সৈয়দ মুজতবা আলী ও তাঁর আশ্চর্য দুনিয়া
প্রথম কবে সৈয়দ মুজতবা আলী পড়েছিলাম, আজ আর মনে নাই। সম্ভবত স্কুলে পড়ার সময় কোনো এক ছুটির দিনে 'পঞ্চতন্ত্র' নামের ছেঁড়া মলাটের একটি বই পড়তে পড়তে দুপুর পার করে দিয়েছিলাম। এরপর পড়েছিলাম পাঠ্যবইয়ে। 'রসগোল্লা' গল্পের 'সিন্নোর, বিফোর ইউ প্রসিড' তখন আমাদের মুখে মুখে ফিরত। এরপর আমি আরও বড় হতে থাকি এবং মুজতবা আলীর আশ্চর্য রস ও ভেংচির দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে থাকি। যদিও রস মানে শুধুই রস না। আবার ভেংচিরও ছিল গভীর এক দার্শনিক অবস্থান, যা একেবারেই মুজতবা আলীর নিজস্ব।
আমাদের এই পৃথিবীটা অনেক রকম। বোধের নানা স্তরের ভেতর দিয়ে এই পৃথিবী চালিত হয়। আর বোধের তেমনই এক স্তরে রাজত্ব করেন মুজতবা আলী নামের এক জাদুকর। তবে অন্য স্তরগুলোর সঙ্গে এই স্তরটির বিশেষ পার্থক্যও আছে। এখানে পৃথিবীটা হাস্যরসের, রসিকতার। ওহ, খানিকটা কোমল ও পাণ্ডিত্যেরও বটে। অন্যান্য স্তরের পৃথিবীতে যখন হাঁপিয়ে ওঠি, যখন ক্লান্ত-শ্রান্ত পৃথিবী আমাদের আরও ক্লান্ত করে ফেলে, তখন এই হাস্যরসের আর খানিকটা আনন্দের দিকে হেলানো পৃথিবীতে গিয়ে আমরা আশ্রয় নেই। মূলত পৃথিবীর ছোট ছোট উপস্তরগুলোই দিন শেষে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আশ্রয় দেয়। সন্ধান দেয় একটা ভিন্ন জগতের।
আমার সবচেয়ে পছন্দের লেখকদের একজন ফিওদর দস্তয়েভস্কি। মানুষের মনকে ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে দেখেছেন রুশ এই মায়েস্ত্রো। কিন্তু সেই দস্তয়েভস্কিও কখনো কখনো অসহনীয় হয়ে ওঠে, মস্তিষ্কে তৈরি করে অসহ্য চাপ। আর তখনই নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা নিয়ে হাজির হন একজন মুজতবা আলী।
তবে দস্তয়েভস্কি থেকে মুজতবা আলী পর্যন্ত এই যাত্রাটা একটু জটিল। দুজনের লেখার উদ্দেশ্য ও বিধেয় এক নয়। দুজনের জগৎ একেবারেই আলাদা। পাঠককে তারা বাস্তবতার মুখোমুখি করাতে চান ঠিকই কি একেবারেই ভিন্ন পথে। যেখানে একজনের পথে আরেকজন আগন্তুকও নন। কিন্তু এরপরও তারা অনন্য। তবে এ পথে অনেক সময় মুজতবা আলীকে হালকা মনে করার ভুলও কেউ করতে পারে। কিন্তু বিষয়টা মোটেই তেমন নয়। মূলত দুটি আলাদা আলাদা জগৎ, যেখানে মানুষ নিজ নিজ প্রয়োজনেই ভ্রমণ করে। দুটি জগৎই মানুষের ভিন্ন দুই আশ্রয়।
মুজতবা আলীর হাস্যরসেরও অবশ্য রকমফের আছে। খুব সরলরৈখিক ধারায় সেটা বোঝা যাবে না। বিশেষত কটাক্ষ ও রসিকতাকে মিলিয়ে ফেলার আশঙ্কা তো আছেই। যেমন 'বই কেনা' নামের গদ্যে মুজতবা আলী লিখছেন, 'পৃথিবীর আর সব সভ্য জাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ততই আরব্য-উপন্যাসের এক-চোখা দৈত্যের মতো ঘোঁত ঘোঁত করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই। চোখ বাড়াবার পন্থাটা কী? প্রথমত—বই পড়া, এবং তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।'
'বই কেনা' নামের পুরো লেখাটায় এমন সুরে লেখা। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে মুজতবা আলী যে বার্তাটা দিতে চেয়েছেন, তা কি আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক নয়?
এই একই লেখাটা অবশ্য অন্য কেউ লিখলে হয়তো কাটখোট্টা কিছুই দাঁড়াত। তা মোটেই দোষের নয়। বই পড়া আর কেনা নিয়ে আপনি আর কতটাই সরস গদ্যইবা আপনি লিখতে পারেন! কিন্তু এখানেই মুজতবা আলী অনন্য। তার হাতে পুরো বিষয়টা একেবারে ভিন্নভাবে প্রাণ পাচ্ছে।
'কাইরো' গদ্যটির কথাই ধরা যাক। মুজতবা আলী লিখছেন, 'আমার লেগেছিল কাইরো দেখতে পাক্কা একটি বচ্ছর! অতদিন আপনি থাকবেন না সে আমি জানি। আপনার অতটা সময় লাগবে না—সে কথাও জানি। কারণ আমি কাটিয়েছিলুম প্রথম ছ'টি মাস শুধু আড্ডা মেরে মেরে—বাড়ির ছাতের উপর থেকে পিরামিড স্পষ্ট দেখা যায়, ট্রামে করে হুশ করে সেখানে যেতে কোনওই বাধা নেই, পূর্ণিমার আবার ইস্পিশল সার্ভিস, তৎসত্ত্বেও ছ'টি মাস কেটে গেল এ-কাজে ও-কাজে করে করে, পিরামিড দেখার ফুরসৎ আর হয়ে ওঠে না।'
নিজেকে হালকা করা হয়, এমন ভয়ে এ ধরনের গদ্য সচরাচর কেউ লিখতে চাইবেন না। কিন্তু সে জন্যই মুজতবা আলীর লেখা পড়ার মতো সেগুলোও রসিয়ে রসিয়ে পড়ার আনন্দ পাওয়া যায় না। আর এই প্রসঙ্গে একই লেখার এই লাইনগুলো পড়ানোর লোভ সামলাতে পারছি না, 'সভ্যতা, পিরামিড এ-সব জিনিস নিয়ে অন্য জায়গায় পাণ্ডিত্য ফলাব। "বসুমতী"র পাঠকরা এতদিনে আমাকে বিলক্ষণ চিনে গিয়েছেন, আমার মুখে পাণ্ডিত্যের কথা শুনলে ঠা-ঠা করে হেসে উঠবেন।'
লাইনের পর লাইন উদ্বৃতি দিয়ে লেখাকে বড় ও ভারী করার ইচ্ছে আমার নাই। অনেক পাঠক এটাকে ফাঁকিবাজি মনে করেন। আমার নিজেরও পছন্দের না। আবার একেবারে না দিলেও ঠিক পুরো চিত্র ফুটিয়ে তোলা যায় না। ফলে যতটা সম্ভব কম উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই নিজের অনুভূতিটুকু লেখার চেষ্টা করব।
যা বলছিলাম, মুজতবা আলী আসলে এমনই। আপনি 'চাচা কাহিনী' খুলে বসুন। একটা চরিত্রকে কেন্দ্র করে মুজতবা আলী যেভাবে পেঁয়াজের খোসা ছড়ানোর মতো করে গল্পের পরত খুলতে থাকেন, তা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব। শুধু এই কৌশলটুকু রপ্ত করার লোভে আমি একাধিকবার এই বইটা পড়েছি। অবলীলায় চাচাকে দিয়ে কত কিছু বলিয়ে নিচ্ছেন মুজতবা আলী। এসব কথা কোনো চরিত্রের আশ্রয় না নিয়ে তিনি নিজেও বলতে পারতেন। কিন্তু চাচার মধ্য দিয়ে মুজতবা আলী সেসব বিষয়কে আলাদা দ্যোতনায় হাজির করছেন।
তবে এখানে এসে একটু কনফেশন দেওয়া জরুরি। আমরা স্যাটায়ার বা ব্যাঙ্গাত্মক কিংবা হাস্যরসাত্মক অথবা পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখকের ট্যাগ জুড়ে দিয়ে মুজতবা আলীকে বিশেষ বর্গে ফেলে দিয়েছি। যার ফলে আড়ালে পড়ে যায় তার অসামান্য বৈচিত্র্যময় অনেক লেখা, যা এই রসবোধ ও পাণ্ডিত্যের খানিকটা বাইরে অবস্থান করছে। অনুমতি পেলেই ঢুকবে এমন আর কি! আর তেমন লেখা হিসেবে এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে 'তলস্তয়' শিরোনামের একটা গদ্যের কথা। মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার এই লেখাটি তলস্তয়কে ও তার জগৎকে দারুণভাবে আমাদের সামনে হাজির করেছে।
সেই লেখার কিছু অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি, 'যুদ্ধক্ষেত্রে সমাজে তথা সাহিত্যে সম্পূর্ণতম খ্যাতি অর্জন করার পর তিনি করলেন উনবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত ইউরোপীয় সভ্যতা-বৈদগ্ধ্যের মূলে কুঠারাঘাত। তার অর্থনীতি, সাহিত্য, সমাজ এবং বিশেষ করে ধর্ম—এগুলোর পিছনে যে কত বড় ভণ্ডামি লুকানো রয়েছে, সেটা দেখাতে গিয়ে তিনি যে দার্ঢ্য, মেধা ও কঠোর সত্যনিষ্ঠা দেখালেন, তার সামান্যতম বর্ণনা দেওয়াও আমার পক্ষে অসম্ভব। "ওয়র এন্ড পিস" তিনি লিখেছিলেন হীরার কলম নিয়ে সোনার কালি দিয়ে—আর তাঁর জীবনের এই চরম উপলব্ধি তিনি লিখলেন দধীচির অস্ত্র-নির্মিত দমশ কি তলওয়ার দিয়ে আপন বুকের রক্ত মাখিয়ে। "রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ মহাপাপ" তাঁর এ বাণী "দুঃখবর" সম্প্রদায় মেনে নিয়েছিল এবং বহু দুখবরণ করার পর তলস্তয়েরই সাহায্যে নির্বাসন স্বীকার করে মাতৃভূমি ত্যাগ করে। শেষ পরীক্ষা সেখানে হয়নি।'
তবে যে ভিত্তির ওপর ভর দিয়ে এই সিদ্ধান্তে মুজতবা আলী পৌঁছাচ্ছেন, সেটি আরও চমৎকার। সেসব বিস্তারিত লিখে আমি আর পাঠের মজা নষ্ট করতে চাই না। তবে এটা শুধু একটা দৃষ্টান্ত মাত্র। কোনো এক ছুটির দিনে অলসভাবে মুজতবা আলীর সমগ্র খুলে বসলে এমন অনেক মণিমুক্তার সন্ধান নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে।
তলস্তয়ের কথা বলতে বলতে মনে পড়ে গেল 'হজরত সৈয়দ নিজাম উদ-দীন চিশতি' শিরোনামের লেখাটির কথা। এটি মূলত নিজাম উদ-দীন আউলিয়ার ওরসের আয়োজনকে ঘিরে লেখা। ১৯৫২ সালেরা জানুয়ারিতে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাটির শুরুতে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মুখ দিয়ে নিজাম উদ-দীন আউলিয়ার অসাম্প্রদায়িক অবস্থান ও শান্তির বাণী তুলে ধরেন মুজতবা আলী। এরপর তিনি নিজাম উদ-দীন আউলিয়ার যে পরিচিতমূলক লেখাটি লিখেছেন, সেটি অল্প কথায় সুলতান উল-মাশায়িখখ্যাত মহান এই দরবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে যথেষ্ট। এই লেখা মুজতবা আলীর বৈচিত্র্যময় পথে হেঁটে যাওয়ার সামান্য একটা নিদর্শনও বটে। তবে মুজতবা আলীর রস ও ভ্রমণ-সম্পর্কীয় পরিচয়ের যে এক রৈখিক পাঠের ধারা গড়ে উঠেছে, সেটা ভাঙতেও এসব লেখা সামনে আনা জরুরি।
মুজতবা আলী তাঁর লেখার চেয়ে আলাদা কেউ ছিলেন না। তাঁকে নিয়ে প্রচলিত অসংখ্য গল্প আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে আছে। একেকটা ঘটনার কথা কতবার যে শুনেছি! তবে এই প্রসঙ্গে আমি সর্বশেষ পড়া একটি স্মৃতিকথার উল্লেখ করে লেখাটার ইতি টানব। মুজতবা আলীর সঙ্গে নিজের পরিচয় ও সম্পর্ক নিয়ে 'বামনের চন্দ্রস্পর্শাভিলাষ' নামের আত্মজীবনীতে বিস্তারিত লিখেছেন কিংবদন্তি সরোদবাদক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। দিল্লি সফরে গিয়ে মুজতবা আলীকে উপহার হিসেবে পাওয়ার কথা বলেছেন বুদ্ধদেব। দিল্লি গিয়ে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডক্টর সমর সেনের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন বুদ্ধদেব। সেখানে থাকতেন মুজতবা আলীও। তিনি তখন অল ইন্ডিয়া রেডিওর অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন ডিরেক্টর। মুজতবা আলীর সঙ্গে প্রখ্যাত সরোদ বাদকের পরিচয়ের গল্পটা তার লেখা দিয়েই তুলে ধরছি, 'গালগল্প চলতেই লাগল। হঠাৎ ডক্টর সেন বললেন, "আচ্ছা রাধুবাবু, আপনি দিল্লি এলেন, আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দিলেন, আর এখানে একটু বাজালেন না, এটা কি ঠিক হচ্ছে?"
গুরুজি তখনই আমাকে দিয়ে যন্ত্র আনিয়ে খাটিয়ার ওপর বসে বাজাতে লাগলেন। মিনিটপাঁচেক হয়নি, ডক্টর সেন জিজ্ঞাসা করলেন, "আচ্ছা রাধুবাবু, আপনি মালকোষ জানেন?"
"আজ্ঞে হ্যাঁ, জানি। বাজাব?" গুরুজি বুঝে গেছেন যে শ্রোতা কী রকম। মালকোষ কয়েক মিনিট চলবার পরে—
"আচ্ছা রাধুবাবু, শুনেছি মালকোষ গাইলে বাজালে মৃত ওস্তাদদের আত্মা বা ভূত নেবে আসে, কথাটা কী সত্য?"
"তেমন তেমন মালকোষ হলে নাবে বই কী।"
আবার মালকোষ চলতে লাগল। আরও কয়েক মিনিট পরে ডক্টর সেনের নিরীহ প্রশ্ন, "কই রাধুবাবু, আপনার মালকোষে তো আজ্ঞা ভূতপ্রেত কিছুই সাড়া পাচ্ছি না?"
অকস্মাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে লনের অন্ধকার কোণ থেকে উচ্চৈঃস্বরে শোনা গেল, "বিলক্ষণ! বিলক্ষণ! কে বলে মালকোষে ভূতপ্রেত আসে না? এই তো আমি এসে গেছি।" মুজতবা আলী সাহেব!'
বাস্তবের এই উইটটাই লেখায় মিশে বাকিদের চেয়ে এক ঝটকায় আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে দুর্দান্ত এই মানুষটিকে। এই লেখায় বুদ্ধদেব তাঁর সঙ্গে আলাপের যে বিবরণ তুলে ধরেছেন, সেসবই এই দাবির সপক্ষে প্রমাণ। আর বুদ্ধদেব নিজের জবানিতে বলছেন, 'কলকাতায় উনি পার্ক সার্কাস অঞ্চলে একটি বাড়িতে থাকতেন। সময় পেলেই আমি তাঁর বৈঠকখানার এক কোনায় বসে থাকতাম। থাকতেন অনেক সাহিত্যপ্রেমী এবং উদীয়মান লেখকরা। বিভিন্ন প্রসঙ্গের আলোচনায় এবং রসিকতায় ওঁর মুখ থেকে অনর্গল যে মণিমুক্তো ঝরে পড়ত, সেগুলি সংগ্রহ করে রাখলে অবলীলাক্রমে আরো কয়েকটি দেশে বিদেশে, চাচা কাহিনীর সৃষ্টি করা যেত। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। সেখান থেকে মধ্যে মধ্যে বিস্ময়কর কিছু সংগ্রহ আমাদের সামনে তুলে ধরতেন।'
এই যে বিস্ময়কেও বিস্মিত করে দেওয়ার ক্ষমতা, এটাই দিন শেষে মুজতবা আলী। এই যে আমি লেখা শেষ করতে গিয়ে অনেক খুঁজেও যখন আর কোনো বিশেষণ পেলাম না, এটাই আমার মুজতবা আলী।
