তীব্র গরমে ইউরোপের অন্যতম বড় শহরে দেবে যাচ্ছে ভবন, দেখা দিচ্ছে ফাটল
চলতি গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহে লন্ডনের জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখন নিজেদের বাড়িঘরে অদ্ভুত সব পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। হঠাৎ করেই ঘরের দেয়ালে আঁকাবাঁকা ফাটল দেখা দিচ্ছে, দরজা আটকে যাচ্ছে এবং জানালার ফ্রেম বেঁকে যাচ্ছে।
যে দেশের অবকাঠামো এমন তীব্র গরমের উপযোগী করে গড়ে ওঠেনি, সেখানে অতিরিক্ত তাপমাত্রা নানা সংকট ডেকে আনছে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বেঁকে যাচ্ছে রেললাইন এবং এমনকি বাড়িঘরও মাটির নিচে দেবে যাচ্ছে।
লন্ডনসহ দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকা বর্তমানে মাটি দেবে যাওয়া সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অস্বাভাবিক গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া এই পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। তীব্র তাপদাহে শহরের মাটি শুকিয়ে সংকুচিত হচ্ছে এবং সরে যাচ্ছে, যার টানে ভবনগুলোও নিচের দিকে বসে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (বিজিএস) একজন মুখপাত্র বলেন, 'বর্তমানে যুক্তরাজ্যে মাটি দেবে যাওয়া অন্যতম মারাত্মক ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির একটি।'
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যেভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো অব্যাহত রেখেছে এবং বিশ্বকে উষ্ণ করে তুলছে, তাতে এই সমস্যা আগামীতে আরও খারাপের দিকেই যাবে।
যুক্তরাজ্যের অনেক অঞ্চলের মতোই লন্ডন মূলত কাদামাটির ওপর গড়ে উঠেছে। ভেজা অবস্থায় এই মাটি স্পঞ্জের মতো পানি শুষে নিয়ে ফুলে ওঠে, আবার গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় আর্দ্রতা হারিয়ে সংকুচিত হয়ে যায়। ভূতাত্ত্বিক এই প্রক্রিয়াটি 'সংকোচন-প্রসারণ' নামে পরিচিত। ভবনের ভিত্তির নিচের মাটি যদি অসমভাবে সংকুচিত হয়, তখনই মূলত ভূমি বা অবকাঠামো দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
লন্ডন শহরটি বিশেষভাবে এ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ, শহরটির নিচে থাকা কাদামাটিতে এমন কিছু সম্প্রসারণশীল খনিজ রয়েছে, যা আর্দ্রতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত রূপ বদলায়। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখিও হতে হয় এই শহরকেই।
এর পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে গাছপালা। অতিরিক্ত গরমে উদ্ভিদের শিকড় পানির সন্ধানে মাটির অনেক গভীর ও দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় শিকড়গুলো নিকটবর্তী বাড়িঘরের নিচের আর্দ্র মাটির দিকে চলে যায় এবং পানি শুষে নেয়। ফলে সেই অংশের মাটি শুকিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সাধারণত পুরোনো বাড়িগুলোর ভিত্তি কম গভীর হওয়ায় সেগুলো দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে। আর লন্ডনের অর্ধেকেরও বেশি ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে ১৯৪৫ সালের আগে।
ব্রিটিশ বিমা কোম্পানি আভিভার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে লন্ডনের বহু এলাকায় শতভাগ অবকাঠামোই মাটি দেবে যাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকির তালিকায় কেনসিংটন, সিটি অব লন্ডন ও ওয়েস্টমিনস্টারের মতো কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোও রয়েছে।
তবে এ সমস্যাটি কেবল রাজধানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়ছে আরও বিস্তৃত এলাকায়। ভূমি দেবে যাওয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বব গিবসন ৪০ বছর আগে যখন এ পেশায় আসেন, তখন সমস্যাটি মূলত লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল।
'বিল্ডিং অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল কনসালট্যান্টস'-এর পরিচালক গিবসন বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি এখন যুক্তরাজ্যের আরও অনেক অঞ্চলকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।'
গিবসন জানান, যখনই অতিরিক্ত গরম ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল আসে, তখনই মাটি দেবে যাওয়া সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের বিমা দাবি করার হার 'বেড়ে' যায়।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটিশ ইনস্যুরার্স (এবিআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য যখন অস্বাভাবিক তীব্র এক গ্রীষ্মকাল পার করছিল, তখন দেশটির বিমা খাত এ খাতে রেকর্ড ৪১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল; যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল।
তবে সেই রেকর্ডও শিগগিরই ভেঙে যেতে পারে। গিবসন বলেন, 'চলতি বছরটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকটের বছর হিসেবে রূপ নিচ্ছে। কারণ, একাধিক দাবদাহসহ এটি টানা দ্বিতীয় বছরের মতো খরাপ্রবণ এক গ্রীষ্মকাল।'
এবিআই-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাজ্যে মাটি দেবে যাওয়া সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিমাকারীরা ৯৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে। এ সময় প্রতিটি দাবির গড় অঙ্ক রেকর্ড ২৭ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ হাজার ৭০০ ডলারেরও বেশি।
সংস্থাটির সাধারণ বিমা নীতিবিষয়ক ব্যবস্থাপক লুইস ক্লার্ক বলেন, 'চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টজুড়ে যে চরম গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া আমরা দেখেছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী মাসগুলোতে বিমা দাবির সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে।'
এদিকে বিমা কোম্পানি আভিভার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে চলতি বছরেই ক্ষতিপূরণের দাবির সংখ্যা বাড়তে দেখেছে এবং 'উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত না হওয়া পর্যন্ত' এ ধারা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।
মাটি দেবে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক সময় বেশ সূক্ষ্ম এবং ধীরগতির হলেও এটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হতে পারে এবং এর সমাধান করাও বেশ কঠিন।
ওয়েলসের কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের সিনিয়র লেকচারার ব্রুনেলা বালজানো জানান, ভূমি দেবে যাওয়ার ঝুঁকির ক্ষেত্রে দুটি উপাদান বিবেচনা করতে হয়—ভবনের ঝুঁকিপ্রবণতা এবং ঝুঁকিটি নিজে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মাটি দেবে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের পক্ষে কেবল এককভাবে মূল ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়।
বালজানো বলেন, 'আমরা তো আর জলবায়ু পরিবর্তনকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারি না।'
তাই প্রকৌশলীরা মূলত ভবনের কাঠামোর ওপরই মনোযোগ দেন। এসব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে গাছপালা কেটে ফেলা কিংবা ভবনের ভিত্তি থেকে গাছের শিকড় দূরে রাখতে প্রতিবন্ধক দেয়াল তৈরি করা। এ ছাড়া আরও চরম ও ব্যয়বহুল সমাধানের ক্ষেত্রে ভবনের ভিত্তির নিচে কংক্রিট পাম্প করে ভিত্তিকে নতুন করে মজবুত করা হয়।
তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং ক্ষতিপূরণের দাবি বাড়তে থাকায় কিছু বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, বিমাকারীরা হয়তো ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি আর নিতে চাইবে না। বালজানো বলেন, 'আমার মনে হয় এমনটা ঘটা সম্ভব… অদূর ভবিষ্যতে ভূমি দেবে যাওয়ার বিষয়টিকে হয়তো আর বিমার আওতাভুক্তই রাখা হবে না।'
ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (বিজিএস)-এর তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যদি বর্তমান গতিতেই চলতে থাকে, তবে ২০৭০ সালের মধ্যে শুধু লন্ডনেই ২৬ শতাংশের বেশি অবকাঠামো বা বাড়িঘর এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানুষ ইতিমধ্যে বিমা সুবিধা পেতে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানান গিবসন। তিনি বলেন, 'বিমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়ামের অঙ্ক অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিংবা ভূমি দেবে যাওয়া সংক্রান্ত ঝুঁকি নবায়ন করতে চাইছে না।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর ফলে ক্ষতিপূরণ সুবিধা বাতিলের ভয়ে মানুষ বাড়িঘরে ফাটল দেখা দিলেও বিমা কোম্পানিগুলোকে তা জানাতে ভয় পাচ্ছে।
ভূমি দেবে যাওয়ার ঘটনা সাধারণত সরাসরি জীবন-মৃত্যুর সংকট তৈরি করে না। বালজানো বলেন, 'এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ আর সাময়িকভাবে এড়িয়ে চলার মতো বিষয়ের ঠিক মাঝামাঝি এক সীমানায় অবস্থান করে।'
তিনি জানান, সমুদ্রে বাড়িঘর ধসে পড়া, বন্যার তোড়ে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া কিংবা দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার মতো এটি অতটা নাটকীয় নয়।
তবে এটি কেবল সাময়িক বিরক্তির কারণও নয়। ভূমি দেবে যাওয়ার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, বাড়ির আর্থিক মূল্য কমে যেতে পারে, বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে এবং তা মেরামত করতে আকাশচুম্বী খরচ গুনতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের জীবনে উদ্বেগ সৃষ্টিকারী যেসব নীরব সংকট ডেকে আনছে, এটি মূলত তারই আরেকটি অংশ।
