ইইউর কঠোর মান পরিপালনের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানিতে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি
দেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানিতে গতি এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে টেকসই উৎপাদন, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ও মান ঠিক রাখার ক্রমবর্ধমান কঠোর শর্তের সঙ্গে তাল মেলাতে হচ্ছে দেশের উৎপাদকদের।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের ১৬ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ডলার থেকে ২৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ২০ কোটি ৬১ লাখ ৯০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
প্রকৌশল পণ্যের মধ্যে বৈদ্যুতিক পণ্য থেকেই সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় হয়েছে। একই সময়ে বাইসাইকেল রপ্তানি ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৫ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ২১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ৬৫ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এতে দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যের বাড়তে থাকা অবদান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধি এমন সময়ে এসেছে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টস রেগুলেশন (ইএসপিআর) এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) কাঠামোর মাধ্যমে নতুন টেকসইতার শর্ত চালু করছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইএসপিআর কার্যকর হয়। এতে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) ও পণ্যের স্থায়িত্বের বিষয়ে নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিক্রি না হওয়া নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ধ্বংস করায়ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে ইএসপিআর কার্যকর হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক হয়েছে। পণ্যভেদে আলাদা আলাদা শর্ত ধাপে ধাপে ডেলিগেটেড অ্যাক্টের মাধ্যমে চালু করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে, সেসব পণ্যের উপকরণ, যন্ত্রাংশ, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য, স্থায়িত্ব ও মেরামতযোগ্যতাসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে উৎপাদকদের।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য এটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। কারণ দেশের অনেক উৎপাদক এখনও আমদানি করা যন্ত্রাংশ ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, ফলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস ও তথ্য শনাক্ত করে রাখা তুলনামূলকভাবে কঠিন।
প্রস্তুতি নিচ্ছে শিল্পখাত
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেমা) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, নতুন শর্ত মোকাবিলায় সদস্যদের প্রস্তুত করতে পণ্যের উৎস, ওয়ারেন্টি, বিক্রয়োত্তর সেবা, মেরামতযোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "আমরা ইতোমধ্যে পণ্যভিত্তিক তথ্য, পণ্যের উৎস, ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবা—বিশেষ করে পণ্যটি মেরামতযোগ্য কি না—এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি।"
তবে এ খাতে এখনো পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ আলী।
ইউরোপ ও অন্যান্য পশ্চিমা বাজারের মান অনুযায়ী বৈদ্যুতিক পণ্য পরীক্ষার সক্ষমতা গড়ে তুলতে বেমা একাধিকবার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে।
মোহাম্মদ আলী বলেন, "বৈদ্যুতিক খাতের জন্য আলাদা একটি কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার থাকা উচিত।"
এ ধরনের একটি কেন্দ্র বিশেষ করে ছোট উৎপাদকদের জন্য উপকারী হতে পারে, যারা এখন রপ্তানি বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে।
আমদানিনির্ভর কাঁচামালে ট্রেসেবিলিটি চ্যালেঞ্জ
সরবরাহ শৃঙ্খলের উৎস শনাক্তকরণও এ খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। কারণ অনেক উৎপাদকই চীন ও ভিয়েতনাম থেকে যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানি করেন।
মোহাম্মদ আলী বলেন, "আমাদের বেশিরভাগ কাঁচামালই চীন বা ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা হয়। ফলে এসব পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট শনাক্ত করা খুবই কঠিন।"
তিনি বলেন, বেমার যেসব সদস্য এতদিন মূলত দেশের বাজারকেন্দ্রিক ছিলেন, রপ্তানিমুখী হতে গিয়ে তাদের তুলনামূলকভাবে বেশি প্রস্তুতি ও শেখার প্রয়োজন হচ্ছে।
পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রস্তুত ওয়ালটন
শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক ওয়ালটনের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত মানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো নতুন কিছু নয়।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আল ইমরান জানান, বিদেশি বাজারের শর্ত বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিটি বারবার নিজেদের ব্যবস্থা হালনাগাদ করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ম্যানুয়াল নিবন্ধন থেকে ডিজিটাল রেজিস্টার্ড এক্সপোর্টার (রেক্স) ব্যবস্থায় রূপান্তর এবং ইউরোপে জ্বালানি-দক্ষতার রেটিং পদ্ধতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, "যখন এ+++ রেটিং বদলে এ, বি, সি, ডি ও ই করা হলো, ওয়ালটন সঙ্গে সঙ্গেই নিজেদের ব্যবস্থা হালনাগাদ করেছে।"
সৈয়দ আল ইমরানের মতে, দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ওয়ালটনের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখে। কোম্পানিটি নিজস্ব অনেক যন্ত্রাংশ ও কম্পোনেন্ট তৈরি করে।
আরেকটি সুবিধা হলো ওয়ালটনের নুসড্যাট-ইউটিএস পরীক্ষাগার। সেখানে সিবি সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার সুবিধা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আগে রেফ্রিজারেটর পরীক্ষার জন্য ওয়ালটনকে ভারতে পণ্য পাঠাতে হতো। তবে এখন নুসড্যাট-ইউটিএসের পরীক্ষার প্রতিবেদন ভারতের সংশ্লিষ্ট স্টার রেটিং প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করা হয়। ফলে পরীক্ষার জন্য আর পণ্য বিদেশে পাঠাতে হয় না।
তিনি আরও বলেন, নতুন কোনো শর্ত এলে ওয়ালটন নুসড্যাট-ইউটিএস ও অংশীদার পরীক্ষাগারগুলোর সঙ্গে কাজ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন চিহ্নিত করে এবং দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে পারে।
ইউরোপের বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি ভিশনের
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ভিশন ইলেকট্রনিকসও ইউরোপের বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ওশেনিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইউরোপকে তারা ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখছে।
ইউরোপের মান, নিরাপত্তা ও ইকোডিজাইনসংক্রান্ত শর্ত পূরণে রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনারের নকশায় পরিবর্তন আনছে ভিশন। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের জন্য প্রতিষ্ঠানটির এয়ার কন্ডিশনার ইতোমধ্যে জি-মার্ক সনদ পেয়েছে।
কাঁচামালের উৎস, রাসায়নিক মান পরিপালন এবং বিভিন্ন সাব-অ্যাসেম্বলি ব্যাচ শনাক্ত করতে ইআরপি ব্যবস্থা সমন্বিত করছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে বিল অব ম্যাটেরিয়ালস ডিজিটাল করা হচ্ছে এবং হবিগঞ্জ ও ডাঙ্গা শিল্পপার্কে স্কোপ ১, ২ ও ৩ কার্বন নিঃসরণ পরিমাপে পরামর্শকদের সঙ্গে কাজ করছে ভিশন।
পণ্যের মেরামত ও যন্ত্রাংশ বদল সহজ করতে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) দল মডিউলার পিসিবি ডিজাইন এবং সহজে খোলা যায় এমন কম্প্রেসর ও ফ্যান-মোটর মাউন্ট ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে।
এ ছাড়া পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয়—এমন কিছু কম্পোজিট প্লাস্টিকের বদলে এবিএস ও এইচআইপিএসের মতো একক ধরনের পলিমার ব্যবহার শুরু করছে ভিশন। গুরুত্বপূর্ণ খুচরা যন্ত্রাংশ যেন দীর্ঘমেয়াদে পাওয়া যায়, সে বিষয়েও পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
নীতিগত সহায়তা চান উদ্যোক্তারা
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে সরকারের শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করে বেমা।
মোহাম্মদ আলী বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মতো বৈদ্যুতিক খাতেও প্রণোদনা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধা এবং আমদানি করা কাঁচামালে শুল্ক ছাড় দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, "বৈদ্যুতিক খাত যদি সরকারের এ ধরনের সহায়তা পায়, তাহলে আগামী ১০ বছরে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস খাত দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠতে পারে, এমনকি তৈরি পোশাক খাতের চেয়েও বেশি সম্ভাবনাময় হতে পারে।"
তিনি বাণিজ্য, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদকদের সঙ্গে খাতভিত্তিক আলোচনা আয়োজনেরও আহ্বান জানান।
এরই মধ্যে ব্যাটারি নিয়ে ইইউর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা সামনে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাটারি রেগুলেশন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইইউ বাজারে বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, ২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্প ব্যাটারি এবং হালকা যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারির জন্য ইলেকট্রনিক ব্যাটারি পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক হবে।
ফলে দ্রুত সম্প্রসারিত বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস শিল্পের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরি করা নয়; বরং সেসব পণ্য কীভাবে তৈরি, পরীক্ষা, সংগ্রহ ও মেরামত করা হয়—তার প্রমাণও দেখাতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার ও এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন ভোক্তা ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি রপ্তানি করছে। পাশাপাশি পাওয়ার ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক কেবল ও ইনসুলেটেড তার, সুইচ, সকেট, সার্কিট ব্রেকার এবং এলইডি লাইটিং পণ্যও রপ্তানির তালিকায় রয়েছে।
এ ছাড়া রিচার্জেবল ব্যাটারি, ট্রানজিস্টর ও সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইসের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বাইসাইকেল এবং অন্যান্য হালকা প্রকৌশল পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে।
বৈদ্যুতিক পণ্যের রপ্তানি যখন দুই অঙ্কের হারে বাড়ছে, তখন যেসব উৎপাদক আগেভাগে মান পরিপালন, ট্রেসেবিলিটি, পরীক্ষা ও মেরামতযোগ্যতার সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে—তারা মূলত এ প্রবৃদ্ধিকে বড় বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকবে।
