এআই নিয়ে সবার ‘ভয় পাওয়াটা যৌক্তিক’, তবে আমাদের ওপর ‘বিশ্বাস রাখতে হবে’: ওপেনএআই সিইও
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য সব ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়তে থাকার মধ্যে ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান মনে করেন, এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মানুষের উচিত তাঁর কোম্পানি এবং এ খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আরও বেশি আস্থা রাখা।
গত মঙ্গলবার সান ফ্রান্সিসকোতে এক সম্মেলনে অল্টম্যান বলেন, 'বিশ্বের উচিত আমাদের বিশ্বাস করা যে আমরা সঠিক কাজটিই করব, কারণ এটিই সঠিক পথ এবং আমরা এর গুরুত্ব ও ভয়াবহতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি।'
তবে অল্টম্যান উল্লেখ করেন যে, এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের যে ভয়, তা সম্পূর্ণ যৌক্তিক; কারণ এই প্রযুক্তিগুলোর সক্ষমতা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, 'এটি কীভাবে ভুল পথে যেতে পারে তা কল্পনা করতে এখন আর আমাদের আগের মতো অত বেশি কষ্টকল্পনা করতে হয় না। আমার মনে হয় এ নিয়ে বিশ্বের আতঙ্কিত হওয়াটা একদম সঠিক।'
সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সেলসফোর্সের আয়োজিত একটি বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে অল্টম্যান এই মন্তব্য করেন।
এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক ছেড়ে যাওয়া এক গবেষকের একটি পোস্ট গত সপ্তাহে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এটিই ছিল অল্টম্যানের প্রথম কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য। ওই গবেষক দাবি করেছিলেন যে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছেড়ে দিলে এই দশকের শেষ নাগাদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমস্ত মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
এআই খাতের আরও বেশ কয়েকজন নির্বাহী এবং বিশেষজ্ঞও ওই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করেছিলেন, যদিও তাঁরা কীভাবে এই উপসংহারে পৌঁছেছেন কিংবা এআই কীভাবে ঠিক এমন কাণ্ড ঘটাতে পারে—সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
এই দাবিগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া তীব্র আলোড়ন সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এআইয়ের বিকাশ নিয়ে আরও বিশদ নজরদারির জন্ম দেয়। এর জবাবে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সমস্ত এআই উন্নয়নের গতি ধীর করার আহ্বান জানান এবং এই শিল্পকে কঠোর নিয়মের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি তাগিদ দেন।
ওই পদত্যাগী গবেষকের পোস্টটির প্রশংসা করেছিলেন অল্টম্যান স্বয়ং, পাশাপাশি গুগলের ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স ও এআই সহকারী গ্রোকের মালিক ইলন মাস্কও এর প্রশংসা করেন।
তবে মঙ্গলবারের মধ্যে এআই খাতের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই সরকারি হস্তক্ষেপের চেয়ে বরং 'স্ব-নিয়ন্ত্রণ' বা সেলফ-রেগুলেশনের পক্ষে মত দিতে শুরু করেন।
অল্টম্যান বলেন, তিনি মনে করেন তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের মতো এআই কোম্পানিগুলো মূলত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।
অল্টম্যান বলেন, 'আমরা বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করব, নিরাপদে এটি করার ক্ষেত্রে আমাদের কোম্পানি এবং পুরো শিল্পের সক্ষমতার ওপর আমার অগাধ আস্থা রয়েছে।' তিনি আরও যোগ করেন, তিনি নিশ্চিত যে তাঁরা 'প্রযুক্তির সক্ষমতার চেয়ে এর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাকে অনেক বেশি এগিয়ে রাখবেন' এবং যদি তা করতে না পারেন, তবে তাঁরা এর গতি 'ধীর করবেন কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন।'
অল্টম্যানের এই মন্তব্যের পর মেটাপ্রধান মার্ক জাকারবার্গ এক্সে লেখেন যে, প্রতিটি এআই ল্যাবেরই নিজস্ব উদ্যোগে এমন এআই টুল ও মডেল তৈরি করার সম্পূর্ণ সক্ষমতা এবং প্রণোদনা রয়েছে যা নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা।
জাকারবার্গ লেখেন, 'যে ল্যাব নিরাপত্তার দিকে নজর দেবে না, তারা এমনিতেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। তাদের মডেলগুলো কোনো ক্ষতিসাধন করলে ল্যাবগুলোকে বিরাট আইনি দায়ের মুখোমুখি হতে হবে, তাই ক্ষতি প্রতিরোধ করার পেছনেও তাদের জোরালো স্বার্থ রয়েছে।'
মঙ্গলবার একই সম্মেলনে অংশ নিয়ে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াংও বলেন যে, নতুন প্রযুক্তির সংস্করণ বাজারে ছাড়া হবে কি না তা এআই কোম্পানিগুলোরই নির্ধারণ করা উচিত এবং এটি বাইরের কোনো শক্তি দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়।
হুয়াং বলেন, 'আমাদের নতুন কোনো আইন বা বিধিনিষেধের প্রয়োজন নেই।' তিনি আরও যোগ করেন, উদ্ভাবনের গতি এবং এআই পণ্যের নিরাপত্তার মধ্যে কোনো 'ভ্রান্ত দ্বৈরথ' থাকা উচিত নয়।
এনভিডিয়া বর্তমানে বাজারমূল্যের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। তাদের তৈরি এআই কম্পিউটিং চিপের ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফায় বিপুল উল্লম্ফন ঘটেছে।
হুয়াং বলেন, 'নিরাপত্তাই সবার আগে। তবে নিরাপত্তা মূলত একটি ইঞ্জিনিয়ারিং সমস্যা।'
তিনি আরও যোগ করেন, কোনো এআই কোম্পানির প্রধান যদি যেকোনো মুহূর্তে তাঁর পণ্যের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগেন, তবে তাঁর উচিত সেটি বাজারে না ছাড়া।
হুয়াং বলেন, 'এটি খুবই স্বাভাবিক একটি কাজ। যত দ্রুত সম্ভব কাজ করুন, কিন্তু যদি যেকোনো মুহূর্তে আপনার মনে হয় প্রতিষ্ঠান আর নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে বিরতি নিন।'
শিল্প খাতের কিছু ব্যক্তিত্ব যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এআই নিয়ে নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া এসব ভয় আসলে অতিরঞ্জিত এবং এই শিল্পের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ বা 'হাইপ' তৈরির জন্যই এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
সম্মেলন চলাকালীন অল্টম্যান কয়েক শ ব্যবসায়ীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। তিনি তাঁদের বলেন যে, কাজের সুবিধার্থে তাঁদের এআই টুল ব্যবহার করা উচিত, পাশাপাশি এআই-চালিত সম্ভাব্য সাইবার হামলা থেকে নিজেদের ব্যবসা রক্ষা করতেও তাঁদের এই প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে।
তবে এআই নির্বাহীদের সম্পূর্ণ নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে ছেড়ে দেওয়ার এই ধারণাটি এই শিল্পেরই অনেকের কাছে একটি খারাপ আইডিয়া বলে মনে হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের নির্বাহী ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক গত সোমবার বিবিসিকে বলেন, এআইকে একটি 'সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন শিল্প' হিসেবে ফেলে রাখা মানে হলো 'বিশাল ঝুঁকির মুখে পাশা খেলা'।
এআই শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ ইয়ান লেকুনের নেতৃত্বাধীন লজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা প্যাট্রিক হিলম্যান মঙ্গলবার উল্লেখ করেন যে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মানুষের কল্যাণে সত্যিই কোনো কাজ করবে—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা তলানিতে।
হিলম্যান বলেন, 'আজকাল ওয়াশিংটনের চেয়ে আমেরিকানরা যদি কোনো প্রতিষ্ঠানকে কম বিশ্বাস করে, তবে সেটি হলো সিলিকন ভ্যালি। আমি উভয় জায়গাতেই কাজ করেছি এবং বসবাস করেছি; আমি আপনাদের আশ্বস্ত করে বলছি, উভয়েই মানুষের এই অবিশ্বাস পুরোপুরি অর্জন করেছে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আপনারা যা তৈরি করছেন তা যদি সত্যিই বিপজ্জনক মনে করেন, তবে তা ঠেকাতে আপনারা ঠিক কোন কাজটি করা বন্ধ করতে প্রস্তুত, সেটি আমাদের প্রমাণ করে দেখান।'
ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকের নেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা সম্প্রতি নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি শিল্পব্যাপী সর্বসম্মত চুক্তির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ শুরু করেছেন।
মঙ্গলবার সম্মেলনে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতে আমোদেই বলেন, এআই সরঞ্জাম এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও ভালো নিরাপত্তা মানদণ্ড ও যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করার বিষয়ে অ্যানথ্রপিক এখন 'শিল্পের বাকি অংশীদারদের সঙ্গে সংলাপে' রয়েছে।
তিনি আরও বলেন যে, এআই বুমের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এই প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, বরং এর সামগ্রিক প্রভাব।
আমোদেই বলেন, 'আমরা বুঝতে পারিনি যে এর ফলে কোম্পানিগুলো এত দ্রুত বড় হয়ে উঠবে এবং কত দ্রুত এগুলো সবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।'
ওপেনএআই-এর নির্বাহী ক্রিস লেহেন গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন যে, কোম্পানিটি 'সরকারি সহায়তা থাকুক বা না থাকুক, উন্নত এআই মানদণ্ড প্রণয়নে এখন থেকেই একটি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ গড়ে তুলতে' অন্যান্য এআই ল্যাবের সাথে কাজ করছে। এই ল্যাবগুলোর মধ্যে অ্যানথ্রপিক এবং গুগল ডিপমাইন্ডও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লেহেন লেখেন, 'ঝুঁকি যখন এত বেশি, তখন নিখুঁত হওয়ার তাড়নায় আমরা বাস্তব অগ্রগতিকে নষ্ট হতে দিতে পারি না।'
