সৌদির অনুরোধে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানকে তাগিদ দিচ্ছে চীন
ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর গত সপ্তাহে আকস্মিক বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পর সৌদি আরব বেইজিংয়ের কাছে সাহায্যের আবেদন করে। এরপরই চীন গোপন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ইয়েমেনের হুথিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করার জন্য তেহরানকে তাগিদ দিয়েছে।
সূত্র জানায়, লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীর আশপাশে হুথিরা দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পর রিয়াদ চীনের সাহায্য চায়। হুথিদের এই অগ্রগতির ফলে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রপ্তানি এবং সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
চীন প্রকাশ্যে সংযম, আলোচনা ও নিরাপদ নৌচলাচল পুনর্বহালের আহ্বান জানালেও তাদের গোপন কূটনৈতিক বার্তা ছিল আরও বেশি কঠোর।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় চীনের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথগুলোতে সংঘাত যেন আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে উদ্দেশ্যে হুথিদের ওপর নিজেদের প্রভাব খাটাতে ইরানকে তাগিদ দিচ্ছে বেইজিং।
আলোচনার বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। তবে এই বার্তা ঠিক কীভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বা বুধবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির চীন সফরকালে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য তারা দেননি।
তারা আরও জানায়, তেহরানের পক্ষ থেকে জবাবে বলা হয়েছে, এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ওপর।
জানা গেছে, হুথিদের ওপর প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হলে বেইজিং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে—চীনা কর্মকর্তারা সরাসরি এমন কোনো হুমকি বা ইঙ্গিত দেননি।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, 'চীন চায় না আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে পৌঁছাক। আঞ্চলিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া কোনো পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।'
তারা আরও জানায়, 'সকল দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা উচিত এবং মানুষের জীবনযাত্রার জন্য অপরিহার্য স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো যাবে না। চীন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এমন পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে এবং আলোচনা ও সংলাপে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিচ্ছে।'
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি
চীন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং দেশটির তেলের প্রধান ক্রেতা। কমোডিটি ডেটা ও অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান 'কপ্লার'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে চীন, যার গড় পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
ওই অঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, 'বেইজিং এমন কয়েকটি মাত্র রাজধানীর একটি, যা এখনও হুথিদের দমনে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।'
ইরানি সূত্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মতে, ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সুন্নি ধর্মীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে যে হুথি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছিল—তারা ইরানের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রে সজ্জিত। এই গোষ্ঠীটি তেহরান-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবিরোধী এবং ইসরায়েলবিরোধী "অক্ষশক্তি"-এর অন্যতম অংশ।
লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নৌচলাচলের ওপর হুথিদের যেকোনো হুমকি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে ইরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করা শুরু করার পর থেকে, যা একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যেই কার্যকরভাবে বন্ধ থাকায়, লোহিত সাগরের জাহাজ বা বন্দরগুলোতে হুথিদের অব্যাহত হামলা মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুটি তেল রপ্তানি রুটকে একই সাথে ব্যাহত করবে। এটি জ্বালানি সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের বিস্তৃত মুখোমুখি সংঘাত—উভয় ক্ষেত্রেই এক নতুন রণক্ষেত্র উন্মোচন করবে।
এক সূত্রে জানা গেছে ইরান ও তার মিত্ররা এখন এ অঞ্চলের মূল সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের উভয় প্রান্তেই চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে, অথচ চীন এই দুটি রুটের ওপরই নির্ভরশীল।
ওয়াশিংটনের মিডেল ইস্ট ইনস্টিটিউটের 'ইরান প্রোগ্রাম'-এর পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, বেইজিং হয়তো তেহরানের ওপর মার্কিন চাপের বিরোধিতা করতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে এই অঞ্চল থেকে, আর গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলোর সাথে চীনের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার।
ভাতানকা বলেন, "ইরান হরমুজ প্রণালী অচল করে দিতে পারে। কিন্তু একপর্যায়ে এই কৌশলী সুবিধাটি সেই শক্তিরই ক্ষতি করতে শুরু করবে, যার ওপর তেহরান দিন দিন আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।"
চীনের দ্বিধা
তিনটি ইরানি সূত্রের মতে, বেইজিংয়ের উত্থাপিত এসব উদ্বেগ বা বার্তা অনুযায়ী তেহরান শেষ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমাগত বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে থাকায় এই সম্পর্কটি ইরানের জন্য এখনো বিপুল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং তাদের তেল খাতকে সচল রাখতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা জোগানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা থাকা হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে চীন অন্যতম।
বেইজিং তাদের কূটনৈতিক প্রভাবের প্রমাণও দিয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতাতেই দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার হয়েছিল।
তবে এই প্রভাবেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের তুলনামূলক কম মাত্রা নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরেই সমালোচকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন—বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের তুলনায় তা বেশ কম।
তবুও চীন এমন এক প্রভাবক, যাকে উপেক্ষা করার সাধ্য তেহরানের নেই। কিন্তু দুটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, বেইজিংয়ের স্বার্থ ইরানের বিবেচনায় থাকা অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে একটি মাত্র। ইরানের সিদ্ধান্তগুলো তাদের প্রতিযোগী কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
এই পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, 'তেহরান ও বেইজিং উভয়েরই একে অপরকে প্রয়োজন। চীন এমন একটি শক্তি যা তেহরান উপেক্ষা করতে পারে না, আর বেইজিং চায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হোক এবং লোহিত সাগরে নৌচলাচল নিরাপদ থাকুক।'
বিশ্লেষকদের মতে, আসল পরীক্ষাটি হবে চীন তাদের এই দাবিগুলোর সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত শর্ত বা পরিণতি যুক্ত করতে প্রস্তুত কি না। তারা মনে করেন, তেহরানের ওপর নিজেদের প্রভাব খাটাতে বেইজিং প্রকৃতপক্ষে কতটা ইচ্ছুক—তার প্রমাণই হবে চীনের সংকল্পের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত।
