ইরানের মিত্রদের দমনে সৌদি আরবে গোয়েন্দা ও সামরিক সহায়তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিতে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা দেশটিতে অবস্থান করছেন। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের এই সামরিক অভিযান সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। উপদ্বীপটিতে লড়াই তীব্র হয়ে ওঠার মধ্যেই এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রকাশ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নৌপথ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন সামরিক সদস্যরা সম্প্রতি গঠিত একটি যৌথ বাহিনী কমান্ডের আওতায় কাজ করছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে এই কমান্ড গঠন করা হয়। এ কমান্ড গঠনের কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল যে, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলায় সহায়তা দেওয়ার নিজস্ব প্রচেষ্টা ইরান আরও জোরদার করছে। এ বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে থাকা মার্কিন সেনার মোট সংখ্যা প্রায় ২০০ জন।
সৌদি আরবকে সহায়তা দেওয়া মার্কিন সেনাদের উপস্থিতির বিষয়টি সামরিক অভিযান সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে এমন একটি লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ব্যবহারে সহায়তা করেছে, যার মাধ্যমে সামরিক কর্মকর্তারা যুদ্ধক্ষেত্রে কী ঘটছে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেন। তিনি এটিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরে ব্যবহৃত ম্যাভেন ব্যবস্থা-র সঙ্গে তুলনা করেছেন। দুই দেশের চলমান সামরিক সহযোগিতা সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্রও জানিয়েছে, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে।
তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করছে—যা তারা নিয়মিতভাবেই করে থাকে। তবে মার্কিন বাহিনী সরাসরি কোনো হামলায় অংশ নিচ্ছে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করছে না কিংবা অন্য কোনো ধরনের সামরিক পরিচালনাগত সহায়তাও দিচ্ছে না, যা অতীতে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তারা করেছিল।
একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের সামরিক অভিযান যাতে সুশৃঙ্খল ও পেশাদারভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা।
সবগুলো সূত্রই এই প্রচেষ্টাকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র সৌদি আরবকে আগে থেকেই দেওয়া বিদ্যমান সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, 'প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আমরা গোয়েন্দাসংক্রান্ত বিষয়ে মন্তব্য করি না।'
সৌদি দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে উপদ্বীপটিতে হুথিদের অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক দিনে লড়াই সম্ভবত ২০২২ সালের পর সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ওই বছর হুথি এবং সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে এরপরও দেশটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার হুথি যোদ্ধারা লোহিত সাগরের একটি কৌশলগত বন্দর দখল করেছে। এর ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ—বাব আল-মান্দাব প্রণালি—হুমকির মুখে ফেলার সুযোগ পেতে পারে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান দিয়ে হামলা চালিয়ে তারা কয়েক ডজন বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টার ওপর আরও একটি বিষয় ছায়া ফেলছে—সেটি হলো, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন এবং প্রথম দফায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময় রিয়াদকে মার্কিন বাহিনীর দেওয়া বিতর্কিত লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার স্মৃতি। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ওই সহায়তা বেসামরিক মানুষের ব্যাপক প্রাণহানিতে ভূমিকা রেখেছিল।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে কয়েক মাসব্যাপী সামরিক অভিযান চালায়। শেষ পর্যন্ত আকস্মিক একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে ওই অভিযান শেষ হয়।
এর আগে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছিল, ট্রাম্পের প্রধান সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ওই অভিযান দ্রুত শেষ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এর কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অভিযান থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট কোনো কৌশল ছিল না বলে তার উদ্বেগ।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং তা অঞ্চলটির অন্যত্র প্রক্সি সংঘাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় মার্কিন কর্মকর্তারা হুথিদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
যদিও শুরুতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সৌদি আরব অনিচ্ছুক ছিল—এমনকি চলতি গ্রীষ্মের শুরুতে ওই যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক উদ্যোগেও তারা সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল—তবে হুথিদের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব উভয়ের মধ্যেই যুদ্ধের দ্বিতীয় একটি ফ্রন্ট নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমানে ইয়েমেনে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শত শত কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা হুথিদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং শেষ পর্যন্ত বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এর আগে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান একটি অর্থনৈতিক 'পরমাণু বিকল্প' ব্যবহারের পরিকল্পনা করছিল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হুথিদের দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানেরও হাত রয়েছে।
তবুও ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলায় মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যেই চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান হামলার মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকা এবং যুদ্ধাস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগও তাদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে তাদের বেশিরভাগ মনোযোগ হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিচালিত সামরিক অভিযানে কেন্দ্রীভূত করছে। সেখানে তারা ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে, নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে পাহারা দিচ্ছে এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ বজায় রাখছে।
এদিকে সৌদি আরবের হুথিবিরোধী হামলা অভিযানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়া নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরে গভীর সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে কোনো হামলা ভুলভাবে পরিচালিত হয়ে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটলে এই উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে আরেকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
অন্য একটি সূত্রের ভাষায়, 'এটা আগের সময় নয়।'
