তাপপ্রবাহে বছরে ৩ কোটি চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো: বিশ্বব্যাংক
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ 'ফুল টাইম' (পূর্ণকালীন) চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
'এ লিভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ' শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় আরও ২৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষ যুক্ত হবে। তবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এ অঞ্চলের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখে পড়তে পারেন। বর্তমানে এ সংখ্যা তার চার ভাগের এক ভাগ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তীব্র গরম ইতোমধ্যে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুরা।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, 'দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এর শহরগুলোর ওপর। কিন্তু বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, জীবিকা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।'
তিনি বলেন, 'তাপসহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে গরম থেকে রক্ষা করার বিষয় নয়। এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে ধরে রাখারও বিষয়। এখনই পদক্ষেপ নিলে দেশগুলো আরও সহনশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বসবাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে পারবে।'
প্রতিবেদনটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে চরম তাপপ্রবাহের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে বাড়তি তাপমাত্রা শ্রমিক, ব্যবসা, অবকাঠামো, সরকারি সেবা ও নগর অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, তাপপ্রবাহকে আর মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি নীতি এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়নের সঙ্গে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
প্রতিবেদনে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ, 'হিট অ্যাকশন প্ল্যান' জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের সুরক্ষা, টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা প্রধান জন ওয়ারবারটন বলেন, 'দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চরম তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি একটি উন্নয়ন সংকট, যার মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন।'
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যার সমাধানের অনেক উপায় ইতোমধ্যেই রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে হিট অ্যাকশন প্ল্যান, তাপসহনশীল অবকাঠামো, নগর সবুজায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দক্ষ শীতলীকরণ প্রযুক্তি মানুষের জীবন রক্ষা, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে এসব উদ্যোগ বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত সমন্বয় এবং সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া দ্রুত নগরায়ণের পথে এগোচ্ছে। আজ সরকারগুলো যে সিদ্ধান্ত নেবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে শহরগুলো কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে থাকবে, নাকি বাড়তে থাকা তাপমাত্রার কারণে ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে।
