ব্যাংকের এমডি-সিইওদের কর্মক্ষমতা ৬ মাস পরপর মূল্যায়ন, অদক্ষ প্রমাণ হলেই অপসারণ
দেশে পরিচালিত তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মক্ষমতা মূল্যায়নে একটি নতুন নির্দেশিকা বা ফ্রেমওয়ার্ক চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই কাঠামোর আওতায়, প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রায় ৩০টি সূচকের ভিত্তিতে তাঁদের পারফরম্যান্স বা কর্মক্ষমতার মূল্যায়ন করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) 'কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস' (কেপিআই) নামক এই কাঠামো জারি করেছে এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের পর্ষদ চেয়ারম্যানদের নতুন এই নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের পরই—পরবর্তী বোর্ড সভায় নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী, পরিকল্পনা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে তা চূড়ান্ত করবেন। যারা বর্তমানে এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম মূল্যায়ন শুরু হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কে মোট পাঁচটি প্রধান খাতে ১০০ শতাংশ নম্বর বণ্টন করা হয়েছে। এরমধ্যে ব্যাংকের সচ্ছলতা ও তারল্যের (সলভেন্সি ও লিকুইডিটি) জন্য ২৫ শতাংশ; সম্পদের গুণগত মান (অ্যাসেট কোয়ালিটি) ২৫ শতাংশ; সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ২৫ শতাংশ; আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণ ১৫ শতাংশ এবং মুনাফাযোগ্যতায় ১০ শতাংশ নম্বর রাখা হয়েছে।
এই পাঁচটি প্রধান খাতের আওতায় প্রায় ৩০টি সুনির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মূলধন ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাত (সিআরএআর); নিট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও (এনএসএফআর); মোট ও নিট খেলাপি ঋণের (এনপিএল) অনুপাত; সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ); নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নিয়মকানুন মেনে চলা (রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স); মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (এএমএল/সিএফটি) কমপ্লায়েন্স এবং কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) ও কৃষি খাতের ঋণ সম্প্রসারণ।
মূল্যায়নে যেসব শীর্ষ নির্বাহী ৭৫ বা তার বেশি নম্বর পাবেন, তাঁদের 'গড় মানের উপরে' (অ্যাবোভ অ্যাভারেজ) হিসেবে গণ্য করা হবে। ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম নম্বরপ্রাপ্তদের 'গড় মানের' (অ্যাভারেজ) এবং ৬৫-এর নিচে নম্বর পাওয়া ব্যাংকপ্রধানদের 'গড় মানের নিচে' (বিলো অ্যাভারেজ) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হবে—যার অর্থ তাঁদের পারফরম্যান্সের অবিলম্বে উন্নতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেসব এমডি ও সিইও ৬৫ শতাংশের নিচে নম্বর পাবেন, তাঁদের সতর্ক করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হলে বা ব্যর্থতা দেখা দিলে—পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁদের পদ থেকেও অপসারণ করা হতে পারে।
এ ছাড়া ফ্রেমওয়ার্কে আরও একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে, যেখানে ছয়টি নির্দিষ্ট বিষয়ে ঘাটতি থাকলে মোট নম্বর থেকে সর্বোচ্চ ৫ নম্বর পর্যন্ত কেটে নেওয়ার বিধান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন নির্বাহী যদি ১০০-এর মধ্যে ৭৫.৫০ নম্বর পান এবং উক্ত ছয়টি বিষয়ের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর নম্বর থেকে ৫.০৮ পয়েন্ট কাটা যাবে এবং তাঁর চূড়ান্ত স্কোর দাঁড়াবে ৭০.৪২।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরও জানান, খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত সূচকগুলোর মধ্যে থাকবে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, মন্দ ঋণের পরিমাণ, খেলাপি ঋণ থেকে বার্ষিক নগদ আদায় এবং অবলোপনকৃত (রাইট-অফ) ঋণের পরিমাণ।
ঋণ ও আমানতের অনুপাত বা এডিআর সংক্রান্ত সূচকে দেখা হবে, ব্যাংকের মোট আমানতের কত অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, নিয়মিত ঋণ আদায় হচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ৮৫% বা ৮৭% সীমার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না।
অন্যদিকে, ঋণ কেন্দ্রীকরণ (কনসেন্ট্রেশন) সূচকের মাধ্যমে দেখা হবে ব্যাংকের বড় অংকের ঋণগুলো শীর্ষ ১০ বা ২০ জন গ্রাহকের পকেটে চলে যাচ্ছে কি না এবং ব্যাংকটি একক গ্রাহক ঋণসীমা (সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট) সঠিকভাবে মেনে চলছে কি না।
এই কাঠামোর আওতায় ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ ও অগ্রাধিকারমূলক খাত—যেমন সিএমএসএমই, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থায়ন (গ্রিন ফাইন্যান্স)—এবং ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা নতুন গ্রাহকদের প্রাতিষ্ঠানিক সেবায় আনার উদ্যোগও মূল্যায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী। তবে মূল্যায়নের সময়সীমা আরও কিছুটা দীর্ঘ হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, "যেকোনো চাকরির জন্য জবাবদিহিতা থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকের এমডিদের জন্য যে ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে, আমি বলব, 'দিস ইজ অ্যা গুড স্টেপ'। তবে প্রতি ছয় মাস অন্তর মূল্যায়ন—এটা খুবই 'আর্লি'। এটা এক বছর মেয়াদি করলে ভালো হয়।"
তিনি আরও বলেন, "অনেক ব্যাংকের এমডিরা চেয়ারম্যানকে সন্তুষ্ট রেখে দীর্ঘমেয়াদি চাকরি করে থাকেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগের সময় তাদের অভিজ্ঞতা দেখে। কিন্তু এখন নির্ধারিত ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে থাকলে ব্যাংক খাতে অনেকটা সুশৃঙ্খলা ফিরে আসবে।"
