লোহিত সাগরে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হলো: বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে পারে বড় প্রভাব
সম্প্রতি হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে অতি দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দর এবং বাব এল-মানদেব প্রণালির কৌশলগত দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এই প্রণালি ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগরকে সংযোগকারী সমুদ্রপথের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক 'চোকপয়েন্ট'। চলতি বছরে হরমুজ প্রণালি বারবার বন্ধ হওয়া বা সাময়িক খোলার দরুন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য এই পথটি বিকল্প রুট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
বিশেষত সৌদি আরব তাদের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছিল, এবং সেখান থেকে বাব এল-মানদেব প্রণালি হয়ে সমুদ্রপথে পরিবহন করছিল।
তবে মাত্র কয়েক দিন আগে সৌদির এই পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং পাইপলাইনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরান সমর্থিত ইরাকের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে।
আপাতত লোহিত সাগর হয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও, সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাবের বিশ্লেষণ এখানে তুলে ধরা হলো:
তেলের বাজারে আবারও ধাক্কা
লোহিত সাগরে হুথিদের এই কৌশলগত ভৌগোলিক অগ্রগতি—সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য দ্বিতীয় বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান সমর্থিত হুথি ও সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অংশ হিসেবেই হুথিরা আক্রমণ অভিযানের মাধ্যমে লোহিত সাগর উপকূলে এ অগ্রগতি অর্জন করেছে।
২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে যৌথ বিমান হামলা ও সীমিত পরিসরের স্থল অভিযানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল সৌদি আরব। এরপর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় দুইপক্ষ, যা চলতি বছর পর্যন্ত টিকে ছিল।
হুথিরা যদিও স্পষ্ট জানিয়েছে যে, সৌদি আরবের জাহাজ এবং সৌদির তেল খাতই তাদের প্রত্যক্ষ লক্ষ্যবস্তু। তবে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশই বাণিজ্য ও মালামাল পরিবহনের জন্য বাব এল-মানদেব প্রণালির ওপর নির্ভর করে।
বাব এল-মানদেব প্রণালি থেকে মাত্র ৭৫ কিলোমিটার উত্তরের কৌশলগত স্থান মোখায় অবস্থান নিয়ে হুথি বিদ্রোহীরা এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে, অথবা এর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ড্রোন, জাহাজ-বিধবংসী মিসাইল এবং দ্রুতগামী আক্রমণাত্মক নৌকার মতো হালকা ও অসম শক্তির কৌশল ব্যবহার করে—অতি সহজেই এই আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রাণস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি
লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের একটি নতুন মোড় বা টার্নিং পয়েন্ট বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, হুথিরা এবং তাদের মাধ্যমে ইরান– যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে সহসাই পিছু হটছে না।
যদিও এই অভিযানে সরাসরি ইরানের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি তেহরান, তবে ইরানের অনুমতি ছাড়া হুথিরা যে এমন পদক্ষেপ নেবে না—তা প্রায় নিশ্চিত। ফলস্বরূপ, ইরান ও হুথি গোষ্ঠী এখন বিশ্ববাণিজ্যের দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল।
হুথিদের এই অগ্রগতির সময় ও কৌশলগত গুরুত্বও কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এতে দেখা যায়, ইরানি শাসনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখতে ও তা বাড়াতে, যেখানে সম্ভব তাদের প্রভাব কাজে লাগাচ্ছেন।
বিশ্ব বাণিজ্যে বিঘ্ন এখন 'নতুন বাস্তবতা'
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন একটি জটিল প্রক্রিয়া থেকে এখন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর খাতে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও, ২০২৫ সালের জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই ধরনের নৌ-বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়া অব্যাহত থাকবে এবং জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
হুথিদের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে আসার বিষয়টিও প্রকাশ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। ইয়েমেনে হুথিদের ঘাঁটিতে সৌদি আরবের সাথে যৌথ বিমান হামলায় অংশ নেওয়ার অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প।
এদিকে বাব এল-মানদেব প্রণালি ক্রমেই আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠায়— ওই অঞ্চলের দেশগুলো জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের চেষ্টা জোরদার করতে পারে। তবে এসব বিকল্প অবকাঠামো নির্মাণ ও তা পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগবে। এরপরেও সমুদ্রপথের মতো বিশাল পরিমাণের পণ্য পরিবহন করতে পারবে না বিকল্প ব্যবস্থাগুলো। আর এরমধ্যেই জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির বোঝা টানতে হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। যেকারণে এর পুনর্বিন্যাসও হয়তো দেখা যাবে।
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে ইউরোপ
বাব এল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে—ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যেটি তারা এতদিন ধরে এড়ানোর চেষ্টা করছিল। এর আগে ইউরোপের নেতারা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিনীদের নৌ অবরোধ বা শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রচেষ্টায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
আর এজন্য ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের সমালোচনাও করেছেন।
তবে বাব এল-মানদেব প্রণালির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। লোহিত সাগরে অবাধ নৌ-চলাচল রক্ষায় একটি আত্মরক্ষামূলক মিশনের আওতায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-ভুক্ত কয়েকটি দেশের যুদ্ধজাহাজ সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন রয়েছে। লোহিত সাগরের এই চলমান সংকট তাদের ইরান সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে। এমনকী এর ফলশ্রুতিতে ইরানের বিরুদ্ধেও সরাসরি সংঘাতের জড়াতে পারে ইইউ।
সংকট কি আরও ঘনীভূত হবে?
এই সংকট কতদূর গড়ায় তা মূলত আগামী সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব ও হুথিদের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। হুথি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের বিমান বাহিনী ইয়েমেনের মোখা বিমানবন্দরসহ অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এখন সৌদি আরব যদি আবারও ইয়েমেনে পুরোদমে বোমাবর্ষণ শুরু করে, তবে তা হুথিদের সঙ্গে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতিকে চূড়ান্তভাবে ভঙ্গ করবে।
এমন প্রেক্ষাপটে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে– বাব এল-মানদেব প্রণালির ওপর পাওয়া এই নতুন কৌশলগত সুবিধা ব্যবহার করে হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজে কী মাত্রায় হামলা চালাবে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে লোহিত সাগরে একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছিল হুথিরা, যাতে ৬ জন নিহত হন।
এজন্য স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে– হুথিরা কি জাহাজে নতুন করে হামলা চালিয়ে আরও প্রাণহানি ঘটাবে? এর উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তাহলে সৌদি আরব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও এর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
