কারখানা বন্ধ হওয়া ঠেকাতে এলাকাভিত্তিক গ্যাস রেশনিং চায় পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের চার সংগঠন
হাইলাইটস
- তিতাসের বিতরণ এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটে প্রায় ৬,৫০০ কারখানা
- এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক গ্যাস রেশনিং চালুর দাবি শীর্ষ চার বাণিজ্য সংগঠনের
- অনুমোদিত বরাদ্দের চেয়ে কম গ্যাস পাচ্ছে তিতাস
- অবিলম্বে গ্যাসের সুষম পুনঃবণ্টনের দাবি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর
- অঞ্চলভেদে সপ্তাহে ৫ দিন পূর্ণ চাপে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব
- গ্যাস সংকটে ব্যাপক ঝুঁকিতে কারখানা সচল রাখা ও রপ্তানি আদেশ যথাসময়ে পূরণ
দেশজুড়ে পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানায় ব্যাপক হারে উৎপাদন বন্ধ ও অচলাবস্থা ঠেকাতে—অবিলম্বে গ্যাসের সুষম পুনঃবণ্টন এবং এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের শীর্ষ ৪টি সংগঠন। রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) কাছে এ বিষয়ে একটি যৌথ আবেদন জমা দিয়েছে তারা।
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিটিএলএমইএ)-এর সভাপতি ও শীর্ষ নেতারা এই যৌথ পত্রে স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে সংগঠনগুলো উল্লেখ করেছে, গ্যাস বণ্টনে চরম বৈষম্যের কারণে দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের কাঙ্ক্ষিত চাপ (প্রেসার) মিলছে না। এতে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য রপ্তানির ডেডলাইন পূরণে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, "প্রতিদিন নামমাত্র (গ্যাসের) চাপে কারখানা চালিয়ে—নিম্নমানের উৎপাদনশীলতা পাওয়ার চেয়ে পর্যায়ক্রমে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে পূর্ণ চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হলে, কারখানাগুলো দক্ষতার সাথে উৎপাদন করতে পারবে।"
তিনি আরও বলেন, "জিটিসিএল যদি এই রেশনিং ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে আমরা আমাদের উৎপাদন পরিকল্পনা কার্যকরভাবে সাজাতে পারব। শ্রমিকদের সম্পূর্ণ বসিয়ে রেখে বেতনও গুনতে হবে না।"
বেশিরভাগ পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা তিতাস গ্যাসের এলাকায়
চিঠিতে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক উৎপাদন খাতের ৯০ শতাংশেরও বেশি কারখানা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত।
সংগঠনগুলো জানায়, দেশের মোট টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানার প্রায় ৯৪ শতাংশ বা আনুমানিক ৬,৫০০টি কারখানা তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকায় রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত রয়েছেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শ্রমিক, যা এ খাতের মোট জনবলের প্রায় ৯২ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাতের বার্ষিক ৫২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এসব কারখানা থেকে।
চিঠিতে ২০২৬ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর—এই ৫ দিনের গ্যাস সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাস বণ্টনে বড় ধরনের ব্যবধানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সংগঠনগুলোর হিসেব অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত মোট শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতের গ্যাসের চাহিদার ৭৫.৮৮ শতাংশ বা প্রতিদিন ১,৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস তিতাসের আওতাধীন এলাকায় প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে জিটিসিএলের কাছ থেকে তিতাসের দৈনিক ৯৮০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও, গত ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সময়ে গড়ে তারা পেয়েছে মাত্র ৮৮৩.২০ এমএমসিএফডি। ফলে তিতাস এলাকায় দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৬.৮০ এমএমসিএফডি।
একই সময়ে দেশের অন্য কিছু অঞ্চলে বরাদ্দের চেয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনগুলো।
চিঠিতে বলা হয়, দেশের অন্য ৫টি আঞ্চলিক গ্যাস বিতরণ কোম্পানি প্রতিদিন ৩৭৩.৬০ এমএমসিএফডি গ্যাস পেয়েছে, যা তাদের আনুপাতিক বরাদ্দের চেয়ে ৭০.৩৭ এমএমসিএফডি বেশি।
সপ্তাহে ৫ দিন ঘূর্ণায়মান সরবরাহের প্রস্তাব
সংকট উত্তরণে পোশাল ও টেক্সটাইল শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট জোনে ভাগ করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি জোনে সপ্তাহে টানা ৫ দিন পূর্ণ চাপে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে এবং পরবর্তী ২ দিন পরিকল্পিতভাবে সংযোগ বন্ধ রাখা বা সীমিত চাপে গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
তারা উল্লেখ করেন, এই রেশনিং বা পর্যায়ক্রমিক সরবরাহ সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়াকরণ কারখানা (কন্টিনিউয়াস প্রসেস প্ল্যান্ট), বয়লার পরিচালনা, পণ্য শিপমেন্টের সময়সীমা, শ্রম আইন এবং কারখানাগুলোর নিরাপত্তা বিধি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে অন্য বিতরণ অঞ্চলগুলোর অতিরিক্ত সরবরাহকৃত গ্যাস— অবিলম্বে তিতাস এলাকায় স্থানান্তরিত করে, কারখানার যন্ত্রপাতি নিরাপদে ও দক্ষতার সাথে চালানোর জন্য উপযুক্ত লাইন প্রেসার বা গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করতে—জিটিসিএলের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে।
শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাত্রা কমিয়ে এনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে, শিল্পাঞ্চলগুলোতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সাপ্তাহিক এলাকাভিত্তিক রেশনিং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
