ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলে নিল হুথিরা
বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য পথ বাব এল-মান্দেব প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহর মোখা দখল করে নিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারি বাহিনী পিছু হটার পর ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটি বৃহস্পতিবার মোখা শহরের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে আল জাজিরার ইয়েমেন প্রতিনিধি ইউসেফ মাউরিকে সূত্রগুলো জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকেও একই তথ্য নিশ্চিত করেছে ইয়েমেন সরকারের তিনটি সূত্র।
মাউরি বলেন, 'ইয়েমেন সরকার প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল; তারা অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিল... কিন্তু আনসার আল্লাহ হুতিদের ব্যাপক সামরিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা বন্দর ও পুরো শহরটির নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।' তিনি আরও জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাইস জেলাটিও দখল করেছে হুথিরা।
তবে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
গত ১০ দিন ধরে হুথিরা মোখা দখলের লক্ষ্যে তাইজের পশ্চিমে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মোখা শহরটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। পুরো ইয়েমেনি লোহিত সাগর উপকূল নিজেদের দখলে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকা হুতিরা সরাসরি এই প্রণালী ঘেঁষে অবস্থিত অন্যান্য উপকূলীয় শহরেরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
মাউরি বলেন, মোখা বন্দর হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার অর্থ হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালিও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তিনি বলেন, 'এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ করার মতো নজরদারি, প্রভাব ও চাপের ক্ষমতা হুতিদের হাতে চলে এসেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই বাব এল-মান্দেব প্রণালীর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।'
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্টাই বলেন, মোখা দখল করা একটি অত্যন্ত বড় ঘটনা। এটি ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের তায়েজগামী রাস্তা অবরুদ্ধ করার মতো অবস্থানে বসিয়ে দিয়েছে, যা 'সরকারের জন্য অত্যন্ত বড় একটি ধাক্কা।'
আল-জাজিরাকে পুস্টাই বলেন, এই দখলের ফলে হুতিরা 'লোহিত সাগরে ইয়েমেনের প্রায় পুরো উপকূলীয় এলাকা' এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারল।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী যেখানে প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রশস্ত, সেখানে বাব এল-মান্দেব প্রণালী অনেকটাই সরু—প্রায় ২০ কিলোমিটার।
বিশ্লেষক বলেন, 'এর মানে হলো তারা কেবল কামান ব্যবহার করেই এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে; জাহাজে আক্রমণ করার জন্য তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ব্যবহারেরও প্রয়োজন হবে না। এটি নিশ্চিতভাবেই সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের জন্য একটি বড় ধরনের আঘাত।'
'খুব একটা বিস্ময়কর নয়'
কাতারে নিযুক্ত ইয়েমেনের রাষ্ট্রদূত রাজেহ বাদি ইরানকে প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধানের পর নতুন করে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে হুতিদের ব্যবহার করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
বাদি বলেন, ইরান ও হুতিদের সম্পর্ক 'এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়।' লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) পাশাপাশি এই গোষ্ঠীটিকেও ইরানের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
আল জাজিরাকে বাদি বলেন, তেহরান 'তার অবশিষ্ট অস্ত্র হিসেবে হুতিদের ওপর বাজি ধরছে' এবং প্রায় পাঁচ বছরের স্থবিরতার পর আবার যুদ্ধ শুরু করতে সাহায্য করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'এই দুটি প্রবেশদ্বারে তাদের আধিপত্য যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্রাগারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর হতে পারে।'
তবে বিশ্লেষক পুশতাই মনে করেন, হুতিদের ওপর ইরানের 'ব্যাপক প্রভাব' থাকলেও 'হুতিরা কেবল ইরানের প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে না; তারা তাদের নিজেদের যুদ্ধও নিজেরা লড়ছে।'
ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে হুতিরা সৌদি আরবের সীমান্ত এলাকার গভীরে তেল স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
বৃহস্পতিবার হুতি সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা 'সাবা' জানিয়েছে, সৌদি বাহিনী তায়েজ, হুদাইদাহ, আল-জাওফ এবং মারিব গভর্নরেটে আরও ৪০টি বিমান হামলা চালিয়েছে।
দক্ষিণ ইয়েমেনে হুতিদের এই দ্রুত অগ্রযাত্রাকে 'উদ্বেগজনক ও হতাশাজনক, তবে খুব একটা বিস্ময়কর নয়' বলে বর্ণনা করেছেন সৌদি পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক আব্দুল আজিজ আলঘাশিয়ান।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, মোখা দখল করার বিষয়টি হুতিদের একক শক্তির চেয়ে বরং 'হুতিবিরোধী বাহিনীগুলোর মধ্যকার বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার কারণেই বেশি সম্ভব হয়েছে।'
তিনি আরও যোগ করেন, সৌদি আরব সম্ভবত পাল্টা আঘাত হানার কৌশল গ্রহণ করবে, কারণ তারা 'দীর্ঘমেয়াদী কোনো সামরিক অভিযানে'জড়াতে চায় না।
অন্যদিকে, হুতিদের লাগাম টানতে ইরানকে সতর্ক করেছে পাকিস্তান। তারা জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর গত মাসে এই তিন দেশ 'মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স' নামে একটি নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে।
