কানাডাকে ইইউ’র প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য শুল্ক ও আগ্রাসী নীতির মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দিকে ঝুঁকেছে কানাডা। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম 'সহযোগী সদস্য' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন।
বুধবার বার্ষিক 'স্টেট অব দ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন' ভাষণে ভন ডার লিয়েন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই, যাতে কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম সহযোগী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দুয়ার খুলে দেওয়া যায়।' ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতারা এই প্রস্তাবের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। প্রধানমন্ত্রী কার্নি বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের একের পর এক শুল্ক আরোপ এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের '৫১তম অঙ্গরাজ্য' বানিয়ে ফেলার বারবার হুমকির কারণে অটোয়া এখন ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদারে মরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত বাণিজ্য নির্ভরশীলতা কমাতে প্রধানমন্ত্রী কার্নি ইইউর সঙ্গে একটি 'অনন্য জোট' বা ইউনিক অ্যালায়েন্স গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভন ডার লিয়েন জানান, কানাডা ও ইইউ তাদের বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি 'সেটা'-কে ভিত্তি করে একটি বৃহত্তর 'অ্যালায়েন্স ফর দ্য ফিউচার' বা ভবিষ্যৎ জোট গড়ে তুলবে। এর মূল লক্ষ্য হবে একটি অভিন্ন সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা।
তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, 'প্রিয় মার্ক, ইউরোপ এবং কানাডা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। আমরা বিশ্বাস করি ক্ষমতা কেবল সবচেয়ে শক্তিশালী, ধনী বা উচ্চকণ্ঠ মানুষের হাতে থাকা উচিত নয়; বরং এটি আমাদের সবার। গণতন্ত্রের স্বাধীনতা আছে নিজের কাজের অংশীদার বেছে নেওয়ার।'
এই অংশীদারত্বের আওতায় আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদন, আর্কটিক অঞ্চল, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, ব্যাটারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ভন ডার লিয়েন বলেন, 'এই অংশীদারত্ব কারো বিরুদ্ধে নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত শক্তির জন্য। সংক্ষেপে, আমরা কানাডার সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।'
উল্লেখ্য, কানাডা ইতিমধ্যে মার্কিন শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে এবং এমন বাণিজ্য শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে যা দেশটির সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান এক্ষেত্রে ভিন্ন। তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা করে ইইউ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্কের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে এবং বিনিময়ে ইউরোপীয় বাজারে মার্কিন শিল্পপণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নিয়েছে।
জানুয়ারি মাসে ডাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী কার্নি এক ভাষণে বিশ্বশক্তির প্রতিযোগিতার যুগে মধ্যম সারির ক্ষমতাধর দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, 'যখন আমরা এককভাবে কোনো পরাশক্তির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করি, তখন আমরা দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনা করি। আমরা তখন কেবল তাদের প্রস্তাবই মেনে নিই।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এটি সার্বভৌমত্ব নয়; বরং সার্বভৌমত্বের অভিনয় মাত্র, যেখানে আসলে আমরা অধীনতা স্বীকার করছি।'
কার্নির সেই ডাভোস ভাষণের পর ট্রাম্প তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছিলেন। এখন ভন ডার লিয়েনের এই নতুন প্রস্তাব ট্রাম্পের সঙ্গে কানাডার চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
