শোধ-প্রতিশোধের চক্রে আটকে গেছে বাংলাদেশ: এই দুষ্টচক্র ভাঙবে কবে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার হাতবদল বহুদিন ধরেই একটি অলিখিত রীতি অনুসরণ করে এসেছে—নতুন সরকার এলে আগের সরকারের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তা, বিচারক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ভাঙার এক প্রায়-স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রতিহিংসাপরায়ণ, শূন্য-সমষ্টি (জিরো-সাম) রাজনীতির ফল হয়েছে একটাই—প্রতিষ্ঠান দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা টলেছে, আর প্রতিটি রূপান্তর দেশকে নতুন করে অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ আরেকটি ক্ষমতা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে, এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। প্রশ্ন হলো—এবারও কি পুরনো চক্রই পুনরাবৃত্ত হবে, নাকি জাতি সত্যিকারের সমঝোতার পথে হাঁটবে?
দৃশ্যত, শোধ-প্রতিশোধের চক্রে আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার করা হলেও রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। পরবর্তী প্রতিটি শাসনামলে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন ও বিচার বিভাগে ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান চলেছে।
সামরিক শাসনের পর গণতন্ত্রে ফেরার দুটি বড় গণ-অভ্যুত্থান—১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—উভয়ই তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী শাসনকে হটাতে সফল হলেও, তার পরের রাজনৈতিক কাঠামো বারবার পুরনো প্রতিহিংসারই নতুন সংস্করণে রূপ নিয়েছে।
বিভিন্ন শাসনামলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা প্রায়শই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে নেওয়া প্রশাসনিক রদবদলও পুরনো প্যাটার্নের প্রতিফলন—নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ডিসি-এসপি থেকে শুরু করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ব্যাপক হারে ওএসডি (সংযুক্ত) করা হয়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালে নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও প্রশাসনে একই ধরনের ব্যাপক রদবদল, সচিব বদলি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সংযুক্তকরণ অব্যাহত থাকতে দেখা যাচ্ছে—যা প্রমাণ করে প্রতিহিংসার এই সংস্কৃতি এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গেঁথে আছে, দল পরিবর্তনে তার চরিত্র বদলায় না।
বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম। সংবিধান প্রণয়নের গোড়াতেই বিচারকদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করা হলেও, চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাপনায় হাত পড়ে। পরবর্তী দশকগুলোতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, ছুটি ও শৃঙ্খলাবিধান নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকায় বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পৃথক করার অধ্যাদেশ জারি করলেও, আইন বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে শুধু কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা দিয়েই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে কি না।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বাস্তব প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। দুর্নীতি ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা, যেখানে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশ নীতি সংস্কারের মাধ্যমে এগিয়ে গেছে। মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা ও আইনি ধারাবাহিকতা ছাড়া কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হন না।
শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারী নন, দেশীয় উদ্যোক্তারাও একই সংকটে ভোগেন। প্রতিটি সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে নীতি, কর কাঠামো, ব্যবসায়িক অনুমোদন প্রক্রিয়া ও এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রাধিকারও বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও ডলার সংকট—এই সব মিলিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ ক্রমাগত অনিশ্চিত থেকে গেছে। ফলে যে বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই দেশই এখন বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় ভুগছে।
তাহলে এখন করণীয় কী? কী হবে স্থায়ী সমাধানের পথরেখা?
বহুদলীয় সমঝোতা অসম্ভব নয়—প্রয়োজন শুধু তাকে সাময়িক সংকট-মোচনের হাতিয়ার না রেখে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরিত করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, একটি স্থায়ী দ্বিদলীয় (বহুদলীয়) জাতীয় কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা নির্বাচনের ফলাফল নির্বিশেষে বছরে অন্তত দুই-তিনবার ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের একত্র করে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা ও শাসনকাঠামো সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে সংলাপ চালিয়ে যাবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মডেলকে সাংবিধানিক ভিত্তি দিয়ে একে সাময়িক নয়, স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যেতে পারে, যাতে প্রতিটি নতুন সরকারকে শূন্য থেকে সমঝোতা শুরু করতে না হয়।
দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোকে—নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন, নিম্ন আদালত—দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির স্বচ্ছ, যোগ্যতাভিত্তিক ও আইনি সুরক্ষাযুক্ত পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় পৃথকীকরণের মতো উদ্যোগ একটি ভালো সূচনা, কিন্তু তা যেন কাগুজে সংস্কারে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত কার্যকর স্বাধীনতায় রূপ নেয়, তার জন্য নিয়োগ কমিটি থেকে নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র প্রভাব কমানো এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ ও অপসারণ-সুরক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। প্রতিটি সরকার বদলের পর ব্যাপক হারে কর্মকর্তা ওএসডি করার সংস্কৃতি বন্ধ করে, শুধু প্রমাণিত অনিয়ম বা দুর্নীতির ভিত্তিতে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ক্ষমতার নিয়মতান্ত্রিক হস্তান্তর নিয়ে একটি ভিত্তিগত সাংবিধানিক ঐকমত্য প্রয়োজন, যা প্রতিটি নির্বাচনের আগে-পরে বিতর্কের বাইরে থাকবে। জুলাই সনদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে যে সমঝোতা তৈরি হয়েছে, তাকে সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তির—ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষের—দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিতে পরিণত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ ক্ষমতায় এসে এই কাঠামো একতরফাভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা না করে। নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল মেনে নেওয়া এবং পরাজিত পক্ষকে অর্থবহ বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়াও এই ঐকমত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
বস্তুত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে প্রতিহিংসার রাজনীতি কোনো একক দলের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক দুষ্টচক্র, যা ক্ষমতার প্রতিটি পালাবদলে নতুন মুখে ফিরে আসে। এখন প্রয়োজন এমন স্থায়ী ব্যবস্থাপনা—যেখানে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও সাংবিধানিক সংস্থাগুলো কোন দল ক্ষমতায় আছে তার ওপর নির্ভর করে না, বরং আইনের শাসন ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে। তবেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক টেকসইতা অর্জন সম্ভব হবে—নইলে প্রতিটি নতুন নির্বাচন কেবল প্রতিশোধের পরবর্তী অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
