বিতর্কিত চিড়িয়াখানা চালানো আম্বানির ছেলেকে অধ্যাপক বানাল ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়; সমালোচনা
এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির ব্যক্তির ছেলে এবং ভারতে কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানো বিশাল চিড়িয়াখানা চালানো অনন্ত আম্বানিকে সাসটেইনেবিলিটি (টেকসই উন্নয়ন) বিষয়ক অধ্যাপকের পদে নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ব্রিটেনের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি।
বিশ্ববিদ্যালয়টি ঘোষণা দিয়েছে, অনন্ত আম্বানিকে তার 'পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণীকল্যাণ ও পরিবেশগত তদারকিতে কাজ' এবং 'অধিকতর টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানের' স্বীকৃতিস্বরূপ প্রফেসরশিপ অভ প্র্যাকটিস পদবি দেওয়া হয়েছে।
উত্তর ইংল্যান্ডের এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বলেছে, 'বৈশ্বিক সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্যের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বমানের গবেষণার সাথে ভানতারার কাজ নিবিড়ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ'।
অনন্ত আম্বানি ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির ছেলে। মুকেশ আম্বানি মূলত তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারের মালিক। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
আম্বানি প্রায়ই বিজেপির বিভিন্ন নীতির প্রশংসা করে থাকেন। সম্প্রতি তার রিলায়েন্স গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দলটিকে বড় অঙ্কের অনুদানও দিয়েছে। তাছাড়া ২০২৪ সালে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত অনন্ত আম্বানির রাজকীয় বিয়েতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উপস্থিত ছিলেন।
৩১ বছর বয়সি অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯০ বিলিয়ন পাউন্ড।
গুজরাটে পারিবারিক তেল শোধনাগারের কাছে ৩ হাজার ৫০০ একর জায়গাজুড়ে ভানতারা নামক ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন অনন্ত আম্বানি। সেখানে ২০০ সিংহ, ২৫০ চিতাবাঘ ও ৯০০ কুমিরসহ দেড় লাখেরও বেশি প্রাণী রয়েছে। এই চিড়িয়াখানাতেই তিনি তার জমকালো প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।
এখানকার অনেক প্রাণীই বিপন্ন প্রজাতির হওয়ার কারণে এগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আগেই প্রশ্ন তুলেছিল।
অবশ্য ভানতারার দাবি, তারা বিশ্বের বৃহত্তম উদ্ধার কেন্দ্র। সারা বিশ্ব থেকে অত্যন্ত দ্রুত ও বিপুল পরিমাণে বিপন্ন প্রজাতিসহ নানা ধরনের প্রাণী সংগ্রহ করার কারণে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হওয়ায় গত মাসে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যপ্রণালিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে অনন্ত আম্বানির ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তার বাবা ও বিলিয়নিয়ার ধনকুবের মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বাধীন এই প্রতিষ্ঠান মূলত রিটেইল ব্যবসা ও জ্বালানি তেল খাতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী।
অনন্ত আম্বানিকে অধ্যাপক করার ঘোষণায় ঘোষণায় অ্যাকাডেমিক স্টাফ এবং ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী ও সংরক্ষণবাদীরা বিস্ময় প্রকাশ ও কড়া সমালোচনা করেছেন।
ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও 'স্পিকিং উইথ নেচার: দি অরিজিনস অভ ইন্ডিয়ান এনভায়রনমেন্টালিজম' বইয়ের লেখক রামচন্দ্র গুহ বলেন: 'বলতেই হচ্ছে, সিদ্ধান্তটি বেশ বিভ্রান্তিকর। ভারত ও বৈশ্বিক পরিবেশবাদের গবেষক হিসেবে আমি অন্তত ৫০ জন—এমনকি ১০০ জন—ব্যক্তির নাম বলতে পারি, যারা এই সম্মানের জন্য অনেক বেশি যোগ্য। ...তারা ভারত ও ভারতীয়দের টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে বাস্তব ও দৃশ্যমান অবদান রেখেছেন। নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি কার পরামর্শে এমন সিদ্ধান্ত নিল এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে কী করা হয়েছে বা হয়নি, সে বিষয়ে তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই করেছিল কি না—তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি।'
অবৈধ বন্যপ্রাণী পাচার বিষয়ক ভারতীয় তদন্তকারী ভুবন ম্যাঙ্গালোর ভানতারা গবেষণাপত্র প্রস্তুত করছেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন: 'এটা ঠাট্টা-তামাশার বিষয়?'
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি বলেন, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে কর্মীরা এই নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
সাসেক্স ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত ইনস্টিটিউট অভ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষক লায়লা মেহতা বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, 'নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি এ কাজটি করে সত্যিই অনেক নিচে নেমে গেছে। টেকসই উন্নয়ন বিষয়টি নিয়ে তারা রীতিমতো উপহাস করছে।'
মেহতা গার্ডিয়ানকে বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন জায়গা হওয়ার কথা, যেখানে ক্ষমতাধরদের প্রশ্ন করা হবে, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে; তাদেরকে একাডেমিক বৈধতা দেওয়া হবে না।'
গত এপ্রিলে অনন্ত আম্বানি ভানতারা ইউনিভার্সিটি চালু করেন। একে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য বিশেষায়িত বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ভানতারাকে সংরক্ষণের জায়গা হিসেবে আখ্যা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী প্রেরণা সিং বিন্দ্রা। তিনি এএফপিকে বলেন, 'এটি একটি বন্দিশালা। চিড়িয়াখানা। তাহলে এটি কীভাবে সংরক্ষণ হলো? বন্য প্রাণীদের চিড়িয়াখানায় আটকে না রেখে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলেই রক্ষা করা প্রয়োজন।'
বিন্দ্রা আরও বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রজন্মের সংরক্ষণকর্মীদের লালন-পালন করা হয়, তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়, দক্ষ করে তোলা হয়। কিন্তু এখানে সংরক্ষণের পুরো ধারণাই বদলে দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক আবাসস্থলে প্রাণীদের রক্ষা করার বদলে বলা হচ্ছে যে চিড়িয়াখানায় প্রাণী জড়ো করাই হলো সংরক্ষণ।'
তবে ভানতারা ধারাবাহিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের সহ-গবেষণা পরিচালক লর্ন স্টকম্যান বলেন: 'জলবায়ু সংকটের কারণে যখন তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করার দাবি উঠছে, এমন সময়ে জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আমাদের আরও দায়িত্বশীল আচরণ দাবি করা উচিত।'
২০২৫ সালে জার্মান সংবাদপত্র সুডডয়েচে জাইতং-এর এক তদন্তে দেখা যায়, ভানতারায় আনা অনেক প্রাণী কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ হয়ে এসেছে। ওইসব দেশের বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক বেশ অস্বচ্ছ। এতে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের অবৈধভাবে পাচার করা হতে পারে বলে উদ্বেগ দেখা দেয়।
গত বছরের আগস্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের এক তদন্ত শেষে এই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। তবে পরে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘের সংস্থা সাইটস চিড়িয়াখানাটিতে একটি তথ্যানুসন্ধান মিশন পরিচালনা করে। তারা দেখতে পায়, ভানতারায় প্রাণী আনার জন্য ব্যবহৃত কিছু অনুমতিপত্র সম্ভবত জাল ছিল।
এ বিষয়ে ভান্তারা কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে বন্যপ্রাণী পাচারের সব অভিযোগ আম্বানি পরিবার ও ভানতারা এর আগেও অস্বীকার করেছে।
