যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে 'ঘৃণাসূচক বক্তব্য' বেড়েছে ২৪০ শতাংশ, টার্গেট বাংলাদেশিরাও: মার্কিন প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি ও বক্তব্য, অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং মার্কিন সমাজে দক্ষিণ এশীয়দের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও ভূমিকার কারণে অনলাইনে ভারতীয়, বাংলাদেশী ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক বক্তব্য বা বিদ্বেষমূলক আচরণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—একটি নতুন প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
'সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট' (সিএসওএইচ) কর্তৃক রোববার প্রকাশিত "দ্য রাইজিং টাইড অফ অ্যান্টি-সাউথ এশিয়ান হেট ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস" শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে করা বিদ্বেষমূলক পোস্টের মাসিক পরিমাণ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ২৪০ শতাংশ বেড়েছে। যেখানে মানভেদে পোস্টের সংখ্যা ১২ হাজার ৯০৪টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৮৪৩টিতে।
গবেষকরা দেখেছেন, শুধুমাত্র ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে ওই প্ল্যাটফর্মে ৫ লাক ৪২ হাজারেরও বেশি বিদ্বেষমূলক পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোস্ট হওয়া ছয় মাসের মধ্যে পাঁচটি মাসই ছিল এই সময়কালের শেষের দিকে।
জাতিসংঘের দেওয়া 'ঘৃণাসূচক বক্তব্যের' (হেট স্পিচ) সংজ্ঞাকে ভিত্তি ধরে গবেষকরা এ কাজটি পরিচালনা করেন। তারা অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়দের উদ্দেশ্যে বারবার ব্যবহৃত আপত্তিকর শব্দ ও বক্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেন এবং জাতিসংঘের সংজ্ঞার সাথে মেলে না এমন সাধারণ সমালোচনাগুলোকে বাদ দিয়ে পোস্টগুলো পর্যালোচনা করেন।
তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, 'এক্স'-এ করা ঘৃণাত্মক পোস্টগুলোর প্রায় অর্ধেক জুড়েই দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র 'দখল করা', 'চাকরি চুরি করা' কিংবা 'জনমিতির জন্য হুমকি তৈরি করার' অভিযোগ আনা হয়েছে।
অপরদিকে, মানহানিকর গালি "পাজিত" এবং এর বিভিন্ন রূপভেদ 'এক্স'-এর ৩০ শতাংশ ঘৃণাত্মক পোস্টে এবং অন্যান্য উগ্র বা বিকল্প প্ল্যাটফর্মগুলোর ৪৫ শতাংশ পোস্টে লক্ষ্য করা গেছে।
দক্ষিণ এশীয়দের নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন হিসেবে চিত্রায়িত করা পোস্টের সংখ্যা 'এক্স'-এ ১৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে—যা অন্যান্য সকল অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের তুলনায় "সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বেড়েছে"।
এই বিদ্বেষপ্রসূত পোস্টগুলোতে প্রায়শই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে একসাথে মিলিয়ে একটি একক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশীদের যেমন একে অপরের সাথে মিলিয়ে ফেলা হয়েছে, তেমনি হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদেরও এক করে দেখা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠে—এখনই কেন এমনটা ঘটছে?
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়, বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের ইতিহাস বেশ পুরনো। তবে গবেষকদের মতে, বিদ্বেষের সাম্প্রতিক এই উত্থান মূলত দীর্ঘদিনের পুরনো বিদ্বেষের সাথে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের এক সমন্বিত প্রতিফলন।
প্রতিবেদনে 'এইচ-১বি' ভিসা কর্মসূচিকে সংঘাতের এক প্রধান উৎস বা কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মার্কিন নিয়োগকর্তারা দক্ষ বিদেশী কর্মীদের চাকরি দেওয়ার সুযোগ পান। এইচ-১বি ভিসা ধারীদের ৭০ শতাংশেরও বেশি ভারতীয়।
গবেষকরা এই কর্মসূচির ওপর চলা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সাথে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণা বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন—যেমন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ট্রাম্প কিছু নতুন এইচ-১বি আবেদনের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের ফি আরোপ করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, 'এ ধরনের পদক্ষেপগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে বড় ধরনের বার্তা দেয়, যার ফলে ট্রাম্পের সমর্থকদের মাঝে দক্ষিণ এশীয়দের প্রতি বিদ্বেষ আরও বেশি জোরালো ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।'
প্রতিবেদনে প্রশাসনের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়েও একই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একটি এআই শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি ভারতীয়দের কাজ দেওয়ার মাধ্যমে চাকরি 'আউটসোর্সিং' করার জন্য মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেছিলেন।
এই ভাষণের পর গবেষকরা অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের বৃদ্ধি দেখতে পান। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে 'ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি'র ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি মুছে ফেলা পোস্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। "ট্রান্সফর্মারস: এজ অব ডিপোর্টেশনস" শিরোনামের ওই পোস্টে "মি. সিং" নামে এক শিখ ব্যক্তিকে দেখানো হয় এবং তাকে বলা হয় "আমাদের রাস্তা থেকে দূর হও"।
এর কয়েক দিন পরেই, শিক্ষা মন্ত্রণালয় "মেক কলেজ ফুটবল গ্রেট এগেইন" নামে একটি পোস্ট শেয়ার করে যার ঠিক আগেই টেক্সাসের রিপাবলিকান নেতা বো ফ্রেঞ্চ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফুটবল ম্যাচে দক্ষিণ এশীয়দের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের ঘৃণাসূচক বক্তব্য বা পদক্ষেপগুলো মূলত এই ধারণাকেই বেশি উসকে দেয় যে, দক্ষিণ এশীয়রা আদতে 'বহিরাগত'—যারা "কখনোই এই দেশকে নিজের ভাবতে পারে না বা এই দেশের অঙ্গ হতে পারে না।"
'মডেল মাইনোরিটি' থেকে 'চাকরি চোর'
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক ক্ষোভ এই বিদ্বেষের আরেকটি বড় কারণ। কিছু দক্ষিণ এশীয় নাগরিকের সাফল্যকেই এখন তাদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
একসময় 'মডেল মাইনোরিটি' (আদর্শ সংখ্যালঘু) হিসেবে পরিচিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনীরা এখন 'সুযোগ সন্ধানী ও প্রতারক' হিসেবে চিত্রায়িত হচ্ছেন। একই সাথে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি নিয়ে তৈরি হওয়া চরম ক্ষোভের শিকার বানানো হচ্ছে দক্ষিণ এশীয়দের।
সম্প্রতি মার্কিন রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয়দের উপস্থিতি ও প্রভাব আগের চেয়ে বহুগুণ দৃশ্যমান। যার উদাহরণ হিসেবে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি থেকে শুরু করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের স্ত্রী উষা ভ্যান্স কিংবা রাজনীতিবিদ বিবেক রামাস্বামীর নাম উঠে আসে।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ নির্বিশেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ওপর হওয়া একাধিক বর্ণবাদী আক্রমণের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়, কীভাবে মামদানির প্রাথমিক ও মেয়র পদের বিজয় অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়-বিরোধী এবং ইসলামভীতিমূলক বিদ্বেষকে প্রবলভাবে বাড়িয়ে দেয়।
গবেষকরা বলছেন, এই দুটি প্রবণতাই এখন মূলধারার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর "সামাজিক মর্যাদা বা অবস্থান হারানোর মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কার" সাথে জড়িয়ে গেছে। এটি তাদের 'গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি'র মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উসকে দিচ্ছে—যেখানে দাবি করা হয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে একটি পরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে সরিয়ে বহিরাগতদের স্থলাভিষিক্ত করা হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই-এর ভূমিকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলোকে সরাসরি টার্গেটেড হয়রানিতে রূপান্তর করেছে।
গবেষকরা দেখেছেন, 'এক্স'-এর বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে চাকরি কেড়ে নেওয়া বা ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে দক্ষিণ এশীয়দের গোপন ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সরাসরি মানুষের বাড়ি ও কর্মস্থলে গিয়ে তাদের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং সেই হয়রানির ভিডিও অনলাইনে পোস্ট করছেন। 'ডক্সিং' বলতে মূলত কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য—যেমন তার বাড়ির ঠিকানা—অনলাইনে ফাঁস করে দেওয়াকে বোঝায়।
এর একটি উদাহরণ হিসেবে ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার সারা গঞ্জালেজের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তার ৫ লাখেরও বেশি অনুসারীর উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—তিনি এইচ-১বি কর্মসূচির সুযোগ নেওয়ার অভিযোগে এক দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তির সাথে দুর্ব্যবহার ও হয়রানি করেন।
এদিকে গবেষকরা বলছেন, জেনারেটিভ এআই এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট তৈরি করা আরও সহজ করে দিয়েছে। যেখানে দক্ষিণ এশীয়দের "নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন, যৌন নির্যাতনকারী, সামাজিকভাবে অনগ্রসর বা জনমিতিক হুমকি" হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি মূলত অনলাইনে ছড়ানো ঘৃণাত্মক পোস্ট পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও গবেষকরা লিখেছেন, অনলাইনের এই বিদ্বেষ "বাস্তব জীবনের বৈরী আচরণ থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়।"
উদাহরণ হিসেবে এতে ইউটাহ-র গত জুলাইয়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে শপিং মলে কর্মরত এক ভারতীয় মুসলিম কর্মীকে বারবার ছুড়িকাঘাত করা হয়—যে ঘটনাটিকে ফেডারেল প্রসিকিউটররা 'হেট ক্রাইম' (ঘৃণাসূচক অপরাধ) হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে, ওয়োমিং-এর একটি ট্রাক স্টপে এক শিখ ট্রাক চালককে ১৭ বার ছুরিকাঘাত করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে , 'অনলাইন ও অফলাইনের বিদ্বেষ একে অপরকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ এই ধরনের গল্প, বর্ণবাদী ধারণা এবং হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতাগুলো খুব সহজেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, রাজনৈতিক আলোচনা, গণমাধ্যম এবং দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে আদান-প্রদান হতে থাকে।'
