এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনীয় আইন আছে: সংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিলেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারে মানুষের ক্ষতি হওয়ার বিষয়ে প্রযুক্তি খাতের নেতাদের প্রকাশ করা উদ্বেগকে গুরুত্বহীন করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন বলে মনে হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যে অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন গত সপ্তাহে বলেছিলেন, তিনি পদত্যাগ করেছেন আংশিকভাবে এই কারণে যে, 'যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছেন, তারা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন যে এই দশকের শেষ নাগাদ এটি আমাদের সবাইকে ধ্বংস করে দিতে পারে।'
প্রযুক্তি খাতের কয়েকটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নেতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানানোর পর সোমবার বিশ্বজুড়ে এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, 'এআইয়ের যে একমাত্র নিয়ন্ত্রণ বা "সুরক্ষাব্যবস্থা" প্রয়োজন, তা হলো একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান—উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন—প্রেসিডেন্ট। আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমন প্রেসিডেন্টের কোনো ঘাটতি নেই।'
তিনি আরও লিখেছেন, এআই উন্নয়ন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে এর সুবিধা চীন পাবে।
আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আলাদা একটি বৈঠকের পরিকল্পনা করেছিল। ওই বৈঠকে দুই দেশের অপেক্ষাকৃত নিম্নপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি আশা করছেন, ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে অথবা আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে এআই খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
তিনি বলেন, ওই বৈঠকে 'নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে সরকারের কী ভূমিকা থাকা উচিত, যদি আদৌ কোনো ভূমিকা থাকে'—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, এআই খাত নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, সে বিষয়ে তিনি সংশয়ী।
ভ্যান্স বলেন, 'আমার কাছে বিষয়টি কিছুটা অদ্ভুত লাগছে যে, এআই প্রযুক্তির এতগুলো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে এসে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একপ্রকার অনুরোধ জানাচ্ছে।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প এআই খাতের নিয়ন্ত্রণের আহ্বানকে 'ভাঁওতাবাজি' বলে অভিহিত করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই শনিবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, সবচেয়ে উন্নত এআই ব্যবস্থাগুলোর—যেগুলোকে 'সীমান্তবর্তী মডেল' বলা হয়—স্বাধীন নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে মার্কিন সরকারের বিধিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
রয়টার্স সোমবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন সিনেটর এমন একটি আইন প্রণয়নের কাজ করছেন, যার আওতায় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের তৈরি প্রযুক্তি যাতে মানুষের ক্ষতি না করে, সে জন্য তারা যুক্তিসংগত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে আইনটির সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
'ফ্যান্টম টুইস্ট' যেহেতু একটি মাত্র ইঞ্জিনচালিত উড়োজাহাজ, তাই প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫টি ফ্রেমের গতিতে এর পুরো দেহ ফ্রিসবির মতো ঘুরতে থাকে।
নিজের নিবন্ধে আমোদেই তিন ধাপের একটি কাঠামোর কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, এর উদ্দেশ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের গতি কমানো এবং এর ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য আরও সময় তৈরি করা।
প্রস্তাবটি প্রকাশের পরপরই এআই খাতের বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা এটি সমর্থন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক্সএআই পরিচালনাকারী ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান।
প্রযুক্তি-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার সপ্তাহান্তে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আমোদেই ও অল্টম্যানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে তাঁর মুখপাত্র জানিয়েছেন।
এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং সোমবার লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত অল-ইন সম্মেলনে এআই নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়ে কথা বলেছেন।
হুয়াং বলেন, 'এখানে অনেক বিষয় রয়েছে—উন্নয়ন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা, উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ করা। কোনো কোম্পানি যদি মনে করে যে তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাহলে তারা নিজেদের উদ্যোগে এসব ব্যবস্থা নিতে পারে।'
অনুষ্ঠান চলাকালে হুয়াং ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি ফোনকল পান এবং উপস্থিত দর্শকদের শোনানোর জন্য ফোনটি লাউডস্পিকারে চালু করেন।
প্রায় পাঁচ মিনিটের ওই ফোনালাপে ট্রাম্প বলেন, তথ্যকেন্দ্রগুলো মানুষ ও অঙ্গরাজ্যগুলোকে ধনী করে তোলে। তিনি এগুলোকে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের 'তেল' হিসেবে অভিহিত করেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, এআই উন্নয়নের সমালোচকেরা 'এমন অনেক মানুষের হাতেই কাজ করে দিচ্ছেন, যারা এআইয়ের উন্নয়ন দেখতে চায় না। তারা রাজনৈতিক ব্যক্তি হতে পারে, আবার চীনও হতে পারে।'
ট্রাম্প বলেন, 'আমরা এমনটা হতে দেব না।'
হুয়াংও ট্রাম্পের কথায় সম্মতি জানান।
এআই নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি এখন পর্যন্ত ট্রাম্প গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। বরং তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ব্যাপক সমর্থন দেখিয়েছেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, এআইকে নিরাপদ রাখার জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো তাঁর প্রশাসন ইতোমধ্যেই আমোদেইয়ের প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'ট্রাম্প প্রশাসন এআই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট "মানুষদের" খারাপ বা সম্ভাব্য খারাপ কাজ করা থেকে বিরত রেখেছে। এর মধ্যে অ্যানথ্রপিকের দারিওও রয়েছেন, যিনি এখন নিজেকে একজন "নিখুঁত ছোট্ট দেবদূত" হিসেবে উপস্থাপন করার ভান করছেন। আমরা ভবিষ্যতেও এমন ব্যবস্থা নিতে থাকব।'
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্য চাওয়া হলেও অ্যানথ্রপিকের গণমাধ্যমবিষয়ক দল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এআই নিরাপত্তা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহারের বিষয়কে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের বিরোধ চলছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অ্যানথ্রপিককে কয়েকটি সামরিক চুক্তি থেকে বাদ দিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে নজরদারি এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারের কাজে তাদের ক্লদ নামের এআই মডেল ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
এরপর অ্যানথ্রপিক ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালতে মামলা করে। গত ২৭ আগস্ট একটি মামলায় মার্কিন এক বিচারক অ্যানথ্রপিকের পক্ষে রায় দেন।
