মক্কার অদূরে ড্রোন: নেপথ্যে আসলে কে?
পবিত্র মক্কা নগরীর দক্ষিণে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের ছোঁড়া একটি ড্রোন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে শনাক্ত ও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশ করার আগেই ড্রোনটিকে ধ্বংস করা হয়। তবে ইয়েমেনের হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিষয়টি সরাসরি ও স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে। ফলে মূল প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, আর তা হচ্ছে—ড্রোনটি আসলে কোথায় যাচ্ছিল এবং কেইবা এটিকে পাঠিয়েছিল?
সৌদি সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার মক্কার চারপাশের নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। একই সঙ্গে তিনি ইসলামের দুই পবিত্রতম স্থানের নিরাপত্তাকে 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে উল্লেখ করেন। সৌদি আরব এ ঘটনাকে পবিত্র নগরীতে হামলা চালাতে হুথিদের একটি চক্রান্ত বলে অভিহিত করেছে। জোটটি আরও জানায়, ২০১৭ সালের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘটনার পর—এটি মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার হুথিদের দ্বিতীয় চেষ্টা। বার্তাসংস্থা রয়টার্স সৌদি জোটের বিবৃতির বিষয়টি প্রকাশ করেছে এবং বিবিসি জানিয়েছে, ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) মক্কায় হামলাচেষ্টার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
তবে হুথিরা সৌদির এই অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। হুথিদের নিয়ন্ত্রিত বার্তাসংস্থা সাবা-র বরাতে বলা হয়, হুথি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ রিয়াদের এই দাবিকে "একটি ভিত্তিহীন চরম মিথ্যাচার" বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে—রিয়াদ ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করছে। মিডল ইস্ট মনিটর পৃথক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হুথিদের একটি সামরিক সূত্র মক্কা বা অন্য কোনো ইসলামিক পবিত্র স্থানের ওপর ইয়েমেন থেকে হামলা বা হুমকির কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
এর ফলে ড্রোনটি অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার পথে মক্কার কাছাকাছি চলে এসেছিল—এমন একটি সম্ভাবনার দুয়ার খোলা থাকে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা 'ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার' (আইএসডব্লিউ)-এর বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোনটি হয়তো পবিত্র নগরী মক্কাকে নয়, বরং মক্কার নিকটে বা উত্তরে অবস্থিত সৌদির সামরিক কিংবা তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল। আইএসডব্লিউ মন্তব্য করেছে, হুথিদের পক্ষে ইচ্ছাকৃতভাবে মক্কাকে লক্ষ্য করা অস্বাভাবিক। কারণ এই নগরীতে সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বড় কোনো লক্ষ্যবস্তু নেই। তাছাড়া এই ধরনের হামলা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক নিন্দার জন্ম দেবে। তাদের মতে, পশ্চিম ইয়েমেন থেকে উৎক্ষেপণ করা কোনো ড্রোনটি—আরও উত্তরের ইয়ানবু বন্দরের মতো দূরবর্তী কোনো লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার পথে স্বাভাবিকভাবেই মক্কার কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
তবে হুথিদের অস্বীকারের বিষয়টিও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে এই গোষ্ঠীটির। রয়টার্স জানিয়েছে, মক্কার ঘটনার ঠিক কাছাকাছি সময়ে হুথি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে— লোহিত সাগরের ইয়ানবু তেল বন্দর এবং খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিসহ একাধিক সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছিলেন। এমনকি হুথিরা একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করে। যদিও রয়টার্স জানায় যে, এই দাবির পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো প্রমাণ পেশ করা হয়নি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর হুথিরা দাবি করে, তারা ইয়ানবুতে অবস্থিত সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা এবং খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তখন এসব দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। আর এতে সরাসরি এটি প্রমাণিত হয় না যে মক্কা অভিমুখে যাওয়া ড্রোনটি হুথিদেরই উৎক্ষেপণ করা ছিল। তবে এটি নিশ্চিত করে যে ওই নির্দিষ্ট সময়ে গোষ্ঠীটি সৌদির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালাচ্ছিল।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের দাবিকেও সতর্কতার সাথে দেখার মতো কারণ রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মক্কার আকাশে ড্রোন ধ্বংসের দৃশ্য দাবি করে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে পাকিস্তানের একটি তথ্য-যাচাইকারী (ফ্যাক্ট-চেকিং) প্রতিষ্ঠান বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে সেটি সাম্প্রতিক ঘটনার নয়; বরং ২০২৫ সালের মদিনার আকাশে দেখা যাওয়া একটি বস্তুর পুরোনো ভিডিও। এটি সৌদি সামরিক বাহিনীর পুরো বিবরণকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ না করলেও, দেখায় যে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কত দ্রুত যাচাইহীন কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়েছে।
তৃতীয় কোনো পক্ষ কি দায়ী হতে পারে?
বর্তমানে কোনো তৃতীয় পক্ষ এই ড্রোনের পেছনে জড়িত ছিল কি না—তার প্রকাশ্যে উপলব্ধ কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। বিবিসি, রয়টার্স বা মিডল ইস্ট মনিটরের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও—এই ঘটনার দায় অন্য কোনো দেশের ওপর চাপায়নি। ফলে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে তিক্ততা বাড়াতে ইসরায়েল এই ধরনের কোনো 'ফলস ফ্ল্যাগ' (ছদ্মবেশী হামলা) ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে যে ধারণার কথা বলা হচ্ছে, তা নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাখ্যার বদলে নিছক জল্পনা বলেই গণ্য হচ্ছে।
তবে ইসরায়েল অতীতে এ ধরনের ছদ্মবেশী হামলার (ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন) অন্তত একটি সরকারি নথিবদ্ধ ইতিহাস তৈরি করেছে। সেটি হলো ১৯৫৪ সালের বহুল আলোচিত 'লাভন অ্যাফেয়ার'। ইসরায়েলের নিজস্ব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মিশরীয়, আমেরিকান ও ব্রিটিশ বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর জন্য মিশরীয় ইহুদিদের নিয়োগ করেছিল; যাতে হামলার দায় অন্য কোনো গোষ্ঠীর ওপর চাপানো যায়।
ওই ঐতিহাসিক নথিতে ১৯৫৪ সালে ইসরায়েলের এই জাতীয় ছদ্মবেশী অভিযানের প্রমাণ থাকলেও, তা দিয়ে বর্তমান মক্কা ঘটনায় ইসরায়েল জড়িত ছিল—এমন কোনো প্রমাণ মেলে না।
এর মধ্যে আরেকটি প্রাসঙ্গিক বিষয় সামনে এসেছে। মিডল ইস্ট মনিটর চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি ও অন্যান্য সূত্রের বরাতে জানায়, হুথিদের হুমকি তীব্র হতে থাকায়— সৌদি আরব মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সহায়তা চেয়ে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে এই সম্ভাব্য সহায়তা মূলত গোয়েন্দা তথ্য ও হুমকি চিহ্নিতকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে রিয়াদ বা জেরুজালেম—কোনো পক্ষই এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
এ ধরনের ঘটনা পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। একদিকে সৌদি আরব তার ভূখণ্ডে হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলার বিরুদ্ধে লড়ছে, অন্যদিকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলমান বিস্তৃত সংঘাত— আঞ্চলিক বহু পক্ষকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করাচ্ছে।
এপর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ থেকে এটুকুই নিশ্চিত হওয়া যায়—সৌদি আরব দাবি করেছে তারা মক্কার দক্ষিণে একটি ড্রোন ধ্বংস করেছে এবং এর জন্য হুথিদের দায়ী করেছে। অন্যদিকে হুথিরা পবিত্র নগরীতে আক্রমণের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করছে। সৌদি সামরিক ও জ্বালানি কেন্দ্রে হুথিদের হামলার রেকর্ড থাকলেও—তাদের সাম্প্রতিক কিছু দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তাই রিয়াদের দাবির স্বপক্ষে যেমন প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে, তেমনই হুথিদের অস্বীকারের বিষয়টিও নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তাছাড়া ড্রোনটি আসলে মক্কা অভিমুখী ছিল, নাকি অন্য কোনো সৌদি স্থাপনাকে নিশানা করেছিল, কিংবা এর পেছনে তৃতীয় কোনো শক্তি দায়ী ছিল কি না—তা এখনও প্রমাণিত নয়।
ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ, এর মডেল ও উৎস, এর উড্ডয়ন পথ, উৎক্ষেপণ স্থলের তথ্য কিংবা নিরপেক্ষ স্যাটেলাইট ডেটার মতো অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন হবে।
