মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আবুল কালাম আযাদের আপিল শুনানি ৪ সপ্তাহ মুলতবি
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মাওলানা আবুল কালাম আযাদের আপিলের ওপর শুনানি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. রেজাউল হক নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
একইসঙ্গে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামকে সতর্ক করেছেন আদালত।
আদালতে আবুল কালাম আযাদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী, ইমরান এ সিদ্দিকী, আইনজীবী মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (নাজিব মোমেন) ও মীর ওসমান বিন নাসিম।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম।
আদেশের পর আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, 'আদালত আপিল শুনানিটি চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি করেছেন। অবকাশকালীন ছুটির পর এটি আবার শুনানির জন্য উঠবে। তখন মূল আপিল ও আবেদনের ওপর একসঙ্গে শুনানি হবে।'
তিনি জানান, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শুরু হচ্ছে। ছুটি শেষে ২৫ অক্টোবর নিয়মিত আদালত বসবে। আযাদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিতের মেয়াদ আগামী ২২ অক্টোবর শেষ হলেও, আদেশ হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটরকে আপিল বিভাগ সতর্ক করে দিয়েছেন জানিয়ে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী বলেন, 'বিচারাধীন বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে বেশি কথা বলার কারণে চিফ প্রসিকিউটরকে আদালত সতর্ক করেছেন এবং এ নিয়ে মন্তব্য করা থেকে তাকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।'
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, 'আদালত আমাদের বিচারাধীন বিষয়ে অগ্রিম মন্তব্য না করতে বলেছেন। আমরা এখন থেকে অগ্রিম মন্তব্য করব না।'
এর আগে, গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করলে আর সুযোগ থাকে না বলে সাংবাদিকদের জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, 'আইন সবার জন্য সমান। পলাতক মাওলানা আবুল কালাম আযাদ হোক কিংবা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলে আপিলের সুযোগ নেই।'
উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের ওই মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১৩ বছর আগে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে গত ৬ জুলাই বিলম্ব মার্জনাসহ আপিল করেন আবুল কালাম আযাদ।
এতে ৪ হাজার ৯১৫ দিনের বিলম্ব মার্জনা চাওয়ার পাশাপাশি আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিতের আবেদন করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় আপিল ও সাজা স্থগিত চেয়ে আযাদের করা আবেদন শুনানির জন্য গত ১৭ আগস্ট আপিল বিভাগে ওঠে। সেদিন আযাদের আপিল খারিজ চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন।
এরপর বিষয়টি মঙ্গলবারের কার্যতালিকায় ৬ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের জন্য শুনানি মুলতবি করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় ছিল আবুল কালাম আযাদের মামলায়। ওই রায়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, আটক, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ আটটি অভিযোগের মধ্যে সাতটি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে ফেরেন আবুল কালাম আযাদ। এরপর তিনি সাজা স্থগিত চেয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তার দণ্ডাদেশ স্থগিত করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে আদালতে আত্মসমর্পণ করে তাকে আপিল করতে হবে—এমন শর্ত দেওয়া হয়।
শর্ত অনুযায়ী, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন আবুল কালাম আযাদ। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) করেন।
