। তবে কর্মচারীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে দেশভাগের পর তাকে ব্যবসা ছেড়ে ভারতে চলে যেতে হয়।
'শক্তি' ঔষধালয়ের বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় গত ৪০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত। কাছ থেকে দেখেছেন 'শক্তি'র পথচলা। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসও তার নখদর্পণে। সেই সময়ের নানা ঘটনা ও হারিয়ে যাওয়া কাহিনি তিনি শোনালেন।
'দেশভাগের পর একাই ঢাকায় থেকে ব্যবসা দেখতেন ননিগোপাল। তার পরিবার থাকত কলকাতার বিডন স্ট্রিটে। সেসময় তাকে ভয়ভীতি দেখাইয়া বাইর কইরা দেয়। বহিরাগত ৪ জন আইসা মালিকানা দাবি করে। তিনি সেইদিনই নারায়ণগঞ্জ হয়ে ভারত চলে যান,' বলেন অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়।
দয়াগঞ্জের শরৎদত্ত রোডে চক্রবর্তীদের বাড়িটি এখনও জৌলুশ ছড়ায়। তবে সেখানে এখন আর তাদের বংশধর কেউ থাকেন না। বিশাল বাড়িটি বর্তমানে অন্যদের বসতি। বাড়ির সামনেই রয়েছে শক্তি ঔষধালয়ের একটি দোকান। দোকানটি একসময় চক্রবর্তীদের মালিকানাধীন ছিল, পরে সেটি চলে আসে বর্তমান মালিকদের হাতে। তবে নানা হাত ঘুরে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে বর্তমান মালিকদের কাছে এল, সেটিও আরেক ইতিহাস।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার 'শক্তি'কে শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে নিজেদের দখলে নেয়। পরে সরকারি নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্ব পায় ইউনাইটেড ট্রেডার্স কোম্পানি। ১৯৬৯ সালে চার ব্যক্তি 'শক্তি'র মালিকানা দাবি করে আদালতে রিট করেন। তবে ১৯৭৭ সালে তাদের দাবি নাকচ করে দিয়ে সরকার আবারও প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেয়।
কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ১৯৭৯ সালে প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকায় নিলামে 'শক্তি' কিনে নেয় মাসন্স এন্টারপ্রাইজ। কিস্তিতে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করে সম্পূর্ণ মালিকানা বুঝে পায় তারা। সেই থেকে 'শক্তি' পরিচালনার দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের হাতে।
কেমন চলছে এখন
গুগল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে স্বামীবাগ রোডে পৌঁছাতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। রাস্তার পাশেই চোখে পড়ল শক্তির পুরনো আমলের গেট। ফটকের গায়ে অধ্যক্ষ মথুর বাবুর নামটি আজও জ্বলজ্বল করছে। ফটক পেরিয়ে সামনে এগোলেই লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির। এটিও মথুর বাবুর প্রতিষ্ঠা করা।
হাতের ডানের একটি সরু গলি দিয়ে হাঁটতেই এসে পড়লাম ঐতিহ্যবাহী এই কারখানায়। ভেতরে ঢুকেই মনে হলো, যেন কয়েক দশক পেছনে ফিরে গেছি।
পুরনো ধাঁচের ভবনটিতে বেশ গুছিয়েই চলছে কাজ। প্রতিটি বিভাগের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ। কোথাও গাছগাছড়ার নমুনা সাজানো, কোথাও চলছে ওষুধ তৈরির প্রস্তুতি। ভেষজ উপাদান সংরক্ষণের জন্যও রয়েছে আলাদা ঘর। আরেক কক্ষে কর্মীদের ব্যস্ততা ওষুধের প্যাকেজিং নিয়ে। নিচতলায় চলছে ওষুধ প্রস্তুত ও বোতলজাত করার কাজ। সব মিলিয়ে পুরনো দেয়াল, কাঠের দরজা, কক্ষের বিন্যাস আর ভেতরের কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুই আলাদা সময়।
মথুর বাবুর আমলের পিতলের ডেগে এখনও ওষুধ জ্বাল দেওয়া হয়। একই ফর্মুলা মানা হয়। ওষুধের নামেও হয়নি কোনো পরিবর্তন। তবে সময়ের সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একসময় সমস্ত কাজ করা হতো হাতে, এখন কিছু কিছু কাজ যন্ত্রে হয়। রোদে শুকানোর জায়গায় এসেছে আধুনিক ড্রায়ার। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাপনাতেও এসেছে আধুনিক প্রযুক্তি। তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কর্তৃপক্ষের দাবি, উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিক করা হলেও ওষুধের গুণগত মান খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।
মাসন্স এন্টারপ্রাইজ নতুন করে কাজ শুরু করার সময় আগের সব কর্মচারী ও কারিগরদের বহাল রাখে, জানালেন অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে মালিকানা বদল হলেও থেকে গেছে শক্তির আদি ঐতিহ্য। 'এখনও পুরনো ফর্মুলা মেনেই ওষুধ তৈরি হয়। কারিগর-কবিরাজ পরম্পরার মাধ্যমে কাজ শেখে,' বলেন তিনি।
ওপরের একটি ঘরে তখন 'হজম সহায়ক' ওষুধ 'ভাস্কর লবণ' প্যাকেজিংয়ের কাজ চলছিল। কর্মীরা ব্যস্ত হাতে ওষুধগুলো প্যাকেটজাত করছিলেন। তৈরি ওষুধ একদিকে রাখা, সেখান থেকে প্যাকেটে ভরা, এরপর সেগুলো গুছিয়ে রাখার কাজ চলছিল পরপর। নিচে আরেকটি ঘরে বস্তাবন্দি করা হচ্ছিল দাঁতের মাজন 'দন্ত রোগারি'। এই মাজনগুলো এবার পাঠানো হবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
কর্মীদের ব্যস্ততার মধ্যেই বোঝা গেল, পুরনো এই ওষুধগুলোর চাহিদা এখনও কমেনি। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, 'ভাস্কর লবণ' ও 'দন্ত রোগারি'র চাহিদা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার হয়ে আসা এসব পণ্যের ওপর এখনও আস্থা রাখেন অনেক মানুষ।
কারখানার বিভিন্ন কক্ষে শেষ বিকেলেও চলছিল নানা ধরনের কাজ। কেউ ওষুধ তৈরিতে ব্যস্ত, কেউ প্যাকেটজাত করছেন, আবার কেউ প্রস্তুত ওষুধ গুছিয়ে রাখছেন সরবরাহের জন্য। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, এখনও প্রায় এক শ শ্রমিক-কর্মচারী এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঢাকার পুরনো এই কারখানা থেকেই তৈরি ওষুধ যায় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। বিদেশ থেকে লোক আসে শুধু এই ওষুধের আশায়। সারাদেশে 'শক্তি'র শাখা এখন ৩৪টি।
আয়ুর্বেদে এখনও আস্থা অনেকের
স্বামীবাগ কারখানার সঙ্গেই রয়েছে 'শক্তি'র একটি বিক্রয়কেন্দ্র, আর কিছুটা দূরে দয়াগঞ্জে রয়েছে আরেকটি। কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও দুটি বিক্রয়কেন্দ্রই বেশ জনপ্রিয়।
স্বামীবাগ শাখা পরিচালক কবিরাজ সুকান্ত ভট্টাচার্য। প্রায় ২২ বছর ধরে তিনি 'শক্তি'র সঙ্গে আছেন। এর মধ্যে ২০ বছর ধরেই কাজ করছেন এই শাখায়। তার মতে, প্রথম এখানে আসার সময় যেমন চাহিদা ছিল, এখনও তেমনই আছে। খুব বেশি কমেছে বা বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন না। 'যারা সচেতন, যারা চান না যে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের শরীরে পড়ুক, তারা কিন্তু ঠিকই আয়ুর্বেদিক ওষুধ গ্রহণ করেন,' বলেন তিনি।
কথা বলতে বলতেই দোকানে এলেন এক ক্রেতা। কিনবেন দাঁতের মাজন আর বলবর্ধক ওষুধ। নিজের অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে তিনি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধেই ভরসা রাখেন। তবে সন্তানদের বেলায় তার পছন্দ আয়ুর্বেদিক ওষুধ। এর পেছনে রয়েছে পারিবারিক অভ্যাস। ছোটবেলায় বাবাকে আয়ুর্বেদিক ওষুধ খেতে দেখেছেন তিনি। কুমিল্লায় তাদের এলাকায় ছিল সাধনা ঔষধালয়ের একটি শাখা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজের সন্তানদের জন্যও আয়ুর্বেদিক ওষুধ নেন তিনি।
'সন্তানদের অ্যালোপ্যাথি ওষুধ খাওয়াতে চাই না। আমার বাবাকে দেখতাম আয়ুর্বেদিক ওষুধ খাইতেন। আমিও বাচ্চাদের জন্য আয়ুর্বেদিক ওষুধই নিই। আমি নিজে এই দাঁতের মাজন ব্যবহার করি,' বলেন আবুল হাসনাত নামের ঐ ক্রেতা।
অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, দেশে আয়ুর্বেদিক ওষুধের চাহিদা এখনও অনেক। তা না হলে একাধিক প্রতিষ্ঠান এত বছর ধরে টিকে থাকতে পারত না। 'যদি এসব ওষুধ কাজ না করত, তাহলে কি কেউ দ্বিতীয়বার কিনতে আসত? মানুষ উপকার পায় বলেই শতাব্দীকাল ধরে এসব ওষুধ গ্রহণ করছে, সামনেও করবে,' বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে 'শক্তি'র এজেন্টের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় সব জায়গাতেই ওষুধ পাঠানো সম্ভব হয়। তবে তরল ওষুধ হওয়ায় আপাতত বিদেশে নিয়মিতভাবে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের বাইরে 'শক্তি'র ওষুধ নিয়ে যান।
যেসব ওষুধ জনপ্রিয়
'শক্তি' ওষুধালয়ে তৈরি হয় ৫০টিরও বেশি ধরনের ওষুধ। কবিরাজ সুকান্ত ভট্টাচার্য জানালেন, এগুলোর সবকটিরই কমবেশি চাহিদা রয়েছে। তবে কিছু ওষুধের চাহিদা অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এসব ওষুধের নামও অনেকের কাছে পরিচিত।
সর্বাধিক বিক্রীত ওষুধের তালিকায় রয়েছে দাঁতের মাজন 'দন্তরোগারি', হজম সহায়ক 'আমলকী রসায়ন' এবং বলবর্ধক হিসেবে পরিচিত 'দশমূলারিষ্ট'। এর বাইরে 'বলারিষ্ট', 'কেশরাজ', 'অশ্বগন্ধারিষ্ট', 'ব্রাহ্মী রসায়ন' ও 'অশোকারিষ্ট'-এরও চাহিদা রয়েছে।
দাঁতের মাজন 'দন্তরোগারি' মূলত দাঁত ও মুখের পরিচর্যার জন্য ব্যবহার করেন ক্রেতারা। 'শক্তি'র পুরনো পণ্যগুলোর একটি হওয়ায় এর সঙ্গে অনেকের দীর্ঘদিনের পরিচয়। স্বামীবাগের বিক্রয়কেন্দ্রে কথা বলে জানা গেল, ক্রেতাদের একটি অংশ এখনও হজমের সমস্যার জন্য 'আমলকী রসায়ন' ব্যবহার করেন। আয়ুর্বেদিক ফর্মুলার বিভিন্ন সংস্করণে এটি অরুচি, বদহজম ও ক্ষুধামন্দার মতো হজমসংক্রান্ত সমস্যায় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বলবর্ধক হিসেবে পরিচিত 'দশমূলারিষ্ট' দুর্বলতা, হজমের সমস্যা এবং প্রসব-পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতার মতো অবস্থায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
নারীদের জন্য পরিচিত ওষুধগুলোর একটি 'অশোকারিষ্ট'। এটি মাসিকের অনিয়ম, অতিরিক্ত রক্তপাত ও মাসিকজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া চুলের জন্য রয়েছে 'কেশরাজ'।
আয়ুর্বেদে আরেকটি পরিচিত নাম 'বলারিষ্ট'। সাধারণত বলবর্ধক ও বাতের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। 'অশ্বগন্ধারিষ্ট' স্নায়বিক দুর্বলতা কাটানোর ওষুধ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া 'ব্রাহ্মী রসায়ন' মূলত স্মৃতি ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আয়ুর্বেদ ব্যবহারে পরিচিত।
এই ওষুধগুলোর দামও তুলনামূলকভাবে সাধারণ ক্রেতাহাতের নাগালের মধ্যে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে পণ্যের ধরন ও পরিমাণভেদে দাম আলাদা। 'শক্তি'র স্বামীবাগ বিক্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৬০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে 'দন্তরোগারি'; আর ১৯০ টাকা করে বিক্রি হয় 'আমলকী রসায়ন' ও 'দশমূলারিষ্ট'। বোতলের আকার ও পরিমাণ ভেদে অন্যান্য ওষুধের দাম ১৬০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টিকে থাকা 'শক্তি'র জনপ্রিয়তার পেছনে এই পুরনো ওষুধগুলোর ভূমিকা কম নয়। নতুন নতুন ওষুধের ভিড়েও পুরনো নামগুলো ধরে রেখেছে নিজেদের জায়গা। দোকানে আসা ক্রেতাদের অনেকেই নির্দিষ্ট কোনো অসুখের জন্য নয়, বরং বছরের পর বছর ব্যবহার করে আসা পরিচিত সেই ওষুধগুলোর খোঁজেই আসেন।
নানান সমস্যা, তবুও আশা দেখছেন
আয়ুর্বেদিক ওষুধের মূল উপাদানই গাছ-গাছড়া। তাই গাছই যদি না থাকে, ওষুধ হবে কী করে? কাঁচামালের সংকট এখন আয়ুর্বেদ ওষুধ তৈরির অন্যতম বড় সমস্যা বলে জানালেন অসীম বন্দ্যোপাধ্যায়। তার মতে, অনেক ভেষজ উপাদান আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। কিছু উপাদান সংগ্রহ করতে হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, আবার কিছু উপাদানের জন্য নির্ভর করতে হয় আমদানির ওপর।
তবে এত সমস্যার মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী 'শক্তি' ঔষধালয়ের সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মানুষের মধ্যে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ এখনও রয়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও প্রাকৃতিক উপাদানভিত্তিক চিকিৎসা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। সেই চাহিদাকে কাজে লাগাতে পারলে পুরনো এই চিকিৎসাপদ্ধতির সামনে এখনও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে চিকিৎসাব্যবস্থা, বদলেছে মানুষের চাহিদাও। ১২৫ বছর পার করা 'শক্তি' ঔষধালয়ের সামনে এখন শুধু টিকে থাকার নয়, বরং আরও কত দূর যাওয়া সম্ভব, সেই ভাবনা। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে। নানান সমস্যা মোকাবিলা করে 'শক্তি' কি আরও এক শতাব্দী ধরে তার পুরনো নাম ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে? উত্তরটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।
ছবি: টিবিএস