গণিতের বড় এক আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন এই গণিতবিদ, এরপরই কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিল এআই
ট্রিস্টান বাকমাস্টার ভেবেছিলেন তিনি তার গণিত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক তখনই তিনি জানতে পারেন যে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইও একই সমস্যার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং তারাও এটি সমাধানের জন্য ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করেছে।
গত মাসে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বাকমাস্টার এবং অ্যানথ্রপিকের গণিতবিদ লেভেন্ট আলপোজে ব্যক্তিগতভাবে গণিতের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নগুলোর একটি—'নাভিয়ার-স্টোকস' সমস্যার সমাধানে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছিলেন। তাদের আশা ছিল, তাদের এই ভাবনাকে হয়তো আর মাত্র এক মাসের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধানে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
যেহেতু নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি গণিতকে এগিয়ে নেওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত 'মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমস'-এর অন্যতম একটি ছিল, তাই এর একটি যাচাইকৃত সমাধানের জন্য 'ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট' থেকে ১০ লাখ ডলারের পুরস্কার মিলত এবং তা যেকোনো গবেষককে রাতারাতি গণিত জগতের এক বৈশ্বিক তারকায় পরিণত করত। এটি ছিল এক রোমাঞ্চকর সম্ভাবনা।
কিন্তু বাকমাস্টার ও আলপোজে যখন তাদের প্রাপ্ত ফলাফলগুলো গুছিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই ওপেনএআই-এর গবেষকরা অমীমাংসিত ছয়টি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যা সমাধানের জন্য একঝাঁক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই 'এজেন্ট' মাঠে নামিয়ে দেন। মাত্র কয়েক দিনের কাজ এবং ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালনকারী স্বাধীনভাবে চিন্তাশীল এআই এজেন্টদের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ বার্তা আদান-প্রদানের পর, গত মঙ্গলবার ওপেনএআই ঘোষণা করে যে নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।
এটি এমন এক অর্জন ছিল যা নিয়ে কোম্পানিটি আত্মম্ভরিতা প্রকাশের কোনো কমতি রাখেনি। তারা বর্তমানে শেয়ারবাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নিজেদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রপিককে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মিলেনিয়াম প্রাইজের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য ওপেনএআই-এর এই দৌড় মূলত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি গুঞ্জন থেকে শুরু হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে অ্যানথ্রপিক নাকি ইতিমধ্যে এগুলোর অন্তত একটি সমাধান করে ফেলেছে।
এই ঘোষণার পর ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, 'ওপেনএআই-এর ইতিহাসে আমার জন্য সবচেয়ে আশ্চর্যজনক মুহূর্তগুলোর একটি ছিল গত সপ্তাহে এর বাস্তব রূপ দেখা।'
এবং সামনে হয়তো আরও চমক আসছে।
ওপেনএআই-এর মুখপাত্র লরেন্স ফুকোনেট বলেন, 'নাভিয়ার-স্টোকস সম্পন্ন করার পর থেকে আমরা আরেকটি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। আমরা কীভাবে চিন্তাশীলভাবে এই ফলাফলগুলো সবার সাথে শেয়ার করব তা নিয়ে কাজ করছি।'
এদিকে বাকমাস্টার এবং আলপোজে-কে এক চরম হতাশার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে বাকমাস্টার স্বীকার করেছেন, তিনি মিলেনিয়াম প্রাইজকে অনেকটা তার 'পথপ্রদর্শক' বা 'লক্ষ্যনির্দেশক' হিসেবে ভাবতেন। তিনি যোগ করেন: 'আমার মনে হয় মানুষ বিষয়টিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যেন নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যা সমাধান করাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। বিষয়টি মোটেও তা ছিল না... আমি কেবল এই ইতিহাসের অংশ হতে চেয়েছিলাম।'
এটি অবশ্য পুরোপুরি মানুষ বনাম যন্ত্রের লড়াইয়ের কোনো গল্প নয়—যেমনটি ১৯৯০-এর দশকে দাবাড়ু গ্যারি কাসপারভকে হারিয়ে দিয়েছিল আইবিএম-এর কম্পিউটার 'ডিপ ব্লু'।
বাকমাস্টার এবং আলপোজে তাদের গবেষণার গতি বাড়াতে নিজেরাও এআই মডেলের সাহায্য নিচ্ছিলেন। বাকমাস্টার তার গবেষণা তহবিল থেকে অর্থ দিয়ে চ্যাটজিপিটি এবং ক্লডের বাণিজ্যিকভাবে উপলব্ধ সংস্করণগুলোর সাহায্য নিয়েছিলেন, আর আলপোজে কাজ করছিলেন অ্যানথ্রপিকের অভ্যন্তরীণ মডেলগুলো দিয়ে, যা একজন কর্মী হিসেবে তার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
বাকমাস্টার বলেন, মডেলগুলো যেভাবে তাদের মানবীয় দক্ষতাকে ছাড়িয়ে গেছে এবং গোটা বিশ্বকে যেভাবে 'গণিতের আসল অর্থ কী তা নতুন করে পুনর্বিবেচনা করার' দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাতে তারা কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়েছিলেন।
এরপরই ওপেনএআই-এর এই ঘোষণা প্রশ্ন তোলে যে, এটি কি আসলে মানুষের কাছ থেকে যন্ত্রের কোনো কিছু চুরি করার ঘটনা? বাকমাস্টার প্রকাশ্যে এই ধারণার কথা তোলেন যে, তিনি যখন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন ওপেনএআই-এর মডেলগুলো হয়তো অন্যায্যভাবে তার ব্যবহৃত ইনপুটগুলোতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল।
ওপেনএআই এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। ফুকোনেট বলেন, 'তদন্তের পর আমরা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে গত ৩ জুলাইয়ের পর কোনো ব্যবহারকারীর ইনপুট কোনোভাবেই এই সিস্টেমকে প্রভাবিত করতে পারেনি।'
তবে এই ঘটনা সিলিকন ভ্যালির দ্রুত ফলাফল ও প্রচারণার ওপর জোর দেওয়া সংস্কৃতির সঙ্গে তাত্ত্বিক গণিতের ধীরস্থির ও সহযোগিতামূলক গবেষণার পদ্ধতির পার্থক্যকে সামনে এনেছে।
ওপেনএআই-এর বাইরের গণিতবিদরা এখনও প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ১৬৬ পৃষ্ঠার অত্যন্ত ঘন ও জটিল সমাধানটি বোঝার চেষ্টা করছেন।
কোম্পানিটির কিছু কর্মী গণিতবিদ হলেও, তাদের কারও নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যার ওপর উচ্চতর গবেষণা পর্যায়ের কোনো দক্ষতা ছিল না। যার ফলে ওপেনএআই-এর গবেষক সেবাস্তিয়ান বুবেকের মতে, তারা 'এর গাণিতিক বিষয়বস্তুতে অর্থপূর্ণ কোনো অবদান রাখতে পারেননি।' ওপেনএআই মূলত একটি প্রোগ্রামিং ভাষার মাধ্যমে এর যুক্তির প্রতিটি ধাপ যাচাই করে সমাধানটির সঠিকতা নিশ্চিত করেছে।
অনেক গণিতবিদের কাছে কোনো সমাধানের সঠিকতার মতোই এর অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝাটা অত্যন্ত মূল্যবান। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির নাভিয়ার-স্টোকস বিশেষজ্ঞ হাভিয়ের গোমেজ-সেরানো বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এত বড় একটি ফলাফল প্রকাশ করতে এবং উপস্থাপনা ও আনুষ্ঠানিক গবেষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে তা সবার বোঝার উপযোগী হতে এক বা দুই বছর সময় লেগে যেত। ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট কোনো সমাধান তখনই বিবেচনা করে, যখন তা কোনো জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার পর অন্তত দুই বছর অতিবাহিত হয় এবং বৈশ্বিক গণিত সম্প্রদায়ের কাছে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।
গোমেজ-সেরানো ওপেনএআই-এর সমাধানটি পড়ার চেষ্টা করছেন এবং তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় না গণিত সমাজ এই খসড়াটি যেভাবে আছে সেভাবেই গ্রহণ করবে। এটি সম্পূর্ণ অবোধ্য।'
অ্যাকাডেমিক দুনিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ, এবং মানুষ একে অপরকে গবেষণার নতুন আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত পেছনে ফেলে দিচ্ছে। তবে একটি এআই কোম্পানির এই প্রতিযোগিতায় প্রবেশ বিষয়গুলোকে জটিল করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন বাকমাস্টার।
তিনি বলেন, 'এআই এবং গণিতের সতর্কবার্তা—এটাই ছিল আমার মূল গল্প। আর এখন গল্পটি হয়ে দাঁড়িয়েছে: এআই কোম্পানিগুলোর পক্ষে তাদের গ্রাহকদের আবিষ্কার এভাবে ছিনিয়ে নেওয়া কি আদৌ নৈতিক?'
অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে ওঠা বাকমাস্টার জানান, নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটির গভীর অর্থ পুরোপুরি বোঝার আগেই তিনি এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। জেমস গ্লেইকের লেখা জনপ্রিয় বিজ্ঞান বই 'কেয়স: মেকিং এ নিউ সায়েন্স' পড়ে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যেখানে বাটারফ্লাই ইফেক্ট এবং প্রকৃতির নানা অনিশ্চিত ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, 'তরল পদার্থ নিয়ে গবেষণা করাই ছিল সবসময় আমার উদ্দেশ্য। সাগরে থাকলেই আমি সবচেয়ে বেশি শান্তি অনুভব করি।' কিছুটা হেসে তিনি আরও যোগ করেন, 'সহজ কথায়, তরল বা ফ্লুইডের প্রতি আমার এক ধরনের গভীর নেশা রয়েছে।'
১৯ শতকে পানি বা বাতাসের মতো তরল পদার্থের প্রবাহের গাণিতিক মডেল তৈরির জন্য নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণগুলো তৈরি করা হয়েছিল। যা আবহাওয়া, সমুদ্রের স্রোত এবং বিমানের ডানার ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। কিন্তু সমীকরণগুলোর সমাধান করা অত্যন্ত জটিল; এতে তরলের চাপ এবং ঘনত্ব বা সান্দ্রতার (ভিসকোসিটি) মতো বিষয়গুলো জড়িত থাকে। গণিতবিদরা নিশ্চিত ছিলেন না যে এই সমীকরণগুলোর সবসময় কোনো বাস্তবিক সমাধান থাকবে, নাকি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে এই সমীকরণগুলো আর কাজ করে না।
বহু বছর ধরে বাকমাস্টার গণিতের ভাষায় যেটিকে 'ব্লোআপ' বলা হয়, সেটি খুঁজছিলেন। এটি এমন একটি অসম্ভব পরিস্থিতি যেখানে সমীকরণ অনুযায়ী একটি তরল পদার্থ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অসীম গতি অর্জন করে। যেমন কফির কাপে ক্রিমের ঘূর্ণি—আপনি যদি যথেষ্ট সময় অপেক্ষা করেন তবে তা অসীম দ্রুত গতিতে ঘুরতে থাকবে।
বাকমাস্টার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপযোগিতা অন্বেষণ করতে দারুণ আগ্রহী ছিলেন। তিনি নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের সহজ সংস্করণগুলোতে সম্ভাব্য 'ব্লোআপ' খুঁজে পেতে ডিপ লার্নিং টুলগুলো সফলভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যার মধ্যে ২০২৫ সালে গুগল ডিপমাইন্ডের সাথে যৌথ একটি কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এরপর গত সেপ্টেম্বরে আলপোজে প্রস্তাব করেন যে তিনি এবং বাকমাস্টার এআই-এর সহায়তায় নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি সমাধানের জন্য একযোগে কাজ করবেন।
আলপোজে বাকমাস্টারকে ইমেইলে লিখেছিলেন, 'মূলত আদর্শিক কারণেই আমি এমন একটি বিশ্বকে ভয় পাই যেখানে বড় বড় কর্পোরেশনগুলো খাঁটি গণিতের গভীর কাজের কৃতিত্ব দাবি করবে। এবং যেহেতু আমার মনে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে কেবল একটি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যারই সমাধান হতে যাচ্ছে, তাই আমি আপনাকে হুট করে ইমেইল করে জানতে চেয়েছিলাম যে আপনি প্রথাগত গাণিতিক উপায়ে সমস্যাটি নিয়ে কাজ করার কথা ভেবেছেন কি না।'
আলপোজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই কাজে যুক্ত হয়েছিলেন।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই জুটি অয়লার সমীকরণের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত 'ব্লোআপ' খুঁজে পেতে সক্ষম হন। এটি তরলের একটি সম্পর্কিত সমীকরণ যাতে নাভিয়ার-স্টোকসের কঠিন সান্দ্রতার অংশটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু এআই-এর তৈরি করা প্রাথমিক প্রমাণটি ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। বাকমাস্টার পরবর্তীতে অনলাইনে লিখেছিলেন, এটি ছিল 'আমার পড়া সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়গুলোর একটি।' গবেষকদ্বয় কয়েক সপ্তাহ ধরে এটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে অ্যানথ্রপিক হয়তো এক বা দুটি মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে।
গণিতের প্রতি এআই কোম্পানিগুলোর আগ্রহের নানাবিধ কারণ রয়েছে। কিছু এআই গবেষক গণিতবিদ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এবং উন্মুক্ত গাণিতিক প্রশ্নে তাদের এআই মডেলগুলোর পরীক্ষা চালাতে আগ্রহী ছিলেন। এআই মডেলগুলোর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা মূল্যায়ন ও প্রদর্শনের জন্যও গণিত একটি সুবিধাজনক মাধ্যম। কিন্তু মিলেনিয়াম প্রাইজের সমস্যাগুলো এআই সিস্টেমের দ্বারা ইতিপূর্বে সমাধান করা যেকোনো সমস্যার চেয়ে বহুগুণ বড়, আর তাই নিজেদের প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য কোম্পানিগুলোর কাছে এই সমস্যাগুলো এক প্রকার রত্ন হয়ে উঠেছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই তাদের একটি অপ্রকাশিত মডেল থেকে তৈরি এজেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে মিলেনিয়াম প্রাইজের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর পাশাপাশি কিছু ছোটখাটো সম্পর্কিত প্রশ্নে ব্যাপক কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়।
অয়লার সমীকরণের একটি 'ব্লোআপ'-এ পৌঁছাতে তাদের প্রায় ৫০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল এবং ১০০টি এজেন্ট সমন্বিতভাবে কাজ করেছিল। যা বাকমাস্টার এবং আলপোজের মতো হলেও এক ধাপ এগিয়ে ছিল, কারণ এতে তরলে কোনো বাহ্যিক শক্তি যোগ করার ওপর নির্ভর করতে হয়নি।
সেই ফলাফলের পর কোম্পানিটি সম্পূর্ণ নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি সমাধানের দিকে তাদের সমস্ত মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ধাপে প্রায় ১০ হাজার এজেন্ট যুক্ত ছিল। তারা প্রায় ৮৮ ঘণ্টা বা প্রায় চার দিন কাজ করেছিল। এবং ৫ সেপ্টেম্বর তারা একটি সমাধানে পৌঁছায়। তাদের সমাধানটি সঠিক কি না তা যাচাই করতে আরও ১৭ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এর মাধ্যমেই এআই মানুষের গণিত সমাজ এবং বাকমাস্টার ও আলপোজে-কে হারিয়ে দিয়ে আগেভাগে সমাধান বের করে ফেলে।
যদিও এই সবকিছু অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ঘটেছিল, তবুও পুরো প্রচেষ্টাটি ছিল বিশাল: প্রায় ৩০০ বিলিয়ন টোকেনের এআই-উৎপাদিত আউটপুট, যা ইংরেজি উইকিপিডিয়ার সমস্ত তথ্যের প্রায় ৪০টি কপির সমান। তাদের সবচেয়ে উন্নত বাণিজ্যিক মডেল 'অ্যাস্ট্রা'র মূল্যে হিসাব করলে, এত পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতার পেছনে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার খরচ হতে পারে।
কোম্পানিটি অবশ্য জানিয়েছে যে তারা পুরস্কারের অর্থ দাবি করার কোনো ইচ্ছা রাখে না।
বাকমাস্টারই প্রথম ওপেনএআই-এর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং ৩ সেপ্টেম্বর যখন কোম্পানিটির এআই এজেন্টরা কাজ করছিল, তখন তিনি একটি ইমেইল পাঠিয়ে জানতে চান আসলে কী ঘটছে।
চার দিন পর ওপেনএআই-এর গবেষক বুবেকের সাথে তার দেখা হয়, যিনি ততক্ষণে এজেন্টদের ফলাফল সংক্রান্ত খবর শেয়ার করার মতো অবস্থায় ছিলেন।
বুবেক পরামর্শ দিয়েছিলেন যে বাকমাস্টার এখনো তার বিজয়ের কৃতিত্ব নিতে পারেন—হয়তো ওপেনএআই-এর কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের সম্পূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করে, অথবা ওপেনএআই-এর ফলাফলের প্রধান লেখক হিসেবে কাজ করে।
তবে সেখানে একটি সমস্যা ছিল: অ্যানথ্রপিকের সাথে আলপোজের সম্পৃক্ততা।
বুবেক পরবর্তীতে সামাজিক মাধ্যমে বলেন যে কাউকে কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না, কিন্তু একজন প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির কর্মী কীভাবে ওপেনএআই-এর কাজের সহ-লেখক হতে পারেন বা তাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পেতে পারেন, তা তিনি বুঝতে পারছিলেন না।
সেই আলোচনার স্মৃতিচারণ করে বাকমাস্টার পরবর্তীতে দ্য পোস্টকে বলেন যে তিনি কোনোভাবেই 'লেভেন্টকে বিপদে ফেলতে' রাজি ছিলেন না, আর এর ফলেই ওপেনএআই-এর সাথে সমন্বয় পুরোপুরি ভেঙে যায়।
লেবার ডে-র মধ্যরাতের কাছাকাছি সময়ে বাকমাস্টার আলপোজের সাথে তার প্রাপ্ত ফলাফলগুলো নিয়ে একটি গবেষণাপত্র পোস্ট করেন এবং ঘটনার পুরো বিবরণ তুলে ধরে একটি দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেন। পরদিন সকালেই ওপেনএআই তাদের নিজস্ব ফলাফলের ঘোষণা দেয়।
কোনো মানব গবেষক যদি এই মিলেনিয়াম প্রাইজ সমস্যার সমাধান করতেন, তবে তাত্ত্বিক গণিত মহলে হয়তো কিছুটা পেশাগত ঈর্ষা থাকত, তবে সেখানে ব্যাপক উদযাপনের আমেজও থাকত।
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা মেনে নিতে পারেননি শীর্ষ গণিতবিদেরা। গত শুক্রবার তারা একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করে যুক্তি দিয়েছেন যে 'এআই কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য এবং গণিত সম্প্রদায়ের লক্ষ্য একে অপরের সাথে মারাত্মকভাবে সাংঘর্ষিক।'
ইউসিএলএ-এর বিশিষ্ট গণিতবিদ টেরেন্স তাও সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন: 'আমরা এখন দেখলাম যে কারো কোনো সমস্যা নিয়ে কাজ করার স্রেফ একটি গুঞ্জনও ব্যাপক পরিমাণ এআই-চালিত প্রচেষ্টাকে উসকে দিতে পারে, যাতে মূল গবেষণা প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনায় পৌঁছানোর আগেই তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। এই প্রবণতা হয়তো এখন এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দেবে যেখানে গবেষকেরা আর তাদের প্রতিশ্রুতিশীল গবেষণার দিকগুলো বৃহত্তর সমাজের সাথে শেয়ার করবেন না। আর এটি মুক্ত বিজ্ঞানের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যকে পুরোপুরি উল্টে দেবে এবং এই বিষয়ের ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি অপূরণীয় ক্ষতি করবে।'
বাকমাস্টারের মতে, ওপেনএআই-এর এই উদযাপনে হারিয়ে গেছে সেইসব রক্তমাংসের গণিতবিদদের অবদান, যাঁরা তাত্ত্বিক ধারণার পাহাড় গড়ে নাভিয়ার-স্টোকসের সমাধানের পথ সুগম করেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে দুই স্প্যানিশ গণিতবিদ দিয়েগো কর্দোবা এবং লুইস মার্তিনেজ-জোরোয়াকে কৃতিত্ব দেন, যাঁরা জোরপূর্বক ব্লোআপের কিছু কৌশল তৈরি করেছিলেন। সেই গবেষণার পথগুলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে কেউ হয়তো 'আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই' এর সমাধান করে ফেলতে পারত বলে এক সাক্ষাৎকারে জানান মার্তিনেজ-জোরোয়া।
বাকমাস্টারের মনে আরেকটি গভীর সন্দেহ রয়েছে: তার ডেটা প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া সত্ত্বেও ওপেনএআই-এর মডেলগুলো হয়তো তার করা কাজের কিছু অংশের তথ্য দেখতে পেয়েছিল। তিনি বলেন, এআই এজেন্টরা 'ঠিক পরবর্তী সেই পদক্ষেপটিই গ্রহণ করেছে' যা তিনি এবং তার সহকর্মী নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন—সমীকরণে কোনো বাহ্যিক শক্তি যোগ না করেই সফল হওয়া।
ওপেনএআই শুরুতে বলেছিল যে তাদের গবেষক এবং এআই এজেন্টরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যবহারকারীর ডেটা অ্যাক্সেস করেনি এবং বাকমাস্টারের ফলাফল প্রকাশ্যে আসার আগে তারা তা দেখেনি।
বাকমাস্টারের এই অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়ের মুখে কোম্পানিটি তখন বলেছিল যে তাদের পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি নামপরিচয়হীন ডেটা তাদের মডেলগুলোকে উন্নত করতে সাহায্য করেছে কি না, তা তারা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করে দিতে পারছে না।
তবে তদন্তের পর ওপেনএআই দাবি করে যে বাকমাস্টারের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া গেছে। মুখপাত্র ফুকোনেট বলেন, 'আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে গত দুই মাসে ড. বাকমাস্টারের কোডেক্স প্রম্পটগুলো কোনোভাবেই সিস্টেম বা প্রশিক্ষণকে প্রভাবিত করেনি।'
এর উত্তরে বাকমাস্টার কেবল একটি কথাই বলেছেন: 'আমি তাদের বিশ্বাস করি না।'
