সৌদির গুরুত্বপূর্ণ এক পাইপলাইন বন্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামে সর্বকালের নতুন রেকর্ড
সৌদি আরবের একটি কৌশলগত জ্বালানি পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণা এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর আজ সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।
এদিন আন্তর্জাতিক তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি সর্বোচ্চ ১০৮ ডলারে পৌঁছে যায়, আর মার্কিন অপরিশোধিত তেলের (ইউএস ক্রুড) দাম ব্যারেল প্রতি ১০৩ ডলার স্পর্শ করে।
সৌদি আরবের 'ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন'-এ সাম্প্রতিক হামলার পর তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল তলানিতে নেমে আসায়—বিকল্প পথ হিসেবে জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে এই পাইপলাইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল সবেমাত্র দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছিল।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, "সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।" তবে পাইপলাইনটি কবে নাগাদ পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু স্পষ্ট করেনি। ঠিক এমন এক সময়ে এই হামলার ঘটনা ঘটল, যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ব্যাপক সামরিক সাফল্য পেয়ে বিশ্ববাণিজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে।
বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়ে হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত বিষয়ে ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রোববার বিকেলে স্থগিত করা হয়। পরে আজ এটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে এই বৈঠকটি "সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের স্বার্থে" পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তেহরান অবশ্য জানিয়েছে, রিয়াদের অনুরোধেই বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতি নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে। সামুদ্রিক বাণিজ্যের তথ্য প্রদানকারী সংস্থা 'মেরিন ট্রাফিক'-এর উপাত্ত অনুসারে, রোববার মাত্র ১৪টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর আগে শনিবার ১২টি, শুক্রবার ১১টি এবং বৃহস্পতিবার মাত্র ৯টি জাহাজ সেখান দিয়ে পারাপার হয়েছিল।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পেট্রোলিয়ামের খুচরা দামও হু হু করে বাড়ছে। আমেরিকার অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন উচ্চমানের অটোমোবাইলের জ্বালানি তেল (অকটেন লেভেল ৮৭ সমৃদ্ধ) গড় খুচরা দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৩১ ডলারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ জ্বালানি তেলের গড় দাম ৪৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত তেলের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম সর্বকালের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। আমেরিকার অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার দেশটিতে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম বেড়ে ৬.২৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।
পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক, পণ্যবাহী জাহাজ থেকে শুরু করে রেল পরিবহন—সব ধরনের বাণিজ্যিক পরিবহনে ডিজেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিজেলের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি যেকোনো পণ্যের চূড়ান্ত দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
সম্প্রতি এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির প্রধান অর্থনীতিবিদ ডায়ান সোয়াঙ্ক বলেন, "ডিজেলের বর্ধিত খরচের প্রভাব বাজারের প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর গিয়ে পড়ে।"
