তীব্র গরমে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতায় ১৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি: বিশ্বব্যাংক
তীব্র গরমের কারণে ২০২৪ সালেই বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতায় আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'এ লিভেবল ফিউচার: প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ' শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি আরও দ্রুত বাড়ে।
এতে আরও বলা হয়, তাপজনিত চাপের কারণে ঢাকায় বছরে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এটি প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার 'ফুল টাইম' (পূর্ণকালীন) চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টার সমান।
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে এ হার বেড়ে মোট বার্ষিক কর্মঘণ্টার ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টার সমান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র গরম বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদনশীলতাও কমিয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত চাপ মোকাবিলা করা না গেলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাকশিল্প ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংক বলেছে, লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে শিল্প খাতকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সহায়তা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি ও পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং উন্নত কর্মপরিবেশে বিনিয়োগে সহায়তার জন্য সরকার ২০১৬ সালে 'গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড' চালু করে। শুরুতে অল্প কয়েকটি কারখানাকে নিয়ে শুরু হলেও এটি পরে পুরো খাতজুড়ে রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করে।
এছাড়া, 'পার্টনারশিপ ফর ক্লিনার টেক্সটাইল' কর্মসূচি এবং টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে আইএফসির সহায়তায় এ উদ্যোগ আরও জোরদার হয়। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ২৭০টিরও বেশি পোশাক কারখানা 'লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন' (লিড) সনদ অর্জন করেছে এবং আরও অনেক কারখানা এ প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ছয় দেশের মধ্যে এ বৃদ্ধির হার ভুটানের (১.৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
এতে আরও বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। পাশাপাশি জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকা শিশুদের খর্বাকৃতির (স্টান্টিং) ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তীব্র গরম দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াটে পৌঁছালেও উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৯৮৮ মেগাওয়াট। এতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়।
এছাড়া, বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় তাপজনিত চাপ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়া নারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তাপপ্রবাহের সময় বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের গৃহভিত্তিক নারী শ্রমিকদের ৬০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৫২ কোটি মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারেন; যা বর্তমান মাত্রার প্রায় চার গুণ।
