বিশ্বের নতুন মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাশ, দেখাবে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন
বিশ্ব মানচিত্র থেকে ঐতিহ্যবাহী মারকেটর নকশা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রমান্বয়ে তুলে নিয়ে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন নিখুঁতভাবে প্রদর্শন করে—এমন একটি নতুন মানচিত্র গ্রহণের প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘ।
বিশ্বের প্রচলিত মারকেটর মানচিত্র পর্যায়ক্রমে বাতিল করে আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত আয়তন সঠিকভাবে প্রদর্শন করে—এমন একটি বিশ্ব মানচিত্র প্রকাশের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপনের পর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে ১৬শ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী 'মার্কেটর প্রজেকশন' মানচিত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়ে ২০১৮ সালের অধিকতর নিখুঁত 'ইকুয়াল আর্থ' নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি মানচিত্র গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উক্ত অধিবেশনে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দেয়। দেশটির প্রতিনিধি প্রস্তাবটিকে "অপ্রয়োজনীয়" বলে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া ৬টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।
জাতিসংঘের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে দেশ বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল এই নতুন নকশা ব্যবহারে বাধ্য করা যাবে না কিংবা পুরোনো নকশার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যাবে না। তবে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মার্কেটর নকশার বহুল ব্যবহার বিবেচনায় এই সিদ্ধান্তের ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যক্রম ও নিত্যদিনের প্রযুক্তিতে মানচিত্রের হালনাগাদ পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষে এই প্রস্তাবের মূল নেতৃত্ব দেওয়া দেশ টোগো জানায়, 'এই প্রস্তাবটি এটি স্বীকার ও নিশ্চিত করে যে—অসামঞ্জস্যপূর্ণ মানচিত্র চিত্রায়ন, বিশেষ করে মার্কেটর প্রজেকশনের ফলে সৃষ্ট বৈষম্য মানুষের চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভূরাজনীতি এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে যা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের দৃশ্যমান আকারকে মারাত্মকভাবে ছোট করে উপস্থাপন করতে ভূমিকা রেখেছে।'
প্রস্তাবটি উত্থাপনের উদ্যোগ নেয় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ টোগো। আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪টি সদস্য দেশসহ আরো কয়েকটি দেশ প্রস্তাবটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তবে বিশ্বের কতটি দেশ এতে সমর্থন জানিয়েছে তা জানা যায়নি। টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি এ বিষয়ে বলেন, 'আলোচনাটি রাজনৈতিক নয়, বরং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে উত্থাপিত। বৈজ্ঞানিক সত্য বজায় রাখতে আমাদের সবাইকে বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে হবে।'
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়। তবে, এই প্রস্তাব পাস হলে শিক্ষা পাঠ্যক্রম, বৈশ্বিক মানচিত্র রূপরেখা এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সর্বাধিক ব্যবহৃত মানচিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল প্রায় ৫০০ বছর আগে।
১৫৬৯ সালে ফ্লেনিশ মানচিত্রকর জেরার্ডাস মারকেটর মূলত নাবিকদের সমুদ্র পথের দিকনির্দেশনার সুবিধার জন্য বর্তমানের এই মানচিত্রটি তৈরি করেছিলেন। তবে তার তৈরি এই নকশায় নিরক্ষরেখার কাছের অঞ্চলগুলোকে প্রকৃত আকারের চেয়ে অনেক ছোট দেখা যায় এবং মেরু অঞ্চলের দেশগুলোকে অনেক বড় করে দেখানো হয়।
যেমন প্রচলিত এই মানচিত্রে পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে ইউরোপীয় ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডের সমান দেখানো হয়। অথচ বাস্তবতায় আফ্রিকা মহাদেশ ডেনমার্কের অধীনস্থ এলাকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
চেঞ্জ ডট অর্গ প্ল্যাটফর্মের #কারেক্টদ্যম্যাপ প্রচারমূলক এক অনলাইন আবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পুরো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, মেক্সিকো এবং ইউরোপের বেশিরভাগ অংশকে আফ্রিকার ভেতরে বসিয়ে দেওয়ার পরও সেখানে অনেক ভূখণ্ড খালি পড়ে থাকবে। আবেদনে এরই মধ্যে ১১ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
২০২৫ সালের আগস্টে আফ্রিকান ইউনিয়ন এ আবেদনে সমর্থন জানায় এবং বিষয়টি জাতিসংঘের তোলার জন্য টোগোকে নেতৃত্ব দেওয়ার অনুরোধ করে।ভূগোলবিদ এবং ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমানে প্রচলিত মানচিত্রটির মূলে রয়েছে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক বিশেষজ্ঞ একে 'মানচিত্রবিষয়ক উপনিবেশবাদ' বলে উল্লেখ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রচলিত এই মানচিত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর ভূমিকা ও অবস্থানকে দীর্ঘকাল ধরে খাটো করে রেখেছে।
এর আগে ১৯৭৩ সালে জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স 'গ্যাল-পিটার্স প্রজেকশন'-এর মাধ্যমে একটি বিকল্প মানচিত্র সামনে আনেন। মার্কেটর প্রজেকশনের অন্যতম সমালোচক ছিলেন পিটার্স।
টোগোর নেতৃত্বাধীন প্রচারটি ২০১৮ সালে তৈরি আন্তর্জাতিক মানের 'ইকুয়াল আর্থ' মানচিত্রটি ব্যবহারের জোর দাবি জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক একদল মানচিত্রকারের সমন্বয়ে এই মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। তাদের মতে, এই মানচিত্রটি প্রত্যেক মহাদেশের প্রকৃত আয়তন সুনির্দিষ্টভাবে প্রদর্শন করে।
কিছু বিশ্লেষকও এতে একমত। ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেএস হেল্ডের লন্ডনভিত্তিক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট জেজে ইনোক বলেন, 'মারকেটর প্রজেকশন আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে দৃশ্যত ছোট করে দেখিয়েছে।'
তিনি এই প্রচারকে আফ্রিকান দেশগুলোর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরো বেশি প্রভাব এবং বিশ্বে আফ্রিকাকে কিভাবে উপস্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি আরও বলেন, 'একটি সমান-ক্ষেত্রফলভিত্তিক মানচিত্র গ্রহণ করা… শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য আরও নির্ভুল ভিত্তি তৈরি করবে। একইসঙ্গে আফ্রিকার জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে পুরোনো ও বিকৃত ধারণার মাধ্যমে দেখার প্রবণতাও কমবে।'
গত মার্চ মাসে ঘানার উদ্যোগে দাস ব্যবসাকে 'মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে পাস হয়। এতে ১২৩টি দেশ পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট দেয় তিনটি দেশ এবং ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
ঘানার এই সাফল্য মারকেটর মানচিত্র পরিবর্তনের সমর্থকদেরও আশাবাদী করে। টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডুসি বলেন, 'যারা বলছেন কেন এখন, আমি তাদের বলি, কেন নয়? আমরা যখন বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকাই… আমাদের বয়ান পরিবর্তনের সময় এসেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আফ্রিকায় আমাদের নিজেদের যা পরিবর্তন করা সম্ভব, তা পরিবর্তনের জন্য নিজেদেরই দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে।'
