বিবাহযোগ্য পাত্রীর তীব্র সংকট: কনের খোঁজে আফ্রিকায় পাড়ি জমাচ্ছেন চীনা পুরুষেরা, হচ্ছেন প্রতারিতও
গত মাসে মাদাগাস্কারের 'ইভাতো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'-এ এক তরুণী মালাগাসি নারী আটক হন। তিনি প্রস্তাবিত একটি বিয়ের উদ্দেশ্যে চীনে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে পুলিশকে উদ্ধৃত করে এমন তথ্য দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনে পৌঁছে এক চীনা পুরুষকে বিয়ে করলে তাকে ১০ মিলিয়ন আরিয়ারি (প্রায় ২,৩০০ মার্কিন ডলার) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ একটি সন্দেহভাজন চক্রের তদন্তে নামে, যারা এ ধরনের বিয়ের বন্দোবস্তের সাথে জড়িত। চারজনকে আটক করা হয় এবং পুলিশ তাদের কাছ থেকে ভুয়া সিল, বিভিন্ন কাগজপত্র ও ১০টি মালাগাসি পাসপোর্ট উদ্ধার করে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই চক্রটির মাধ্যমে ইতোমধ্যেই একাধিক নারী চীনে ভ্রমণ করে থাকতে পারেন। স্বদেশে সঙ্গী বা পাত্রী খুঁজে পেতে সংগ্রাম করা চীনা পুরুষদের জন্য এ ধরনের আয়োজনগুলোকে প্রায়শই সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পুরুষদের বলা হয়, তারা বিদেশে গিয়ে ঘটকালি ফি ও 'কনে মূল্য' পরিশোধ করে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে দেশে ফিরে আসতে পারেন।
তবে সম্প্রতি মালাউই ও মাদাগাস্কার থেকে আসা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে চীনা পুরুষরা প্রতারণা, চাঁদাবাজি এবং অপরাধমূলক তদন্তের মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে, কনে হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নারীরা শিকার হচ্ছেন প্রতারণা, জোর-জুলুম এবং মানব পাচারের।
এ ধরনের ঘটনাবলি চীনা দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করতে বাধ্য করেছে এবং প্রশ্ন তুলেছে—এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, নাকি একটি বিস্তৃত ও উদীয়মান প্রবণতার অংশ?
বেলজিয়ামের 'ইউনিভার্সিটি লিব্রে ডি ব্রাসেলস'-এর নৃতত্ত্বের পিএইচডি গবেষক চাই চেন বলেন, চীনা পুরুষদের বিদেশে কনে খোঁজার দীর্ঘ ইতিহাসে আফ্রিকা একটি তুলনামূলক নতুন গন্তব্য।
সীমান্তপার ঘটকালির এই ধারায় আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পাকিস্তান এবং সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলোর নারীরা যুক্ত ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মিশর, ইথিওপিয়া এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রসহ বিভিন্ন আফ্রিকান দেশেও এমন ঘটনা উদযাপিত হতে দেখা গেছে। চেন বলেন, 'এর একটি বড় বা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো... চীনের বিয়ের পাত্রী সংকট।'
চীনে গ্রামীণ বা সুবিধাবঞ্চিত পটভূমির অনেক পুরুষকেই বিয়ে করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। এর মূল কারণ উচ্চমাত্রার 'চাইলি'—যা বরপক্ষ কনে পক্ষকে প্রদান করে থাকে তাদের অর্থনৈতিক প্রাচুর্য প্রদর্শন ও বিয়ে নিশ্চিত করার জন্য। এছাড়া তাদের নিজস্ব বাড়ি এবং প্রায়শই একটি ব্যক্তিগত গাড়ি থাকার প্রত্যাশাও এর অন্যতম কারণ।
এটি বিশেষ করে সেইসব পুরুষদের জন্য অসুবিধাজনক যাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই কিংবা যাদের চাকরি অনিশ্চিত। এদিকে, যে পুরুষরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও অবিবাহিত রয়ে যান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে বিয়ে করা এবং বংশধারা বজায় রাখার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
চেন বলেন, 'অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক কিছু চীনা পুরুষের কাছে তাই চীনে কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘটকালি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিয়ে করার চেয়ে আফ্রিকায় বিয়ে করাকে অধিক সাশ্রয়ী মনে হতে পারে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও এজেন্সির ফি, পণ এবং অন্যান্য খরচ অনেক বেশি হতে পারে।'
আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষক ওয়েই ওয়াং—যিনি চীনা পুরুষ ও ইথিওপীয় নারীদের মধ্যকার বিয়ে নিয়ে গবেষণা করেছেন তিনি বলেন, বিদেশি স্ত্রী এনে দেওয়ার প্রস্তাব করা এসব সার্ভিস এমন পুরুষদের কাছে একটি "কাল্পনিক ভৌগোলিক সমাধান" বিক্রি করতে পারে, যারা চীনে বিয়ে করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
ওয়াং বলেন, 'নিজের দেশে যে নিজেকে তুলনামূলকভাবে 'অবিবাহযোগ্য' মনে করে, তাকে বলা হতে পারে যে তার জাতীয়তা, আয় কিংবা অর্থ পরিশোধ করার ক্ষমতাই তাকে অন্য কোথাও আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে।'
মাদাগাস্কার বিমানবন্দরের ঘটনার প্রায় এক মাস পর, মালাউইয়ে অবস্থিত চীনা দূতাবাস তার নাগরিকদের "ক্রয়ের মাধ্যমে বিয়ে" বা "স্ত্রী কেনার" ধারণা প্রচারকারী বিজ্ঞাপনগুলোতে বিশ্বাস না করার জন্য সতর্ক করে দেয়।
৭ সেপ্টেম্বর তাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দূতাবাস জানায় যে, সীমান্ত পারাপারের ঘটকালি সার্ভিসগুলোকে বিশ্বাস করে এবং মোটা অঙ্কের পণ দিয়ে সম্প্রতি বেশ কয়েকজন চীনা নাগরিক বিদেশে ম্যারেজ স্ক্যাম বা বিয়ের নামে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তবে এসব ঘটনা কোথায় ঘটেছে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
দূতাবাস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, 'বৈবাহিক সম্পর্ক ক্রয়ের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হলে তা সহজেই মানবপাচার, আর্থিক তোলাবাজি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হুমকির মতো আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।'
চীনা আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বিয়ের ঘটকালি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা অথবা এসব কর্মকাণ্ড থেকে মুনাফা অর্জন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গত বছরের অক্টোবরেও মালাউইয়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায়, যখন চীনা দূতাবাস বলেছিল যে কয়েকজন নাগরিক মধ্যস্থতাকারীদের অর্থ এবং বিয়ের পণ দেওয়ার পর তোলাবাজি ও হুমকির মুখে পড়েছিলেন। দূতাবাস সতর্ক করেছিল যে, এ ধরনের বন্দোবস্তের ফলে মানবপাচার সংক্রান্ত তদন্ত, কারাদণ্ড এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারে।
অন্য আরেক ঘটনায় ২০২৩ সালের মে মাসে, প্রয়োজনীয় ২১ দিন অপেক্ষা না করেই বিয়ের সনদপত্র জোগাড় করার পর দুই স্থানীয় নারীকে নিয়ে দেশ ছাড়ার সময় চীনা দুই পুরুষকে আটক করে মালাউই পুলিশ।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিলেংওয়ের একটি আদালত মানবপাচারের অভিযোগে ওই দুই পুরুষ এবং তাদের একজন চীনা নারী সহযোগীকে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়।
মালাউইয়ের নারীরাও অভিযোগ করেছেন যে, চীনে পৌঁছানোর পর তাদের প্রতারিত করা হয়েছে অথবা জোর করে বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছে।
মালাউইয়ের 'প্ল্যাটফর্ম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম'-এর ২০২৩ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইথেল মোয়ো নামের এক নারীর কথা তুলে ধরা হয়। মোয়ো জানান, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ বা পারিবারিক বিয়ের কথা বলে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তাকে চীনে পাঠানো হয়েছিল।
মোয়োর অভিযোগ, দালালরা তার বয়স বদলে ২৫ বছর বানিয়ে দেয়, তাকে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন বলে দাবি করার নির্দেশ দেয় এবং শানসি প্রদেশে পাঠিয়ে দেয়—যেখানে তিনি ৩৩ বছর বয়সী এক চীনা পুরুষকে বিয়ে করেন। তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে একজন এজেন্ট তাকে ওই বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য চাপ দেন। তবে মোয়োর বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাদাগাস্কারে অবস্থিত চীনা দূতাবাস গত বছরের মার্চে জানায় যে, মালাগাসির জননিরাপত্তা বিষয়ক কর্তৃপক্ষ আন্তঃসীমান্ত বিয়ের সাথে সম্পর্কিত একটি মানবপাচার মামলা উন্মোচন করেছে এবং বেশ কয়েকজন চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করেছে।
ইথিওপিয়া এবং দক্ষিণ চীনের গুয়াংঝুতে ওয়াংয়ের করা গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, এই ধরনের কিছু বিয়ে কোনো অর্থপ্রদেয় ঘটকালির মাধ্যমে নয়, বরং কাজ, অভিবাসন এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল। ওয়াং বলেন, চীনা হলেই যে কোনো পুরুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আকর্ষণীয় স্বামী হয়ে যান না, আর আফ্রিকান নারীরাও চীনকে যে বসবাসের জন্য খুব কাঙ্ক্ষিত জায়গা মনে করেন—বিষয়টি এমন নয়।
চেন বলেন, মালাউই এবং মাদাগাস্কারের ঘটনাগুলোকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, তবে এই ধরনের ঘটনার মাত্রা বাড়িয়ে বলার বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।
চেন বলেন, 'এগুলোকে একটি বিস্তৃত ও নতুনভাবে উদ্ভূত প্রথার অংশ বলে মনে হচ্ছে। তবে দালালদের মাধ্যমে হওয়া বিয়ে—কিংবা এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন নির্যাতনমূলক আচরণ—পুরো আফ্রিকা জুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে দাবি করার মতো পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি এবং এই মন্তব্য করার সময়ও এখনও আসেনি।'
