চার শতাধিক চুল্লির পারমাণবিক ক্লাবে পা রাখল বাংলাদেশ: দেশের জন্য এর গুরুত্ব কতটা?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদকদের অভিজাত তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার নকশায় তৈরি ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ভিভিইআর-১২০০ চুল্লির মাধ্যমে এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। পরবর্তীতে দুটি ইউনিটই পুরোদমে চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২,৪০০ মেগাওয়াটে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক কোথায়—তা নিয়ে এখনই সুনির্দিষ্ট র্যাংকিং নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ রূপপুর কেন্দ্রটি সবেমাত্র কমিশনিংয়ের ধাপে প্রবেশ করেছে এবং এখনও বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেনি। তবে পুরোপুরি উৎপাদনে গেলে বাংলাদেশ বিশ্বের সেই ৩১টি দেশের ক্লাবে যুক্ত হবে, যারা বর্তমানে পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই ৩১টি দেশে বর্তমানে ৪১৭টি সক্রিয় পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত নিট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩৮০ গিগাওয়াট।
আইএইএ-এর ডেটাবেস অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় চুল্লির সংখ্যা ৯০টিরও বেশি, ফ্রান্সে ৫০টির বেশি, চীনে ৫০টির বেশি, রাশিয়ায় ৩০টির বেশি, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৫টির বেশি এবং প্রতিবেশী ভারতে রয়েছে ২০টিরও বেশি পারমাণবিক চুল্লি। বাংলাদেশ সেখানে দুটি চুল্লি দিয়ে তার পরমাণু যাত্রা শুরু করছে।
তবে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তির পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশ বর্তমানে নতুন করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আরও অন্তত ২০টি দেশ এতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০টি চুল্লির নির্মাণকাজ চলছে এবং আরও ১২০টি চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
পারমাণবিক শক্তি কি খরুচে?
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, প্রকল্পের বিশাল ব্যাপ্তি, দীর্ঘ নির্মাণকাল এবং কারিগরি জটিলতার কারণে যেকোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রাথমিক মূলধনি বিনিয়োগ অস্বাভাবিক রকমের বেশি হয়ে থাকে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মূল চুক্তিটি হয়েছিল ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যার মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম কয়েক বছরের পারমাণবিক জ্বালানি খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্যয়ের ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করেছে রাশিয়া তাদের রাষ্ট্রীয় ঋণের মাধ্যমে, আর বাকি ১০ শতাংশের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ।
তবে সময়ের ব্যবধানে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার অতিরিক্ত ২৫৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেয়, যার ফলে রূপপুরের অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩৯ ট্রিলিয়ন টাকায়। এই বর্ধিত ব্যয়ও মেটানো হচ্ছে অতিরিক্ত প্রকল্প ঋণের মাধ্যমে।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল অংশ হলো এর নিরাপত্তা কাঠামো। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্ট করেছে যে, পারমাণবিক বিদ্যুতের সামগ্রিক ব্যয় নির্ধারণের সময় কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং এর অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, জরুরি সাড়া দেওয়ার অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রটির মেয়াদ শেষে অবসায়ন বা ডিকমিশনিংয়ের খরচও বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশে নিরাপত্তা খাতে কিছু ব্যয় আলাদাভাবে দৃশ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভৌত নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপনের জন্য প্রায় ২৮৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করা হয়েছিল। টিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই ব্যয় মূল প্রকল্প ব্যয়ের বাইরে।
তাই নিরাপত্তাকে শুধু এমন একটি অতিরিক্ত 'খরচ' হিসেবে দেখা যায় না, যা কমিয়ে আনা সম্ভব। পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য এটি একটি মৌলিক বিষয়। বিশ্বব্যাংক বলছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য শক্তিশালী আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, দক্ষ জনবল, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি, দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রূপপুর নিয়ে আইএইএর ২০২৫ সালের নিরাপত্তা পর্যালোচনায় কর্মীদের সিমুলেটরভিত্তিক প্রশিক্ষণের মতো কিছু ভালো চর্চার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর আগে অগ্নিনিরাপত্তা, পরিচালনাগত তদারকি এবং যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উন্নতির সুপারিশও করেছে সংস্থাটি।
পারমাণবিক বিদ্যুতের অর্থনৈতিক আকর্ষণ মূলত পরে আসে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের পর জ্বালানি ও অন্যান্য পরিবর্তনশীল পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম এবং স্থিতিশীল থাকে। অর্থাৎ, এটি মূলত বিপুল পরিমাণ প্রাথমিক মূলধনের বিনিময়ে আগামী কয়েক দশক ধরে স্থিতিশীল ও সস্তা বিদ্যুৎ পাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমীকরণ।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রকৃত পরীক্ষা উদ্বোধনের পরই শুরু হবে—রূপপুর কয়েক দশক ধরে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও উচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে পারে কি না; একই সঙ্গে দেশকে ঋণের দায়, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও কেন্দ্রটির অবসায়ন এবং একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোও সামলাতে হবে।
