স্থানীয় চাহিদা মেটাতে মিরসরাইয়ে বৈদ্যুতিক পণ্যের শিল্প কমপ্লেক্স গড়ে তুলছে এসকিউ গ্রুপ
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) সমন্বিত বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন কমপ্লেক্স গড়ে তুলছে এসকিউ গ্রুপ।
কমপ্লেক্সটিতে ক্যাবল, ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে বাসবার, সুইচ, সকেট, সার্কিট ব্রেকার, স্মার্ট মিটার, লাইটিং পণ্য, বৈদ্যুতিক পাখা, সাবমেরিন ক্যাবল এবং সুপার-এনামেলড তার।
প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৪৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এসকিউ গ্রুপ। প্রায় ২০ একর জমির ওপর উৎপাদন কমপ্লেক্সটি গড়ে তোলা হচ্ছে।
এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের পরিচালক ও করপোরেট সেলস প্রধান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, মিরসরাইয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন হাব গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমাদের পরিকল্পনা হলো এখানে সব ধরনের বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন করা। আমাদের স্লোগান—'টোটাল পাওয়ার সল্যুশন'।"
বর্তমানে এই কারখানায় প্রায় ৬০০ জন কর্মরত আছেন। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সরাসরি কর্মসংস্থান প্রায় ২ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।
ক্যাবল থেকে 'টোটাল পাওয়ার সল্যুশন'
এসকিউ গ্রুপ ২০০৩ সালে সরকারি সংস্থায় বৈদ্যুতিক পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে এ খাতে ব্যবসা শুরু করে। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ট্রান্সফরমার উৎপাদন শুরু করে এবং ২০১১-১২ সালে ক্যাবল ব্যবসায় প্রবেশ করে।
মিরসরাইয়ের প্রকল্পটিকে এখন আরও বড় একটি বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে লো ও মিডিয়াম ভোল্টেজ ক্যাবল, ৩৩ কেভি পর্যন্ত পাওয়ার ক্যাবল, সাবমেরিন ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, স্মার্ট মিটার, লাইটিং পণ্য, সুইচ ও সকেট, সার্কিট ব্রেকার, বৈদ্যুতিক পাখা, বাসবার ট্রাংকিং সিস্টেম এবং সুপার-এনামেলড তার উৎপাদন করা হবে।
কোম্পানিটি ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। বর্তমানে যেসব বৈদ্যুতিক পণ্য আমদানি করা হয়, সেগুলো দেশেই উৎপাদন করা, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা, অটোমেশন ও মান নিয়ন্ত্রণ উন্নত করা এবং দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করাই এ পরিকল্পনার অংশ।
দীর্ঘমেয়াদে এসব পণ্য রপ্তানি বাজারেও নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজার
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, সার্কিট ব্রেকার ও সুইচগিয়ারসহ দেশে বৈদ্যুতিক পণ্যের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা।
গত দুই দশকে শুধু ক্যাবলের বাজারই দ্রুত বেড়েছে। একসময় এ বাজারের আকার ছিল প্রায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারটি বছরে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।
বিআরবি, বিজলি, ওয়ালটন, পারটেক্স ও এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাবলসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক পণ্যের উৎপাদন বাড়িয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ ভোল্টেজ ও বিশেষায়িত পণ্যও রয়েছে।
তবে এখনো দেশের মোট বৈদ্যুতিক পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে বিশেষায়িত ও উচ্চ ভোল্টেজের যন্ত্রপাতি মূলত চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
এসকিউ ইলেকট্রিক্যালস বর্তমানে ৩৩ কেভি পর্যন্ত ক্যাবল উৎপাদন করছে। পাশাপাশি ১৩২ কেভি পর্যন্ত ক্যাবল উৎপাদনের সক্ষমতাও তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটির ধারণা, শহরাঞ্চলে ধীরে ধীরে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ ভোল্টেজের আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলের চাহিদা বাড়বে।
এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের পরিচালক ও করপোরেট সেলস প্রধান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, "ভবিষ্যতে শুধু ওভারহেড ক্যাবল দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না। সরকার ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। সে অনুযায়ী আমরা ১৩২ কেভি পর্যন্ত ক্যাবল উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
আমদানিনির্ভর কাঁচামাল এখনো বড় বাধা
দেশীয় বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদনকারীদের জন্য আমদানিনির্ভর কাঁচামাল এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম বলেন, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের কারণে বাংলাদেশি উৎপাদকদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, "উচ্চ শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে সেই কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্য রপ্তানি করতে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা খুব কঠিন হয়ে যায়।"
তিনি কাঁচামালের শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা, রপ্তানিতে আরও প্রণোদনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও এলসি সুবিধা সহজ করার আহ্বান জানান।
দক্ষ জনবলের সংকট
এনএসইজেডে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দক্ষ জনবলের ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক অঞ্চলটি তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী এলাকায় হওয়ায় স্থানীয়ভাবে দক্ষ প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান ও শ্রমিক নিয়োগে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছাকাছি শ্রমিকদের বসবাসের সুযোগ সীমিত। ফলে কর্মী নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে পরিবহন ও আবাসন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসকিউ ইলেকট্রিক্যালস স্থানীয়ভাবে বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবলও তৈরি করতে চায়।
প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ম্যানেজার–এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন মো. আহসানুল কবির নিজামী বলেন, বাংলাদেশে প্রশিক্ষণযোগ্য জনবলের বড় ভাণ্ডার রয়েছে, তবে কারিগরি শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, "সরকার ভালো মানের কারিগরি কলেজ স্থাপন এবং যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে আমাদের জনবলও এ খাতে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারবে।"
বর্তমানে যন্ত্রপাতি স্থাপন ও কমিশনিংয়ের সময় বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদনশিল্প গড়ে তুলতে হলে দেশীয় কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেবা চায় এসকিউ ইলেকট্রিক্যালস
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) ওয়ান-স্টপ সেবাকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে এসকিউ ইলেকট্রিক্যালস।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন অনুমোদনের জন্য এখনো বিনিয়োগকারীদের একাধিক সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয়।
এসকিউ ইলেকট্রিক্যালসের ডেপুটি ম্যানেজার–এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন মো. আহসানুল কবির নিজামী বলেন, "এসব সেবা সত্যিকার অর্থেই ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে পাওয়া উচিত, যাতে বিনিয়োগকারীদের এক সরকারি দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে দৌড়াতে না হয়।"
